একফালি চাঁদ
— মো. সাজ্জাদুল হক
আজ বেশ তাড়া। বিকালের মধ্যেই ঢাকা পৌঁছাতে হবে। বাইরে এসে রিক্সার অপেক্ষা করছি। হঠাৎ দেখি মানু চাচা দৌড়াচ্ছে। ডাকলাম,
-চাচা, কি হয়েছে? কোন খারাপ কিছু? থামলেন। হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন,
-তজিম ভাইর বাড়িত যাইতাছি। হের ছেঁড়িডার অসুক। ডাক্তরের কাছে লইয়া যাইবাম।
-আমিও কি যাবো?
-গেলে বালাই অইবো। ছেঁড়িডা বড়ো দুঃখী!
চাচার সাথে কথা বলতে বলতে আমিও হাঁটছি–
আহ্লাদের মা! ডাকনাম আল্লাদি। মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে তার জন্ম। নয়নের মণি হয়েই বেড়ে ওঠা। শৈশব থেকে কৈশোর—এই সময়টাতে মায়ের আঁচলটাই ছিল তার একমাত্র আশ্রম। যত আবদার, মা কোনোটি অপূর্ণ রাখেননি।
মায়ের বয়স চল্লিশের কোঠায়। বিয়ের পনেরো বছর পর সন্তানের মুখ দেখা। একটা সন্তানের জন্য কত ডাক্তার, কবিরাজ, বৈদ্য, ওঝা, ঝাড়ফুঁক আর মানত করেছে—তার হিসাব নেই। সন্তানের আশায় মানুষ কত কিছুই না করে! কেউ সন্তান জন্ম দিয়ে ফেলে যায় রাস্তার পাশে, ঝোপঝাড়ে কিংবা ডাস্টবিনে। আবার কেউ নিঃসন্তান হয়ে ফিরে যায় না-ফেরার দেশে!
আল্লাদি বেড়ে উঠেছে আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই। তার না আছে বিশেষ কোনো চাহিদা, না আছে অহমবোধ। লজ্জাশীলা নারীর সব গুণই তার মাঝে বিদ্যমান। জানি না, কোন ঘর আলো করবে তার নারীত্বের গুণ। তবে মানুষ যা চায়, পায় তার উল্টো। আল্লাদির যেন তেমনটা না হয়।
“আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে”—বিরহী উকিলের এই গান শুনতে শুনতে ঘুম ভাঙে। একই গান শুনতে শুনতে মাঝরাতে বিছানায় পিঠ ঠেকাই। আষাঢ় মাস বলে কথা। গ্রামে, পাড়া-মহল্লায় বিয়ের ধুম। ফাল্গুনে ফুটে তৃণরাজির ফুল, আর আষাঢ় এলেই ফুটে বিয়ের ফুল।
কৌতূহল যেমন আছে, বিরক্তিও কম নয়। ঢাক-ঢোল, সানাই আর মাইকের সুরধ্বনিতে প্রার্থনা করাও মাঝে মাঝে কষ্ট হয়। যারা এই সুরের তালে নাচানাচিতে ব্যস্ত, তারা ধর্মকর্মের কথা মনেই করে না। কী আর করা! কিছু সয়, কিছু না সয়েই সয়।
আল্লাদির বিয়ে। পাশের গ্রামের কদর আলীর সাথে। নামটা কদর হলেও শেষ পর্যন্ত এই কদর থাকবে কি না, জানি না।
ইসলামি রেওয়াজমতো বিয়ে সম্পন্ন হলো। শ্বশুরবাড়ির পরিবারে স্বামী ছাড়া আর কেউ নেই। একটা ছয় মাস বয়সী ছাগল আছে। আল্লাদি এখন গৃহকর্ত্রী। গৃহস্থের মেয়ে বলে কথা। দিন কাটছে হাসি-আনন্দেই।
ছাগল ছানার বেশ কদর। কদর আলী দিনমজুর। সকালে বাড়ি ছাড়ে, বিকেলে বা সন্ধ্যায় ফিরে আসে। সারাদিনের সঙ্গী হিসেবে ছাগল ছানাটিই আল্লাদির অবলম্বন। ইতিমধ্যে ছাগলটির স্বাস্থ্য-চেহারার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। কদর আলীর খুশি দেখে কে! তার ভাবনা, এ বছরেই ছাগলটি বাচ্চা দেবে—কমপক্ষে তিনটি!
আল্লাদি সরব-নিরব দুইয়ের মাঝামাঝি। ভালোই কাটছে দিন।
দিন, মাস, বছর শেষ। এবার খুশির খবর শুনল কদর আলী। ছাগলটি মা হতে চলেছে! কিন্তু তার পরিবারে নতুন মুখ আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। আল্লাদির মনকষ্ট যেন আর কমছেই না। নীরবে-নিভৃতে কত কাঁদে!
পাড়া-প্রতিবেশী দাদি-ভাবিরা বাজে কথা শোনায়। কেউ বলে বন্ধ্যা, কেউ বলে অপয়া—আরও কত কী! না, দুঃখ বুঝি শেষ হবে না আল্লাদির।
গতকাল কদর আলী সাফ সাফ বলে দিয়েছে, যদি এই বছর বাচ্চাকাচ্চার মুখ দেখতে না পারে, তাহলে সে আবার বিয়ে করবে।
আকাশ থেকে বজ্র এসে পড়ল আল্লাদির মাথায়।
সারাদিন কিছুই খায়নি। শুধু কেঁদেছে।
সন্ধ্যায় কদর বাড়ি ফিরল। হাতে একটা বাজারের ব্যাগ। ব্যাগটা রেখেই বলল,
—আল্লাদি, গরম হানি কইরা আন। শইলডা মেজ মেজ কত্তাছে।
—তুমি কাহড্ডি খুইল্যা জিরাও।
—ব্যাগের ভিতরে একটা মাছ আছে। এইডা নিয়া কাইট্টালা। মেলা দিন ধইরা বড় মাছের ছালুন খাইনা।
আল্লাদি কোনো কথা না বলে ব্যাগটা রান্নাঘরে নিয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, হঠাৎ এত বাজার-সদাই কোথা থেকে এলো!
তার মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকল। রান্নাঘরে যেতে যেতে মনে পড়ল ছাগলের কথা। আজ সন্ধ্যায় সে তার ছাগলটির কোনো সাড়া-শব্দ পায়নি। সে কদরকে জিজ্ঞেস করল,
—তুমি বখরির বাচ্চাডারে বালা কইরা বানছো?
—বানছি।
—কাইল বানির মার ছাগল চোরে নিছেগা।
—আউজগা কি আমরাড্ডাও চোরে নিছেগা? তরে কইছি বালা কইরা ছালুন রাইন্ধা ভাত দিতে। আজাইরা কথা!
—যাইতাছি। মনে সন্দেহ অইছে, এল্লাইগ্যা জিগাইছি।
—জিগানি লাগে ক্যারে? দুয়াড্ডা গুছাইয়া দেইখ্যাগা গিয়া।
—আমি যাইতে হাল্লে তোমারে কইতাছি কি হুদায়ানি। কবিরাজে নিষেধ দিছে, বেইল তলইলে ঘরের বাইরে যাওন যাইতো না।
কবিরাজের কথা শুনে অবজ্ঞার হাসি হাসল কদর। ব্যঙ্গ করে বলতে থাকল,
—আঁত্তি ঘোড়া গেল তল, চিহায় কয় কতো জল। ডাক্তার দেহাইছি হঁচিশটা! বেহেই খালি উরাত দেহাইছে। অইবো অইবো কইরা হহির বানাইছে। বাহি রইছে কবিরাজ!
কথাগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনল আল্লাদি। কিন্তু কোনো উত্তর দিতে পারল না। চোখের জলে ভাসল সে। মনে মনে বলল,
—কতো মাইনষেরে আবু দুবাইন দেও। আমারে একটা দিলে কি দোষ অয়? মাইনষে খালি খুঁডা দেয়। খুঁডাখুডি হুনতে হুনতে কইলজাডাই হুঁডা অইয়চ্ছে!
রান্না শেষ হলো। কিন্তু আল্লাদির চোখের জলের ধারা বন্ধ হলো না। সে ভাবছে, কাল তার মাকে দেখতে যাবে। গত তিন মাস মায়ের মুখ দেখেনি।
দুজন একসঙ্গে খেয়ে শুয়ে পড়ল। আল্লাদির চোখে ঘুম নেই। একবার মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভাসে, আবার ছাগলের চিৎকারও তার কানে বাজে। আল্লাদির রাত কাটল এপাশ-ওপাশ করে।
খুব সকালে উঠেই ছাগলের ঘরের দরজা খুলল। যা ভাবছিল, তাই!
—এই হুনছো? বখরিডা দি নাই। আমার কী সর্ব্বনাশ অইলো গো!
ঘরের ভেতর থেকে কোনো সাড়া মিলল না।
ঘুমের মানুষ জাগানো যায়। যারা জেগে ঘুমায়, তাদের জাগানো কি আদৌ সম্ভব?
কদরের ঘুম আজ ভাঙবে না। কারণ, ছাগল সে গতকাল বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে।
আহাজারি করতে করতে মাটিতে বসে পড়ল আল্লাদি।
ঠিক এ সময় সামনে এসে দাঁড়াল তার দূরসম্পর্কের এক চাচা।
—আল্লাদি, ও আল্লাদি!
ডাক শুনে হতবাক আল্লাদি! চোখে তার অজানা আশঙ্কা। বুক ধুকপুক করে কাঁপছে। চোখ উঠল কপালে। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করার মতো ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছে।
—চাচা, অত সহালে কৈত্ত আইছো? বাজান আর মা…
কথা শেষ হলো না।
—তর বাহের শইলডা বেশি বালা না। দেখলে তাড়াতাড়ি রোয়ানা দে। মনে অয় বাঁচতো না।
মায়ের মৃত্যুর খবর সহ্য করতে পারবে না বলেই সত্যটা গোপন করল লোকটা।
—আর মায়া? মায়ার কী অবস্থা? ও চাচা, মায়ায় কিতা করে? মায়া কি আছে, না নাই?
চিৎকার করে কান্না শুরু করল আল্লাদি।
কান্না শুনে কদর আলী ঘর থেকে বাইরে এলো। পরিস্থিতি বুঝে একশো টাকা আল্লাদির হাতে দিল।
—যাও, টেম্পো দিয়া যাওগা।
—তুমি যাইতা না?
—আমার কাম আছে।
—আউজগা কাম করন লাগতো না। জামাই অইলেও তুমি, ছেঁড়া অইলেও তুমি। তুমি না গেলে মাইনষে কিতা কইবো!
—মাইনষের কথা হুইন্যা লাভ নাই। আমি উবাস থাহলে মাইনষে ভাত দিত না। তর বাপ মচ্ছে, তুই যা।
—তুমি এইতা কইয়ো না, গুনা অইবো।
—যেডা কইছি হাঁচা কইছি। কিতা দিছে তর বাহে? একটা রেডো দিবার কথা আছিন, দিছে না। আমি যাইয়াম, হেরে দেখতাম?
—ছিছি, তুমি এইতা কিতা কও! রেডোর বদলে টেহা আনছো, মনো নাই?
—চহিডা দিছে? একটা লেপতোশক হর্যন্ত দিলো না। মচ্ছে বালা অইছে।
—তুমি লও। একনজর দেইখ্যাই আইয়া হরবাম।
—কইছি যাইতাম না। আর যাইলে খাডুল্লাত ধইরা কইয়াম, লেপতোশকটি দিয়া কয়বরে যাওহাইন। অহন কও, যাইতাম কি না!
—তোমার যাওন লাগতো না, আমি যাইতাছি।
—যা, তাড়াতাড়ি আইয়া হরিছ। খাওনের আশায় হেট্টা লইয়া বইয়া থাহিস না।
কথাগুলো একদমে বলেই হনহন করে ঘরে চলে গেল কদর।
যে লোকটা খবর নিয়ে এলো, তাকে বসতে পর্যন্ত বলল না।
চোখের জল মুছতে মুছতে অভাগী বাপের বাড়ির পথে রওনা হলো আল্লাদি।
—কদর আলী, তোমার শ্বশুড়ি মইরা গেছে। কথাডা তোমারে কইয়া গেলাম। ছেঁড়িডারে হুনাইছিনা, যুদি সহ্য কত্ত না হারে।
কদর নীরব।
মনে হলো, এবার সে কিছুটা হলেও কষ্ট পেয়েছে। তবে তাকে স্থির মনে হলো না—যতটা কঠোর হয়েছিল শ্বশুরের খবর শুনে।
একমাত্র মেয়ের জামাই। যতটা আদর, ভালোবাসা ও সম্মান পাওয়ার কথা, কদর আলী তার চেয়েও বেশি পেয়েছে।
—জামাই মিয়া, তুমি কি যাইবা?
—না যাই কেমনে! ছোডো বেলা মা মইরা গেছিন। বিয়া কইরা হউরি হাইয়া মার কথা ভুলছিলাম। এইডাও শেষ। আপনে যাওহাইন। আমি আইতাছি।
সন্ধ্যার আগেই দাফন শেষ হলো।
আল্লাদি আহাজারি করে কাঁদছে। তার বাবা একটা চেয়ারে বসে আছেন। কোনো কথা বলছেন না। নীরবে চোখের জল ফেলছেন। শোকে-দুঃখে একেবারে কাঠ হয়ে গেছেন ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধ।
আল্লাদির কান্না শুনে বাড়ির ভেতরে গেল কদর।
আল্লাদির বাবা আবেগে আপ্লুত হয়ে মেয়ের জামাইকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে পড়ে গেলেন। প্রাণপণে চেষ্টা করছেন, কিন্তু উঠতে পারছেন না।
কদর আলী মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে দেখছে। যৌতুক না দেওয়ার ক্ষোভ যেন আরও বেড়ে গেল তার।
আল্লাদি দৌড়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে। অনেক লোক জমল। কেউ আল্লাদিকে সামলাতে ব্যস্ত, কেউ বৃদ্ধকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে।
কদর আলীর অবস্থান অনড়।
আল্লাদির প্রতিবেশী এক দাদি বিষয়টি পরখ করলেন। তারপর চিৎকার করতে করতে বললেন,
—ওরে, ও নাতিন জামাই! লোলা হউড্ডা মাডিত হইরা গইড়াইতাছে, জালিমের মতন খারাইয়া খারাইয়া দেখতাছস?
কদর ইতস্তত বোধ করল। বৃদ্ধার দিকে তাকাল, কিন্তু কী উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারল না।
মূলত শ্বশুরের অসুস্থতার বিষয়টি কদর জানত না।
ইচ্ছা-অনিচ্ছার দোলাচালে একটু এগিয়ে শ্বশুরকে টেনে তুলল কদর।
আল্লাদি পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
কদরের শ্বশুর অনেকটা অপরাধবোধ নিয়েই বলতে লাগলেন,
—জামাই, আমি তোমরার মুখের হাসি দেখতাম, এই আশা নিয়াই আল্লাদিরে তোমার হাতে দিছি। আমার অসুখ না অইলে কোনদিন জিনিসপত্র দিয়াল্লাময়। তুমি গুসা কইরা বিয়ার হর থাইক্যা একটা খবরও নিছ না। আল্লাদি, জামাইরে ঘরও নিয়া খাওন দে।
কদর কোনো কথা বলল না। একবারের মতো জানতেও চাইল না, শাশুড়ি কীভাবে মারা গেলেন!
বৃদ্ধা দাদি মুখ বাড়িয়ে বিরক্তিভরা কণ্ঠে বললেন,
—এই কদইরা, জামাই অইলেও তুই, আর হুলা অইলেও তুই। হউরড্ডা লোলা, হউরি মচ্ছে, তর কতো দায়িত্ব! সহাল থাইক্যা আইয়া কিতা কচ্ছছ?
কদর জবাব দিল না।
বোঝা যাচ্ছিল, না পারছে সইতে, না পারছে কইতে। ধুমধাম করে ঘরের দিকে গেল।
ঘরে গিয়েই আল্লাদিকে তাড়া শুরু করল,
—বেইল শেষ। বাড়িত যাওন লাগবো। তুই গেলে ল।
—আউজগা রাইত আমি থাইক্যা যাই। তুমি যাওগা। বখরিডা বাড়িত না আনলে হিয়ালে খাইয়াালবো।
—তুই যাইতে না।
—তুমি না কল্লে থাকতাম না। লও, যাইগ্যা।
কদর কী জানি ভাবল।
—আইচ্ছা, তর যে কয়দিন লাগে থাক। বাড়িত যাওন লাগদো না।
—তুমি রাগে কইতাছো।
—না। বাজানের অবস্হা যা দেখলাম, কোন সময় কিতা অয় কওন যায় না। তুই থাক। আমি যাই। আমি আইয়া নিয়ামনে।
—আইচ্ছা।
স্বামীর বিদায়ের পথে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল আল্লাদি। কী জানি, এক অজানা আশঙ্কায় তার বুকটা কাঁপছে। এর আগে এমন আর হয়নি।
খানিক বাদে বাবার কাছে গেল আল্লাদি। আস্তে আস্তে বাড়ি খালি হয়ে গেল। রোগাক্রান্ত বাবার শিয়রে বসে মায়ের কথা ভাবে আর চোখের জলে ভাসে।
কদর আলী সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরল ঠিকই। কিন্তু সে একা ফিরল না। সঙ্গে এক মহিলা নিয়ে এলো।
নাম-পরিচয়হীন মহিলাকে নিয়ে দিব্যি সংসার করছে সে। বিষয়টি গ্রামশুদ্ধ জানাজানি হয়ে গেল।
সালিশ বসল।
সালিশে অসংলগ্ন জবানবন্দি। গ্রামবাসী মিলে যথেষ্ট উত্তম-মধ্যম দিয়ে গ্রাম ছাড়তে বলা হলো তাকে।
সেই রাতেই মহিলা-সহ বাড়ি ছাড়ল কদর আলী।
কেটে গেল বেশ কিছুদি
আল্লাদি পথ পানে চেয়ে দিন গোনে। একা আসতে সাহস করে না। গ্রামের সহজ-সরল মেয়ে। বাবা ছাড়া আর কেউ নেই। যদি একটা ভাই থাকত, কিংবা সন্তান, তাহলে সে তার হাত ধরে স্বামীর ভিটায় ফিরতে পারত। কিন্তু কেউ তো নেই তার পাশে।
বাবাকে বিছানায় রেখেই বা কী করে যাবে?
চিন্তায় চিন্তায় এখন সে অনেকটা কাহিল। তাছাড়া বাবার আয়-রোজগারও নেই। সে অন্যের বাড়িতে কাজ করে যা পায়, তা দিয়েই কোনো মতে চলে।
একদিকে স্বামীর চিন্তা, অন্যদিকে বাবা।
কী করবে আল্লাদি?
সে এখন প্রায়ই অসুস্থ থাকে।
তার বাবা খবর পাঠালেন সেই চাচার কাছে, যিনি আল্লাদির বাড়িতে মায়ের মৃত্যুর খবর নিয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি এলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন কিছু হাটবাজার।
—ভাইছাব, খবর দিছইন ক্যারে?
স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন আল্লাদির বাবা।
—তুই আইছস? তরে খবর দিছি, ছেঁড়িডারে হাসপাতালো লইয়া যাইতে।
—ক্যারে, হের কিতা অইছে?
—দেহসনা, খালি জিমায়। ভাত খায় না। যেডাই খায়, বদঅজম অয়।
—আইচ্ছা, এইন ছেঁড়ি, আয়, তরে হাসপাতালো লইয়া যাই।
মাথা নিচু করে সামনে এসে দাঁড়াল আল্লাদি।
—আমার কিনুতা অইছে না। কয়দিন ঘুমাইছি না, এর লাইগ্যাই শইলডা মেজমেজ করে। এইতা কিনু না।
“কয়দিন অইলো মা মচ্চে। বাপটাও যুদি মইরা যায়, তাইলে আমি কই যাইয়াম!”
এবার সে বলল,
—চাচা, তুমি ইট্টু বও। আমি বোখরাডা লাগাইয়া আইতাছি।
ঝটপট তৈরি হয়ে হাসপাতালের পথে রওনা দিল।
যেতে যেতে বলল,
—চাচা, হাসপাতালো টেহা লাগতো না? তুমি খারাও, আমার কাছে একশ টেহা আছে। আনতে মনই নাই।
—লাগদো না। টেহা আছে। তুই চিন্তা করিস না। আমি আওনের সময় তর চাচি পাঁচশো টেহা দিয়া দিছে। কইছিন, তর বাহের লাগিন কিনুতা আনতাম। হতো দোহান একটাও খোলা হাইছি না। টেহাডি বেকটি রইছে।
চিন্তামুক্ত হলো আল্লাদি।
ডাক্তার দেখল। খুশির খবর—আল্লাদি মা হতে চলেছে!
সুখের এক স্বর্গীয় পরশ এসে লাগল আল্লাদির বুকে। এই মুহূর্তে মায়ের মৃত্যু, বাবার অসুখ—কোনোটাই তার মনে নেই। শুধু মনে পড়ছে কদর আলীকে।
কিন্তু সে কোথায়?
হঠাৎ তার মুখটা কালো হয়ে গেল।
সারাটা পথ তার কত কথা মনে পড়ল! কিন্তু মন পুড়তে থাকল কদর আলীর জন্য।
একজন নারীর জীবনে মাতৃত্বের সুখবর যে কত বড় আনন্দ, তা আল্লাদির মুখের আলোতেই যেন ফুটে উঠল।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরল আল্লাদি।
ঘরে এসেই বাবাকে সালাম করল। কপালে চুমু খেল।
—সুখবর! তুমি নানা অইবা!
—আলহামদুলিল্লাহ! জামাইরে খবর দে।
আল্লাদি বলল,
—কাইল সহালে বাড়িত যাইয়াম। হাঞ্জাক্ত আইয়া হরবাম।
—যাইছস নে, আল্লাদি?
—কিতা বাবা?
—বাইলশের তলে একটা কিতা থইয়া গেছে হাসিম ভাইয়ের ছেঁড়াডায়।
—কিতা বাবা?
—বাইলশের তলে একটা কিতা থইয়া গেছে হাসিম ভাইয়ের ছেঁড়াডায়।
—কিতা বাবা?
—চিডির মতো!
বুকটা কেঁপে উঠল আল্লাদির।
না জানি কী!
সে পড়তে জানে।
চিঠি খুলেই চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
কদর আলী তালাকনামা পাঠিয়েছে।
আল্লাদিকে সদর হাসপাতালে নেওয়া হলো।
জ্ঞান ফিরল এক দিন পর।
হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে আল্লাদি। তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা। ডাক্তার খারাপ কিছুর আশঙ্কা করছেন।
আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম আল্লাদির সঙ্গে কথা বলব বলে। শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের পরামর্শে স্টেশনের পথ ধরলাম।
ততক্ষণে আল্লাদির চাচা আমার হাতটা টেনে ধরে বললেন,
—বাজান, এই ছেঁড়িডার লাগিন দোয়া করইন যে।
চোখে জল গড়াল। অব্যক্ত একটা ব্যথা বুকের বাম পাশে অনুভূত হল। মুখ দিয়ে আর কথা বের হলো না। মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফরমে এসে দেখলাম ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। একটু পর ট্রেন ছাড়ল, কিন্তু চাচার মুখ থেকে শোনা কথাগুলো হৃদয়ের তন্ত্রিতে বারবার আঘাত করতে থাকল।
বেঁচে থাকার প্রয়োজনে আমিও একদিন গ্রাম ছেড়ে শহরের পথে পা রাখলাম।
ফেরা হলো না আর।
জানি না, আল্লাদির দুর্ভাগ্যের মেঘ ঢাকা কালো আকাশে সুখের একফালি চাঁদ উঠেছিল কি না!

