ডিজিটাল হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা ও আমাদের আলফা (বিটা প্রজন্ম)
— আফসানা ইয়াসমিন অর্থী
ভূমিকা
হ্যামিলনের পুরনো গল্পে বাঁশিওয়ালা শহরের শিশুদের নিয়ে পাহাড়ের ওপারে হারিয়ে গিয়েছিল চিরতরে। আজকের ডিজিটাল যুগে সেই বাঁশিওয়ালার সুর বাজছে আমাদের ঘরে ঘরে — আর এবার তার লক্ষ্য সরাসরি আমাদের সন্তানেরা, আলফা আর বিটা জেনারেশন। প্রশ্ন হলো, আমরা বড়রা নিজেরাই এই বাঁশিতে মজে থেকে কী ধরনের প্রভাব ফেলছি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর?
গবেষণা কী বলছে
সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। ২০২২ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের একটি মেটা-বিশ্লেষণে ৪৯৮টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্ক্রিন-টাইম আর মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যাওয়ার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে। আলফা জেনারেশনের মনোযোগ স্থায়িত্ব আগের প্রজন্মের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে বলে একাধিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে। পাশাপাশি তাদের শারীরিক কর্মকাণ্ডের হারও মিলেনিয়াল প্রজন্মের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
২০২৫ সালের অ্যানি ই. কেসি ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিবেদন বলছে, নয় বছরের কম বয়সী আলফা শিশুদের অভিভাবকদের মধ্যে প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম এবং মনোযোগের ওপর তার প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ডিজিটাল মাধ্যমের সংস্পর্শে থাকার ফলে শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং ভাষাগত বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ঘুমের মান খারাপ হওয়া এবং উদ্বেগ-বিষণ্নতার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কথাও উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়। (সূত্র: Annie E. Casey Foundation, “The Impact of Social Media and Technology on Gen Alpha,” aecf.org; ScienceDirect, “Navigating generation alpha in the digital Age”)
একটি গবেষণায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যে সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাবগুলোর একটি হলো অনলাইনে অন্যের সাথে নিজের জীবনের তুলনা করার প্রবণতা — ঠিক যেমন প্রাপ্তবয়স্করাও করে থাকি।
বাঁশিওয়ালার আসল রূপ
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ডিজিটাল বাঁশিওয়ালা শুধু শিশুদের হাত ধরে পাহাড়ে নিয়ে যাচ্ছে না — সে আগে আমাদের, মানে অভিভাবকদের, মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলেছে। আমরা নিজেরা যখন স্ক্রিনে ডুবে থাকি, সন্তানের সাথে সরাসরি কথা বলার, গল্প করার, খেলার সময় কমিয়ে ফেলি, তখন শিশুরাও স্বাভাবিকভাবে সেই একই পথ অনুসরণ করে। একজন শিশু আজ বাস্তব জগতের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে, কারণ তার চারপাশের বড়রাই তাকে সেই পথ দেখিয়েছে।
ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তার জায়গা
একটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যদি তার মনোযোগ প্রতিনিয়ত খণ্ডিত হতে থাকে, দ্রুত পরিবর্তনশীল কনটেন্টে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা, গভীরভাবে চিন্তা করা বা ধৈর্য ধরে কোনো কাজ শেষ করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এটা শুধু একটা প্রজন্মের সমস্যা নয়, এটা পুরো জাতির ভবিষ্যৎ মেধাবী জনশক্তির প্রশ্ন।
করণীয়
সমাধান শুরু হতে হবে আমাদের নিজেদের থেকেই। শিশুর সামনে নিজের স্ক্রিন-টাইম সীমিত রাখা, তার সাথে সরাসরি সময় কাটানো, বয়স-উপযোগী কনটেন্টের সীমা ঠিক করে দেওয়া, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — শিশুকে বিরক্তি বা অবসর সময়ের সাথে বন্ধুত্ব করতে শেখানো, যাতে সে প্রতিটা ফাঁকা মুহূর্তে স্ক্রিনের দিকে না ঝোঁকে। পাশাপাশি পরিবারে প্রযুক্তিমুক্ত সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে, যেমন খাবার টেবিল বা ঘুমানোর আগের এক ঘণ্টা।
শেষ কথা
গল্পের বাঁশিওয়ালা প্রতিশ্রুতিভঙ্গের শাস্তি হিসেবে শিশুদের নিয়ে গিয়েছিল। আজকের ডিজিটাল বাঁশিওয়ালার কাছে আমাদের অসতর্কতাই যেন সেই প্রতিশ্রুতিভঙ্গ। আলফা আর বিটা প্রজন্মকে এই সুরের মোহ থেকে বাঁচাতে হলে আগে আমাদের নিজেদেরই এই বাঁশির মায়া কাটিয়ে উঠতে হবে।
লেখক: আফসানা ইয়াসমিন অর্থী (Afsana Yesmen Aurthi)
ইন্টারন্যাশনাল চাইল্ড কাউন্সেলর | লেখক | গবেষক
Child Growth and Development Center
তথ্যসূত্র: Annie E. Casey Foundation, “The Impact of Social Media and Technology on Gen Alpha” (aecf.org/blog/impact-of-social-media-on-gen-alpha); ScienceDirect, “Navigating generation alpha in the digital Age: Parental surveillance and Children’s online engagement” (sciencedirect.com)

