প্রেম এসেছে নীরবে
— কামাল কাদের
সত্যিকারের প্রেম , ভালোবাসা , স্নেহ, মায়া-মমতা এ সমস্ত স্বর্গীয় জীবনবোধ আমাদের মানব জীবনে কোথা থেকে, কি ভাবে, কোন সময়ে চলে আসে সেটা রীতিমত এক রহস্যময় ব্যাপার। কখনো আবার নিজেরই প্রেমহীন শুন্য জীবনে হঠাৎ করে প্রেম- ভালোবাসা নীরবে এসে যায়।
রেশমা সুলতানা একজন গায়িকা এবং গীতিকার। বয়স চব্বিশ বছর , বেশ সুন্দরী। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের চারুকলা বিভাগের ছাত্রী। সংগীত তার জীবন এবং এ জীবন নিয়ে সে তার ভবিষ্যৎ জীবন কাটিয়ে দিতে চায়। আধুনিক জীবন যাত্রার মতো তার ও এক বালক বন্ধু আছে , নাম তার সেলিম। সেলিম ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র । সেলিমকে নিয়ে রেশমার সমস্যা হলো , সে ভীষণ সন্দেহ প্রবন ব্যক্তি । যখনই রেশমা কোনো পুরুষ লোকের সাথে কথা-বার্তায় লিপ্ত হয় সেটা সে সহ্য করতে পারেনা। অনর্থক হিংসায় জ্বলে পুড়ে আগুন হয়ে যায়। সেলিমের অভিযোগ “তুমি অনেক সুন্দরী , পাছে আমাকে ছেড়ে অন্য কোনো লোকের সাথে চলে যাও সেটা আমি সহ্য করতে পারিনা এবং পারবোনা।” রেশমা তাকে অভয় দেয় , কিন্তু কে কার কথা শুনে ! কি আর করা, রেশমা তার ভালোবাসার মানুষটির অপ্রিয় ব্যবহার অনিচ্ছাসত্বেও সময় অসময়ে সহ্য করে যায়।
একদিন ওরা দু’জনে কলাভবনের একতলার সিঁড়ির উপরে বসে কোনো কারণে তর্ক -বিতর্কে জড়িয়ে পরে।এক সময়ে তাদের তর্কের বিরোধ এমন পর্যায়ে চলে আসে যে সেলিম রাগের বশে রেশমাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ফলে রেশমা গড়াগড়ি করে একেবারে সিঁড়ির শেষ মাথায় গিয়ে পরে। হঠাৎ করে এই নাটকীয় ঘটনার পরিণামে রেশমার পাঁজরের কয়েকটি হাড্ডি ভেঙে যায় এবং ওর শিরদাঁড়ায় ভীষণ ব্যথা অনুভব করে। আশে পাশের ছাত্র ছাত্রীরা তাকে ধরাধরি করে রেশমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
রেশমার জীবনে এই অবাঞ্চিত ঘটনার ফলে তাকে প্রায় মাসখানিক হাসপাতালে থাকতে হলো। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে দৈনন্দিন চলা ফেরার জন্য তাকে হুইল-চেয়ারের সাহায্য নিতে হলো। সে শুধু ভাবে আর ভাবে কোন পাপে এই অপরিসীম সাজার আবর্তে পড়ে গেলো। তার জীবনের সমস্ত আশা আকাঙ্খা এক মুহূর্তে কর্পূরের মতো বিলীন হয় গেলো। প্রায় সময়ই শরীর ব্যথায় জর্জরিত থাকে আর হতাশাগ্রস্ত বেদনা নিয়ে ভাবে ,” ভবিষ্যৎ বলে আমার জীবনে কিছুই নাই।”
এরই মাঝে রেশমা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে না পেরে মনের মতো করে সংগীত জগতে ডুবে যায়। যখন সংগীত নিয়ে ব্যস্ত থাকে ততক্ষন সে তার বিরামহীন ব্যথা ভুলে থাকতে পারে । সংগীত জগৎ থেকে বের হলেই নিমেষে শরীরের ব্যথাটা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠে। কখনো কখনো রেশমা হুইল -চেয়ার ছেড়ে হাটবার চেষ্টা করে কিন্তু বেশিক্ষন দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এক বছরে সে সাতাশ বার পড়ে গেছে । এই হলো তার রোজকার জীবন!
রেশমা তার এক বান্ধবীর সাহায্যে ঢাকায় এক নামকরা প্রাইভেট হাসপাতালের খোঁজ পেলো , যেখানে মানব দেহের “দেহ কোষ” গতিরোধ করার চিকিৎসা রয়েছে । রেশমার বাবা- মাও খবরটি শুনে অত্যন্ত উৎসাহিত হয়ে রেশমাকে বললো ,”দিনের পর দিন তোর এরকম করুন অবস্থা দেখতে আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে । আমাদের অবর্তমানে তোকে কে দেখা শুনা করবে ? চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি ? ” বাবা-মার কথাগুলি শুনে রেশমাকে ভাবিয়ে তুললো ,” তাই তো চেষ্টা করা যাক না ! “এই ভেবে সে ওই হাসপাতালে ভর্তি হলো। হাসপাতেলের নিয়ম অনুসারে রেশমাকে ছয় মাস ইনটেনসিভ চিকিৎসা করা হবে তারপর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী তাকে “ফিজিও থেরাপি” সেশনে নেওয়া হবে।
হাসপাতালের ভর্তির কয়েক মাসের মধ্যে রেশমা তার চিকিৎসার উন্নতি দেখতে পেলো। ক্রমে সে “হুইল চেয়ার ” ছেড়ে ক্র্যাচ ব্যবহারের স্বাধীনতা লাভ করলো। পরবর্তী চিকিৎসার পদক্ষেপ অনুসারে তাকে ফিজিও সেশনে নেয়া হলো। সপ্তাহে তিন দিন সেশন | সেখানেই রেশমার পরিচয় হলো সোয়েবের সাথে। সোয়েব ঢাকার ফায়ার সার্ভিসের উচ্চ পদস্থ অফিসার। সে ফায়ার সার্ভিসের খেলোয়াড় হিসাবে ঢাকার ফুটবল লীগের প্রথম বিভাগে খেলা করে। একদিন যথারীতি ফুটবল লীগের ম্যাচ খেলতে গিয়ে সে হাঁটুতে মারাত্মক ভাবে আঘাত পায়। দর্শকদের মাঝে অফিসের কর্মচারীরা তাকে সেই পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসে। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর হাসপাতালের চিকিৎসরা নির্ণয় করে যে সোয়েবের হাঁটুর হাড় ভেঙে গেছে এবং তাকে ধারাবাহিক ভাবে কয়েক মাস ” ফিজিও” নিতে হবে। সে মনে মনে বলছে ,” কি আর করা! চিকিৎসকদের আদেশ মানতে তো হবেই|”
” ফিজিও” সেশনে রেশমা এবং সোয়েবের দেখা সাক্ষাৎ হয়। প্রায়ই ভদ্রতার খাতিরে একজন আরেকজনকে সাধারণ সম্ভাষণ জানায় , এই যেমন ,” হ্যালো, কেমন আছেন ? “, “ভালো আছি”, “আপনি কেমন আছেন”? ইত্যাদি। সময়ের সাথে সাথে তাদের দেখা সাক্ষাৎ বাড়তে থাকে। “ফিজিও” সেশন শেষ হয়ে গেলে তারা দু’জনে বসে গল্প করে , তাদের গল্পের কোনো মাথা মুন্ড থাকেনা। কি ভাবে যে ঘন্টার পর ঘন্টা পার হয়ে যায় তারা টের ও পায় না। তাদের দু ‘জনের আড্ডার অলিখিত উপাদান হলো দু ‘জনই হাড় ভাঙা রোগী এবং ক্রাচের উপর নির্ভরশীল|
একদিন তাদের ফিজিও প্রায় শেষ মাথায় , বিনা মেঘের বজ্রপাতের মতো হঠাৎ করে সোয়েবের হৎপিন্ডে ব্যথা শুরু হোল| নিয়তির কি পরিহাস তার সাথে তার কিডনিরও স্বাভাবিক কাজের অভাব দেখা দিলো।
সোয়েবের ভাগ্য কিছুটা ভালো বলতে হবে। ওর “হৃৎপিণ্ডের ব্যথার ” আক্রমণটা
হাসপাতালের ভিতর হয়েছে। খবর পিয়ে হাসপাতালের নার্স দ্রুত ট্রলি করে সোয়েবকে “কার্ডিয়াক ডিপার্টমেন্টের “নিয়ে আসলো। এদিকে রেশমা হঠাৎ এই দুঃসংবাদ পেয়ে ঘাবড়িয়ে গেলো , কেন জানি রেশমার মনে হলো সে সোয়েবকে ভালোবেসে ফেলেছে। সে নার্সের কাছে সোয়েবের বর্তমান অবস্থা কি রকম তা জানতে পারছেনা। কারণ সে তো সোয়েবের কেউ না , শুধু বন্ধু এর বেশী কিছু না।
রেশমা শুধু ফেল ফেল করে চেয়ে থাকে সোয়েবের মাটিতে পড়ে থাকা ক্রাচটার দিকে। মনটা ভারী হয়ে যায়। রীতিমতো আতঙ্কে সে তার মনকে প্রশ্ন করে সোয়েব কি আদৌ বেঁচে যাবে ? শুধু সে এই টুকু জানতে পারে যে সোয়েবকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়েছে।
ঘটনার তিনদিন পর রেশমা হাসপাতাল থেকে সোয়েবের টেক্সট পায়। সোয়েবের টেক্সট পেয়ে রেশমা এতটা শান্তি এবং মনের যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পায় যা তার জীবনে এক মধুময় স্মৃতি হয়ে রইলো। সোয়েবের প্রতি তার শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা দ্বিগুন হয়ে উঠলো এই ভেবে যা তার মতো এক বিকলাঙ্গ মেয়েকে সোয়েব নিজের এই কঠিন সময়ে তাকে স্মরণ করেছে। সে জানতে পারে যে সোয়েবের হৎপিন্ডে “স্টান্ট” ফিট করানো হয়েছে এবং তাকে কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। একদিন সময় করে রেশমা হাসপাতালে সোয়েবকে দেখতে যায়| হাসপাতালে যেয়ে সে জানতে পারে সোয়েব আবার অপারেশন থিয়েটারে| কথাটা শুনে রেশমা নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছেনা, সে তার জীবনে কখনো এ রকম নিঃসহায় অনুভব করে নাই। চার ঘন্টা পর রেশমা শোয়েবকে ” ইনটেনসিভ কেয়ার” কেবিনে দেখতে যাওয়ার অনুমতি পায়। তাকে তৈরী করছে “ট্রিপল – বাই – পাস” অপারেশন করানোর জন্য। অপারেশনটা নয় ঘন্টা লেগে গেলো। অপারেশন হওয়ার কয়েকদিন পরে রেশমা যখন সোয়েবের হাসপাতালের কেবিনে দেখা করতে গেলো তখন রেশমাকে সোয়েব বললো ,”কেবিনের পর্দাটা ভিড়িয়ে দাও , আমাদের কিছুটা প্রাইভেসী থাক”। রেশমা পর্দাটা ভিড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে যেই নাকি সোয়েবের দিকে তাকালো তখনই সোয়েব তার ব্যাগ থেকে একটা মুক্তার আংটি বের করে রেশমার হাতে পরিয়ে দিলো । রেশমা হতবাক ! রেশমার মনে প্রশ্ন জাগলো এই অসুস্থ শরীর নিয়ে সোয়েব কখন, কোথা থেকে, কি ভাবে এতো সুন্দর আংটিটি জোগাড় করলো ? সোয়েব বললো ,” আমার “হার্ট এটাক ” হওয়ার আগে থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি তোমাকে ভালোভেসেছি, কিন্তু দেখো অদৃষ্টের কি পরিহাস ! এ কথাটি বলার আগেই আমার “হার্ট এটাক” হয়ে গেলো। তবে যাই হউক , আজ আমি এ সুযোগ ছাড়তে চাই না । আমি আমার জীবনে সব সময় তোমাকে আমার পাশে রাখতে চাই।” ঘটনাটি এতই আবেগময় যে রেশমা খুশিতে কেঁদে ফেললো , কারণ রেশমার হৃদয়ের কথাই তো সোয়েব প্রতি ধ্বনি করে তার হতাশার জীবনকে মধুর করে তুললো ।

