গল্পের ভেতরের মানুষ
সুমি ইসলাম
দীর্ঘক্ষণ হিমশীতল পানি দিয়ে গোসল শেষ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জয়ীতা চুপচাপ চুল আঁচড়াচ্ছিল। চিরুনির দাঁতগুলো ধীরে ধীরে চুলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যেন সে চুলের নয়, নিজের ভেতরের জট খুলতে চাইছে।
চোখে কাজল দিল। আয়নায় নিজের চোখ দুটো এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল। মনে হলো, এই চোখ দুটোই তার ভেতরের কথা সবচেয়ে বেশি জানে—সে নিজে কিছু বলে না, তবুও চোখ দুটো কেমন করে সব বুঝে ফেলে।
হঠাৎই গত রাতের কথাগুলো আবার কানের ভেতর বাজতে শুরু করল।
— “দিন দিন তোমার ন্যাকামি বেড়েই যাচ্ছে, জয়ীতা।”
আসিফের গলাটা এখনও যেন দেয়ালে আটকে আছে।
— “এই বাড়িতে তোমার সঙ্গে কথা বলাটাই বিরক্তিকর।”
জয়ীতা তখনও চুপ ছিল।
— “সত্যি বলতে কী, তোমার সঙ্গে একসাথে থাকাটাও দিন দিন অসহ্য হয়ে যাচ্ছে।”
কথাগুলো বলে আসিফ নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল।
জয়ীতা আর কোনো উত্তর দেয়নি।
কিছু কিছু কথার জবাব দেওয়া যায় না। কারণ জবাব দিলেও যে মানুষ শুনতে চায় না, তার কাছে শব্দগুলো অর্থহীন হয়ে যায়।সারা রাত তারা একই ছাদের নিচে ছিল, অথচ দুই ভিন্ন জগতে।
পাশের ঘরের দরজার নিচ দিয়ে আলো বের হচ্ছিল। জয়ীতা জানত, আসিফও জেগে আছে। তবুও কেউ কারও দরজায় কড়া নাড়েনি।
একসময় বিছানায় শুয়ে সে ভাবছিল—মানুষ কি সত্যিই একদিনে বদলে যায়?নাকি বদলে যাওয়াটা এত ধীরে ধীরে ঘটে যে আমরা বুঝতেই পারি না?
যে মানুষটা একসময় তার মন খারাপের কারণ জানতে অস্থির হয়ে উঠত, সেই মানুষটাই আজ তার চোখের জলকে বিরক্তির কারণ মনে করে।
আসিফ যদি একবার নিজের কথাগুলো নিজের কানেই শুনতে পেত, যদি নিজের আচরণগুলো বাইরের কারও চোখে দেখতে পেত, তাহলে হয়তো বুঝতে পারত—
সম্পর্ক ভাঙে না একদিনে।প্রতিদিনের অবহেলা, অসম্মান আর তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ছোট ছোট আঘাত জমতে জমতেই একদিন মানুষ ভেতর থেকে ভেঙে যায়।
জয়ীতা আয়নার দিকে তাকাল।কপালে টিপ দিতে দিতে সে হালকা হাসল। আয়না বলতো কার দুঃখ বেশি? আয়না কোনো উত্তর দিল না।
এই আয়না, এই ঘর, এই বারান্দা—জয়ীতার একমাত্র বন্ধু।
তার আর কোনো বন্ধু নেই। কথা বলার মতো কেউ নেই। যাওয়ার মতো কোনো জায়গাও নেই।
ধীরে ধীরে সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
একসময় বন্ধুদের ফোন এলে গল্প করত। বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখত। অকারণে হাসত।
এখন ফোন বাজলেও ধরতে ইচ্ছে করে না।
মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে নীরবতার সঙ্গে বসে থাকাই সহজ মনে হয়।
ড্রইংরুমে সাজিয়ে রাখা পুরোনো গ্রামোফোনটা চালু করল সে -“পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়…”
গানটা ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
জয়ীতা কিচেনে গেল।কাচের কেটলিতে পানি ভরল।
সুইচ অন করতেই ভেতরে ছোট ছোট বুদবুদ উঠতে শুরু করল।ধীরে ধীরে সেগুলো বড় হতে লাগল।কাঁপতে লাগল।পানি ফুটতে লাগল।যেন ভেতরের চাপ আর ধরে রাখা যাচ্ছে না।
সে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল— “তোমার ফুটে ওঠা তো অন্তত দেখা যায়…— “তুমি ফুটলে সবাই বুঝতে পারে তুমি ভেতরে কষ্টে আছো…”
তার চোখ কেটলির ওপর স্থির— “আর আমি…”
— “আমার ভেতরটাও ঠিক তোমার মতোই ফুটছে…”“কিন্তু বাইরে থেকে কেউ সেটা বোঝে না… জানো তো?”
কেটলির শব্দ আরও বাড়তে থাকে।সে ঢাকনাটা খুলে দিল।ভেতর থেকে গরম বাষ্প উঠে এলো।মুহূর্তের জন্য কাচটা ঝাপসা হয়ে গেল।
জয়ীতার মনে হলো, মানুষের জীবনও বুঝি এমনই।
ভেতরের কষ্টগুলো জমে জমে একসময় সবকিছু ঝাপসা করে দেয়।
কাচের কারুকাজ করা কাপে সে ফুটন্ত পানি ঢালল।
তারপর ধীরে ধীরে কফি মেশাল।গুঁড়ো কফি পানির ভেতরে মিশে যেতে লাগল।যেন প্রতিদিন নিজের ভেতরের সব কষ্টও এভাবেই গিলে ফেলে সে।কাপের ওপরে ধোঁয়া উঠতে শুরু করল।
সে তাকিয়ে রইল।
ধোঁয়াগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে।
হঠাৎ তার মনে হলো—
কিছু কষ্টও কি এমন করে মিলিয়ে যেতে পারে?
নাকি তারা শুধু জায়গা বদলায়?
বুকের এক কোণ থেকে আরেক কোণে গিয়ে লুকিয়ে থাকে?
কাপটা হাতে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে বসল সে।
চুমুক দিতে দিতে হঠাৎই আবার আসিফের কথা মনে পড়ল।আসিফ…শুধু একটা নাম নয়।একটা অভ্যাস।
একটা দীর্ঘ অপেক্ষা।একটা ভারী নীরবতা।সে ভাবে— “সে এখন কোথায় আমার জীবনে?”আমিই বা তার জীবনের কতটা অংশজুড়ে আছি?”
কখন সে কাছের মানুষ থেকে দূরের মানুষ হয়ে গেল?”
মনে পড়ে কিছু কথা।কিছু চুপ থাকা, কিছু অপমান।
আর নিজের ভেতর বারবার ছোট হয়ে যাওয়ার অভ্যাস।সে নিজেকেই প্রশ্ন করে— “আমি কি তার কাছে কখনো মানুষ ছিলাম?”— “নাকি শুধু দরকারের সময়ের একটা উপস্থিতি?” আমি কি ভালোবাসা পেয়েছি… নাকি শুধু সহ্য করা হয়েছে আমাকে?”
— “আমি কি এতটাই সহজ ছিলাম যে, আমাকে ভাঙলেও কেউ বুঝতে পারেনি?”
প্রতিটা প্রশ্ন বুকের ভেতরে ধাক্কা দেয়।সে ধীরে ধীরে কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখে।
টেবিলে ঠক করে একটা শব্দ হয়।তারপর আবার নীরবতা।শুধু গ্রামোফোনে পুরোনো গান বাজতে থাকে।জয়ীতা ধীরে ধীরে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়।
সন্ধ্যার আলো ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে।আকাশের রঙ বদলে যাচ্ছে।সে একবার ঘরের ভেতর তাকাল।
দামী ঝাড়বাতি জ্বলছে।দেয়ালে দামি পেইন্টিং।অভিজাত আসবাবপত্র।সাজানো বুকশেলফ।চকচকে মেঝে।সবকিছু পরিপাটি।সবকিছু সুন্দর।সবকিছু সম্পূর্ণ।এই বাড়িতে স্বচ্ছলতার অভাব নেই।
ঐশ্বর্যের অভাব নেই।যা প্রয়োজন, তার প্রায় সবই আছে।তবুও কোথায় যেন একটা শূন্যতা।কোথায় যেন একটা বিষণ্নতা।কোথায় যেন একটা অদৃশ্য অভাব।
তার মনে হলো—
মানুষ আসলে কত অদ্ভুত!সবকিছু পেয়েও কখনো কখনো সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসটাই হারিয়ে ফেলে।
তার চোখ গ্রামোফোনটার দিকে যায় হঠাৎ মনে পড়ে—
একসময় এই ঘরটা এমন ছিল না হাসির শব্দ ছিল।
অকারণ গল্প ছিল।রাত জেগে সিনেমা দেখা ছিল।এক কাপ কফি ভাগ করে খাওয়া ছিল।
একজনের কথা শেষ হওয়ার আগেই অন্যজন বুঝে ফেলার ক্ষমতা ছিল।
আসিফ অফিস থেকে ফিরলে ঘরটা অন্যরকম হয়ে উঠত।
কথা ছিল, সময় ছিল,যত্ন ছিল, ভালোবাসা ছিল।
তখন এই ঘরটা শুধু ইট, কাঠ আর আসবাবপত্রের সমষ্টি ছিল না।
এটা ছিল একটা আশ্রয়।একটা বাড়ি।একটা সম্পর্কের উষ্ণতা।
জয়ীতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
সবকিছু এখনও আগের মতোই আছে।শুধু ভালোবাসাটা নেই।আর ভালোবাসা চলে গেলে মানুষ বুঝতে পারে—সবচেয়ে দামী ঝাড়বাতিও কখনো ঘরকে আলোকিত করতে পারে না,
যদি সেই ঘরে মানুষের জন্য মানুষের মমতা না থাকে।
তার চোখে জল এসে জমল।কিন্তু সে কাঁদল না,অনেক দিন হলো সে কাঁদে না।
কিছু মানুষ একসময় এত বেশি কাঁদে যে পরে আর চোখের জলও আসে না।
সে খুব আস্তে বলল—
এই গল্পটা শুধু আমার না…”এটা তাদেরও… যারা ভালোবাসে নিঃশব্দে…”আর ভেঙে যায় আরও নিঃশব্দে…”
বাতাস এসে তার চুল উড়িয়ে দিল, সে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
সবাই একভাবে ভাঙে না…”
কেউ সব অপমান, অবহেলা চুপচাপ সহ্য করে যায়…”
নিজেকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দেয়, তবুও বাইরে ঠিক থাকার অভিনয় করে…”
কেউ সেই কষ্ট আর চাপ সহ্য করতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে…”আর কেউ থাকে…”
যে আর কিছুই সহ্য করতে পারে না…”সব কষ্ট একসাথে নিয়ে একদিন নিজেকেই শেষ করে দেয়…”
তার গলা কেঁপে ওঠে।একই কষ্ট… কিন্তু ভাঙার রূপ আলাদা…”
দীর্ঘ নীরবতার পর সে আবার বলে—সব সম্পর্কেই কষ্ট থাকে না…”কিন্তু কিছু সম্পর্ক মানুষকে ধীরে ধীরে নিজের কাছেই অচেনা করে তোলে…”যেখানে অনুভূতির কোনো দাম থাকে না…”
— “সেখানে মানুষ শুধু সহ্য করতে শেখে… ভালোবাসতে না…”
তার চোখ আকাশেই স্থির।চুপ থাকা মানে শক্ত হওয়া না…”অনেক সময় চুপ থাকা মানে সবচেয়ে বেশি ভেঙে যাওয়া…”যে মানুষ বারবার নিজেকে ছোট করে অন্যকে ধরে রাখতে চায়…”
— “সে শেষ পর্যন্ত অন্যকে না… নিজেকেই হারিয়ে ফেলে…”
সন্ধ্যার শেষ আলোটুকুও ততক্ষণে মিলিয়ে গেছে।
গ্রামোফোনে গানটা এখনও বাজছে।
জয়ীতা আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল— “ভালোবাসা কখনো অপমান না…”অবহেলা না…”
আর একতরফা সহ্য করার নামও না…একটা দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর—
— “যেখানে সম্মান নেই… “সেখানে সম্পর্কটা বেঁচে থাকলেও…”
— “মানুষটা ভেতর থেকে মরে যায়…”সে আর কিছু বলে না।
কাপের কফিটা অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে, ঠিক যেমন কিছু সম্পর্ক।
বাইরে থেকে এখনও অটুট দেখায়—কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনেক আগেই শেষ হয়ে যায়।
গ্রামোফোনে পুরোনো গান বাজতে থাকে।
আর নীরবতার ঘরটায়—
জয়ীতা ছাড়া আর কেউ থাকে না।

