পরিবেশবিদ মতিন সৈকতের ‘পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ প্রকৃতি’ গ্রন্থের আলোচনা
— আজিম উল্যাহ হানিফ
মানুষের জীবনের সার্থকতা শুধু ব্যক্তিগত অর্জনে নয়। বরং সমাজ, প্রকৃতি ও মানুষের কল্যাণে অবদান রাখার মধ্যেই তার প্রকৃত মহিমা। কৃষি, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়নে প্রায় চার দশকের কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে মতিন সৈকত এ দর্শনকে ধারণ ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন।
চারবার জাতীয় পদক অর্জন, এগ্রিকালচারাল ইম্পর্ট্যান্ট পারসন (এআইপি) হিসেবে স্বীকৃতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইনস্টিটিউট কর্তৃক ইন্টারন্যাশনাল ক্রিয়েটিভ আর্টস অ্যাওয়ার্ড অ্যান্ড ফেলোশিপ অর্জন তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি। কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, নিরাপদ খাদ্য এবং নদী-খাল-জলাশয় সংরক্ষণে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা তাঁর লেখালেখিতেও প্রতিফলিত হয়েছে।
তাঁর রচিত ‘পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ প্রকৃতি’ গ্রন্থটি ধর্মীয় মূল্যবোধ, নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতি, বিশ্বজলসম্পদ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ভাবনাকে একসূত্রে উপস্থাপনের একটি প্রয়াস।
গ্রন্থের বিষয়বৈচিত্র্য ও তাৎপর্য
গ্রন্থের সূচনাপর্বে রয়েছে প্রাথমিক কথা, ভূমিকা ও লেখক পরিচিতি। প্রথম প্রবন্ধ ‘পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত’-এ পানির গুরুত্ব ও সৃষ্টিজগতের সঙ্গে এর সম্পর্ক অনুধাবনের সুযোগ রয়েছে। কুরআনের সূরা আল-আম্বিয়ার ২১:৩০ আয়াতে জীবনের সঙ্গে পানির সম্পর্কের যে তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে, তা মানুষকে পানি ও প্রকৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
পরবর্তী প্রবন্ধগুলোতে বাংলাদেশের নদ-নদী, জলসম্পদ ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ‘আমার নদ কালাডুমুর’, ‘কুমিল্লা শ্যামল মায়া, মেঘনা উদাস—কণ্ঠে তার মনিহার গোমতী তিতাস’, ‘পদ্মারে তোর তুফান দেইখা পরান কাঁপে ডরে’, ‘মেঘবতী মেঘনা’, ‘যমুনা জাগায় জীবনের জয়গান’ এবং ‘স্রোতস্বিনী রাজকন্যা নদী চাই’—শিরোনামগুলোতে নদীর প্রতি লেখকের আবেগ, প্রকৃতিপ্রেম ও নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরিচয় ফুটে উঠেছে।
‘বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতি’ এবং ‘বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে খাল-নদী জলাশয় সংকটে’ প্রবন্ধ দুটি জলসম্পদের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও পরিবেশগত সংকটের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘নাগরিক বর্জ্য থেকে নাগরিক সার’ শিরোনামে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সম্পদের পুনর্ব্যবহারের সম্ভাবনা উঠে এসেছে। অন্যদিকে ‘নির্মল বায়ু বিশুদ্ধ পানি নিরাপদ খাদ্য দূষণমুক্ত পরিবেশ’ এবং ‘পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রতিশোধ হবে ভয়াবহ’ প্রবন্ধের শিরোনামগুলো জনস্বাস্থ্য, পরিবেশদূষণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে।
গ্রন্থটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিশ্বপ্রকৃতির বিস্তৃত পরিসর। ‘সভ্যতার নিদর্শন নীল নদ’, ‘আমাজন পরিবেশ প্রকৃতি জীববৈচিত্র্যের স্বর্গ’ এবং ‘বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দর বন’ প্রবন্ধের পাশাপাশি পদ্মা-মেঘনা-যমুনার গণ্ডি পেরিয়ে ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর, অ্যান্টার্কটিকা ও সুমেরু অঞ্চলের মহাসাগর, আন্দামান, আরব, লোহিত, ভূমধ্যসাগর ও কাস্পিয়ান সাগর নিয়ে আলোচনার আয়োজন গ্রন্থটিকে আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক পরিসর দিয়েছে।
এই বিষয়বিন্যাস থেকে প্রতীয়মান হয়, গ্রন্থটি শুধু পানিসংক্রান্ত ধর্মীয় আয়াতের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং নদী, সাগর, মহাসাগর, বন, জীববৈচিত্র্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ খাদ্য ও পরিবেশগত সংকটকে বৃহত্তর প্রকৃতিচিন্তার আওতায় আনার চেষ্টা করেছে।
লেখক, কর্ম ও চিন্তার সমন্বয়
মতিন সৈকতের দীর্ঘদিনের কৃষি ও পরিবেশবিষয়ক কর্ম-অভিজ্ঞতা গ্রন্থটির বিষয় নির্বাচনে বিশেষ প্রাসঙ্গিকতা যোগ করেছে। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে পানির সম্পর্ক, নদী-খাল ও জলাশয়ের গুরুত্ব এবং পরিবেশদূষণের বহুমাত্রিক প্রভাব তাঁর কর্মপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জাতীয় পর্যায়ে পদক অর্জন ও এআইপি স্বীকৃতি তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য পরিচয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইনস্টিটিউট কর্তৃক ইন্টারন্যাশনাল ক্রিয়েটিভ আর্টস অ্যাওয়ার্ড অ্যান্ড ফেলোশিপ অর্জন তাঁর সৃজনশীল পরিচয়কেও সমৃদ্ধ করেছে।
‘পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ প্রকৃতি’ গ্রন্থে ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশের সম্পর্ক স্থাপনের যে প্রয়াস রয়েছে, তা পাঠককে পানির গুরুত্ব উপলব্ধি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে দায়িত্বশীল হওয়ার অনুপ্রেরণা দিতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে পানিদূষণ, নদী-খাল দখল, জলাশয় সংকোচন, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, কার্যকর উদ্যোগ, সামাজিক সচেতনতা এবং নৈতিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়।
মতিন সৈকতের ‘পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ প্রকৃতি’ গ্রন্থটি ধর্মীয় উপলব্ধি, দেশীয় নদ-নদীর প্রতি মমত্ববোধ এবং বিশ্বপ্রকৃতির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির একটি প্রয়াস। সূচিপত্রের বিষয়বৈচিত্র্য গ্রন্থটিকে পানি, প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে পাঠকের চিন্তার পরিসর প্রসারিত করার সম্ভাবনা দিয়েছে।
পানিকে রক্ষা করা মানে জীবনকে রক্ষা করা, নদীকে বাঁচানো মানে দেশের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত করা, আর প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার অঙ্গীকার। এই চেতনাই গ্রন্থটির মূল আবেদন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
লেখক কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার আদমপুর গ্রামের কৃতিজন। কৈশোরে এসএসসি পরীক্ষার সময় তিনি লেখালেখির জন্য রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন পত্র পেয়েছেন। ১৯৮৭ সালে কবিতা পত্র, ৮৯ সালে অলংকার, ২০০৪ এ মুক্তি চাই, ৫ এ তোমরাতো সুখেই আছো, ২০২৬ সালে পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ প্রকৃতি প্রকাশিত হয়ছে। কুরআন হাদিসের আলোকে খাদ্য অর্থনীতি ও জলবায়ু এবং কুমিল্লার নদ-নদী প্রকাশের কাজ চলছে। তিনি জাতীয় দৈনিকে প্রবন্ধ লেখেন। তার শতাধিক গল্প ও প্রবন্ধ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ছে।

