শব্দ, স্বপ্ন ও মননের অভিযাত্রায় শব্দঘর
— আশফাকুজ্জামান
একদিন ডাকঘরে এল একটি খাম। খামের ভেতর একটি পত্রিকা। নাম তার ‘শব্দঘর’। হাতে নিতেই মনে হলো, এ যেন কাগজে বাঁধানো ছোট্ট এক জাদুর ঘর। যে ঘরে ঢুকলে গল্প কথা বলে। কবিতা গান শোনায়। আর শব্দেরা মনের মধ্যে ছবি আঁকে।
শব্দঘর আমার খুব প্রিয়। একটি পত্রিকা। প্রথম সংখ্যা থেকেই সম্পাদক মোহিত ভাই আমাকে পত্রিকাটি পাঠান। প্রতিবারই অপেক্ষায় থাকি। কখন আসবে নতুন সংখ্যা! হাতে পাওয়ার পর মনে হয়, নতুন কোনো জগতের দরজা খুলে গেল। প্রতিটি সংখ্যায় থাকে নতুন আয়োজন। নতুন ভাবনা। নতুন আনন্দ।
শব্দঘর বাংলা সাহিত্যের এক নান্দনিক আশ্রয়। এখানে কবিতা আছে। গল্প আছে। প্রবন্ধ আছে। আছে শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনের নানা আয়োজন। দেশের সীমা পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে এর পাঠক। বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা নিয়ে পত্রিকাটি নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। সম্পাদক মোহিত কামালের আন্তরিকতা ও ভালোবাসায় এর পথচলা আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে।
নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৬ সংখ্যাটি বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। এটি গল্পসংখ্যা। প্রচ্ছদে রঙিন অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট,যেখানে বাস্তব কোনো দৃশ্য নেই কিন্তু রং ও রেখার মধ্যে বিচিত্র ভাবনা। ভেতরে নানা স্বাদের গল্পের সমাহার। তবে এবারের আয়োজনের শুরুতেই আছে গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার স্মরণ। উৎসর্গ করা হয়েছে দুই প্রিয় শিশুসাহিত্যিককে। তাঁরা আখতার হুসেন ও আমিরুল ইসলাম। দুজনই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁদের লেখা রয়ে গেছে। তাঁদের গল্পে শিশুরা স্বপ্ন দেখতে শিখবে। নতুন করে চিনতে শিখবে পৃথিবীকে।
তাঁদের স্মরণে লিখেছেন মোহিত কামাল, সুজন বড়ুয়া, হাসনাত আমজাদ, রাশেদ রউফ ও আনজীর লিটন। লেখাগুলোতে আছে স্মৃতি। আছে ভালোবাসা। আছে হারানোর বেদনা।
এরপর শুরু হয় গল্পের মজার ভুবন। আনোয়ারা সৈয়দ হক, ইমদাদুল হক মিলন, হরিশংকর জলদাস, বিশ্বজিৎ ঘোষ, পাপড়ি রহমানসহ অনেক লেখকের গল্প রয়েছে এই সংখ্যায়। কোনো গল্পে আছে বন্ধুত্ব। কোনো গল্পে জীবনের কথা। কোনো গল্পে আছে মানুষের সুখ-দুঃখ। আছে রহস্য ও কল্পনার জগৎ।
বিদেশি লেখকদের গল্পও অনুবাদ হয়ে এসেছে বাংলায়। প্রেমচন্দ, দানিল খার্মস, ঘাসান কানাফানি ও ঝুম্পা লাহিড়ীর মতো লেখকদের গল্প রয়েছে এখানে। ফলে এক পত্রিকাতেই পাঠকের সামনে খুলে যায় নানা দেশের মানুষের জীবন ও ভাবনার দরজা।
শুধু গল্প নয়। আছে সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ, আলোচনা ও গবেষণা। আছে ভাষা নিয়ে নিয়মিত আয়োজন। আছে পুরস্কারের খবর। লিটলম্যাগের কথাও বাদ যায়নি।
ভাবা যায় একটি পত্রিকার কত বৈচিত্র্য, কত সমাহার। এই একসঙ্গে অনেক মানুষের স্বপ্ন থাকে। লেখকেরা তাঁদের কল্পনা দিয়ে সেই স্বপ্ন সাজান। পাঠকেরা তা পড়ে নতুন স্বপ্ন দেখতে শেখেন।
আমার কাছে শব্দঘর তেমনই একটি ভালোবাসার নাম। প্রতিটি সংখ্যা নতুন আনন্দ নিয়ে আসে। তাই নতুন সংখ্যার অপেক্ষায় থাকি। মোহিত ভাইয়ের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
শব্দঘর বেঁচে থাকুক। নতুন প্রজন্মের হাতে হাতে পৌঁছে যাক। শিশুরা পড়ুক। গল্প ভালোবাসুক। বইয়ের পাতায় খুঁজে পাক আনন্দের পৃথিবী।
শুদ্ধ শব্দের এই নান্দনিক গৃহ আলো ছড়াক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
আশফাকুজ্জামান
কবি, প্রবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক

