নড়াইলের দুই লেখকের এক বিকেলের গল্প, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক: আফরোজা পারভীন
— আশফাকুজ্জামান
কিছু দেখা হওয়ার অন্য রকম গল্প থাকে। থাকে অপেক্ষা ও কৌতূহল। সেই কৌতুহল থেকে সৃষ্টি হতে পারে গল্প। গতকাল ছিল তেমনি এক গল্পের বিকেল।
কবি, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক প্রণব কুমার মজুমদার একজন অসাধারণ মানুষ। বিভিন্ন সময় সাহিত্যের অনুষ্ঠানে দেখা হয়। আমিও কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক হিসেবে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। মূলধারার বিভিন্ন পত্রিকায় সমকালীন বিষয় নিয়ে কলাম, প্রবন্ধ, রম্যগল্প ও ফিচার লিখেছি প্রায় দেড় শতাধিক। মৌলিক ও সম্পাদিত গ্রন্থ রয়েছে প্রায় ১৫টি।
শুভেচ্ছা স্মারক হিসেবে আফরোজা আপাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠস্বর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ শিরোনামে আমার লেখা একটি বই উপহার দিই।
বিভিন্ন সাহিত্য আয়োজনে শিল্প-সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা সুযোগ হয়। অনেক সময় হয় না যে, কোনো কারন ছাড়াই কোন মানুষ কোন মানুষকে পছন্দ করে। সেভাবেই কোন কারণ ছাড়াই হয়তো আমার কোনো আলোচনা প্রণবদের ভালো লেগেছে। তিনি আবার সে কথা জানিয়েছেন আফরোজা আপাকে। সেই থেকে আপা আমার সঙ্গে গল্প করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবু গল্পের ইচ্ছেটা তাঁর মন থেকে যায়নি। প্রায়ই প্রণব দা’কে বলেন, ছেলেটিকে একদিন নিয়ে এসো। আপা আমাকে ছেলেটা বললেও আমার বয়স নিয়ে অহংকার করা যায়।
অবশেষে গতকাল আসে সেই দিন। প্রণব দা নিয়ে গেলেন আপার কাছে। তারপর দেখা হলো। কথা হলো। শিল্প-সাহিত্য থেকে দর্শন। ইতিহাস থেকে জীবনবোধ। কত বিষয়েই না আলোচনায় এলো। কখন যে প্রায় তিন ঘণ্টা কেটে গেল, বুঝতেই পারিনি। মনে হলো, কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনায় আসিনি। এসেছি একান্ত আপনজনের সাথে গল্প করতে।
আফরোজা পারভীন শুধু একজন লেখক নন। তিনি একজন গবেষক, নাট্যকার ও সম্পাদক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব। তাঁর জন্ম নড়াইল। ১৯৫৭ সাল। ৪ ফেব্রুয়ারি। তাঁর পিতা- আফসার উদ্দিন আহমেদ। তিনি ভাষাসৈনিক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব। মা- বেগম মতিয়া আহমেদ। সমাজসেবক ও রাজনীতিক। পারিবারিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি নিজের মেধা, শ্রম ও সাধনায় তিনি গড়ে তুলেছেন স্বতন্ত্র পরিচয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও এলএলবি করেছেন। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘জহির রায়হানের চলচ্চিত্রে মানুষের অধিকার সচেতনতা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’।
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তিনি লেখালেখি করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১২৭টি। সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে নারী জাগরণে অবদান রেখেছেন। এ জন্য তিনি বেগম রোকেয়া পদকসহ বহু সম্মাননা পেয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় অর্জন করেছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। এ ছাড়া দেশ-বিদেশে পেয়েছেন ত্রিশটিরও বেশি পুরস্কার ও সম্মাননা। তিনি ‘রক্তবীজ’ ওয়েব পোর্টালের প্রকাশক ও সম্পাদক।
তাঁর এত অর্জনের কথা জানা ছিল। কিন্তু সামনাসামনি বসে কথা বলার অভিজ্ঞতা ছিল অন্য রকম। শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে কিছুটা ক্লান্ত করে রেখেছিল। তবু কথার মধ্যে তার ছাপ ছিল না। তিনি একের পর এক প্রসঙ্গ তুলে ধরছিলেন। কখনো সাহিত্য, কখনো দর্শন, কখনো মানুষের জীবন ও সমাজ নিয়ে কথা বলছিলেন। তাঁর কথায় ছিল অভিজ্ঞতার ছাপ, চিন্তার গভীরতা আর সহজভাবে নিজের ভাবনা প্রকাশ করার ক্ষমতা।
আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। তিনিও আমার কথা শুনছিলেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলাম। নানা বিষয়ে প্রশ্ন করছিলাম। তিনি আন্তরিকভাবে উত্তর দিচ্ছিলেন। তাঁর কথার ভেতর দিয়ে অনেক অজানা প্রসঙ্গ সামনে এল!। একজন মানুষের দীর্ঘ সাহিত্যজীবন যেন ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে আমার সামনে।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে তাঁর আন্তরিকতা। এত আলোকিত একজন লেখক ও গবেষক। অথচ কথাবার্তায় কোনো দূরত্ব নেই। সহজভাবে কথা বলছেন। অন্যের কথা শুনছেন। নিজের ভাবনা ভাগ করে নিচ্ছেন। এমন পরিবেশে কথা বলতে বলতে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলাই স্বাভাবিক।
প্রায় তিন ঘণ্টা পর যখন সময়ের দিকে তাকালাম, তখন মনে হলো, আরও কিছুক্ষণ বসে থাকি। আরও কিছু কথা শুনি। আরও কিছু প্রশ্ন করি। কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না।
ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল এই সাক্ষাৎ শেখারও একটা সুযোগ। বই পড়ে মানুষকে জানা যায়। তাঁর কাজ ও অর্জন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু সামনাসামনি কথা বললে তাঁর চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধের সঙ্গে অন্যভাবে পরিচিত হওয়া যায়।
একটি ভালো আলোচনা কখনো একপক্ষের কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেখানে দুজন মানুষই একে অন্যের কাছ থেকে কিছু পান। বয়স ও অর্জনের ব্যবধান থাকলেও ভাবনার আদান-প্রদান মানুষকে কাছাকাছি আনে। গতকালের বিকেলে সেই আনন্দই পেয়েছি।
এই সাক্ষাতের পেছনে প্রণব দা’র অবদানও মনে রাখার মতো। তাঁর ভালো লাগা থেকে আফরোজা আপার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। সেই আগ্রহ থেকেই আমাদের দেখা। কখনো কখনো একজন মানুষের বলা ছোট্ট একটি বাক্য আরেকজন মানুষের জন্য খুলে দেয় নতুন দরজা।
নড়াইল আমার জন্মভূমি। এই মাটির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে ভালো লাগে। আর যখন সেই পরিচয়ে একজন গুণী মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া যায়, তখন আনন্দটা আরও বেড়ে যায়।
গতকালের বিকেলটি তাই আমার কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে। সেখানে ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিকতা। ছিল না বক্তৃতার মঞ্চ। ছিল শুধু কথা, অভিজ্ঞতা আর জানার আনন্দ।
কিছু কিছু বিকেল শেষ হলেও এর ভালোলাগা থেকে যায়। পারভীন আপার সঙ্গে কাটানো এই বিকেলও তেমনই। এর পুরোটাই জুড়ে ছিল শিল্প, সাহিত্য, দর্শন ও মানুষের গল্প।
আমাদের সাথে মাঝে মধ্যে যুক্ত ছিলেন এবং সঙ্গ দিয়েছেন আফরোজা আপার বোন শামীমা আপা এবং তার হাজবেন্ড। তারাও খুব অসাধারণ মানুষ। আমাদের সাথে নানা বিষয় গল্প করেছেন। সঙ্গ দিয়েছেন। খুব হাসি খুশি প্রাণবন্ত ছিলেন। আসলেই পরিবারটা একটা সমৃদ্ধ পরিবার পরিবার। সবার প্রতি অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা।
শেষ কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানাই প্রণব দা’কে যিনি এমন একজন মানুষের সাথে এমন একটি পরিবারের সাথে আমাকে সম্পৃক্ত করেছেন।
কবি, প্রাবন্ধিক সাংবাদিক ও সংগঠক

