ফ্রেমের বাইরের ছবি
— এইচ এম ববি।
নারী ও মা’ দিবসের শুভেচ্ছায়, উপহার, উপঢৌকন বিনিময়ের মৌসুমি বাতাসে উৎসবি গন্ধ স্তিমিত হয়ে এসেছে। ফ্রেমের বাইরে গিয়ে এখন চুপিচুপি তাই সত্য কথন চর্চাটা করা যেতেই পারে।
বিভিন্ন টোপ,ভোগলামি আর ছেলে ভুলানো মিথ্যে প্রশংসার মেকি জলে ধুয়ে নারীকে যে আসলে মনুষ্য স্বীকৃতি, সন্মান ও তার যোগ্য প্রাপ্য অধিকার থেকে সুনিপুণ ভাবে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। তা অবোধ নারীরা বোঝেনা।কিছু নারী বুঝতেও চায় না।
নারীর পুর্ণ অধিকার ও প্রকৃত মর্যাদা না আছে কোন ধর্মে, না সমাজে, না আইনে, না কোন কর্মে। কোথাওই নারী প্রকৃত মানুষ নয়, সে শুধুই নারী। তাকে মানুষ থেকে নারী বানিয়ে রাখার মধ্যে বিশেষ এক শ্রেণির মানুষের নানাবিধ ফায়দা, সুবিধা রয়েছে। সেইসব ফায়দার পুরোটাই নিরলস ভোগের সুবিধার্থে নারীকে তাই কখনো সোনার মতো মুল্যবান বস্তু জ্ঞানে গিলাফে মুড়ে সুর্যালোকের আড়ালে বস্তাবন্দী করে রাখা হয়। সুর্যালোক নারীর মুখ দর্শন করলে যেন, পৃথিবী পাপাচারের অন্ধকারে ঢেকে যাবে।
কখনো বা নারীকে মহীয়সী মাতা, ভগ্নি, কন্যা ও স্ত্রী’কে দেবী’র উচ্চতম আসনে বসিয়ে পুজাও করা হয়। কিন্তু পুজা শেষে বিসর্জনের মতোই নারী পরিত্যাজ্য হয়। ঘরে বাইরে নিত্য খাটা একজন সাধারণ পরিচারিকার কাজ আর বছরান্তে বাচ্চা প্রসব করার মেসিন ছাড়া সে কোন গুরুত্বই বহন করে না।
বাণ্যিজিক ভাবেও নারী পণ্য। শুধু আধুনিক বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত মডেল কন্যাদের কথাই কিন্তু বলছি না। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে এখন পর্যন্ত নারী শুধু পুরুষের হাত থেকে হাতে বিক্রি আর সময় ও অবস্থান ভেদে স্থানান্তরিত হয়ে আসছে।
দেশ, ধর্ম ও সংস্কৃতি ভেদে সামান্য তারতম্য থাকলেও নারীকে আগাগোড়া বাণ্যিজিক সম্পদের মোড়ক ছেড়ে বেরিয়ে আসতে দেয়া হয়নি পৃথিবীর কোথাও। হেরফেরের চিত্রটা অনেকটা এরুপঃ
হিন্দু সনাতনী ধর্মে পিতা কন্যাকে দান বা সম্প্রদান করেন স্বামীর হাতে। বিয়ের পর কোন হিন্দু মেয়ে তার বাপের বাড়ির সম্পদ পায় না। তাই তাকে পতি দেবতার হাতে তুলে দেবার সময়ই যৌতুক হিসেবে আসবাবপত্র গয়না, উপহার বা দায়মুক্তির সামান্য কিছু উপঢৌকন সহ নগদ জগন্নাথ দিয়ে বিদায় করা হয়।
মুসলিম ধর্মে এটি দেখা হয় উল্টো দিক থেকে। অর্থাৎ মেয়ের বাবার কাছ থেকে তাকে নগদ দেনমোহর বা কাবিনের টাকার বিনিময়ে স্ত্রী হিসেবে কিনে আনতে হয় স্বামীকে। আরব্যদেশে শুধু গায়ে গতরে পুরুষ হলেই হয় না। অর্থনৈতিক ভাবেও সচ্ছল হতে হয় পুরুষদের। যে পুরুষ যত বেশি সচ্ছল, তারা তাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার সাম্যর্থ অনুযায়ী বহু সংখ্যক নারীকে ক্রয়সুত্রে দাসী বা বৈবাহিক সুত্রে স্ত্রী হিসেবে রাখতে পারেন।
এরকম পত্নী, উপপত্নী, স্বল্পকালীন সময়ের পত্নী বা যৌনদাসী রাখবার বিশেষ সুবিধা তাদের ধর্মীয় অনুশাসন ও প্রথা অনুযায়ীই প্রাপ্য।
যেভাবেই দেখুন না কেন, নারীর একান্ত নিজস্ব কোন পরিচয় বা স্থায়ী আবাসের ঠিকানা নেই। জন্মসুত্রে বাবার ঘরে সে যখন পরিবারের উপর নির্ভরশীলা তখন তাকে বাবার নামের অংশ বহন করতে হয়। বিয়ের পর স্বামীর ঘরে সে যখন আশ্রিতা তখন তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় স্বামীর নাম। পরে, ভাগ্যগুণে পুত্রের ঘরে পোষ্যা হিসেবে কখনো আশ্রয় মিললে মিলতেও পারে। আবার নাও পারে। যদি শেষ বয়সে এটুকু আশ্রয়ও মিলে, তাহলে সে একেবারে উচ্ছিষ্ট পরিত্যাক্তা বৃদ্ধাশ্রম ছাড়া আর কোন গতান্তর থাকে না নারীর।
অথচ, এই নারীই হয়তো ছিলেন কারো কবিতায় তিলোত্তমা। প্রেমে প্রেয়সী। রুপে অপ্সরা। গুণে মহীয়সী। সাহসে বীরাঙ্গনা। জন্মদানে জগৎধাত্রী জননী। সুসন্তানে রত্নগর্ভা। ঘরের লক্ষী অন্যপূর্ণা। আদুরে ঘরে রাজকন্যা। সোহাগী বউ রাজরাণী ইত্যাদি।
আটপৌরে সাধারণ কোন নারীকে যখন রাজরাণী, রাজকন্যা, হুর পরি, অপ্সরা বা দেবীর আসনে বসিয়ে উচ্চ প্রশংসন করা হয়। তখন অবলা নারীরা গলে গিয়ে একেবারে যেন জল হয়ে যান। সেই জলের জলীয় সুবিধাটুকু বেশিরভাগ দূরভিসন্ধি পুরুষই নিজেদের ইচ্ছামত নিংড়ে নিয়ে, আত্মস্বার্থে ব্যবহার করে যায় আজীবন।
বছরান্তে নারী বা মা দিবসের মৌসুম এলেই আবার সরব হয় রসালো সব আদিখ্যেতা। নানান শ্রুতিমধুর স্তুতিবাক্য ঝুড়ি উপুড় করে ঝরানো হয় বিভিন্ন আয়োজিত অনুষ্ঠানে। সেখানে দেখা যায়,
নারীর পক্ষে মাখন মোলায়েম কিছু কবজি কপচানো পুরুষের কন্ঠে দরদ উপচে পড়তে। নারীর অধিকারের বাণী সোচ্চার উচ্চারিত হয় উপস্থিত সুধীজনের কন্ঠে। কিন্তু দিন শেষে, আমুল কোন পরিবর্তন নয়, বরং পরিনতি হিসেবে “যেই লাউ সেই কদুর”ই চর্চা চলে ফের বছরব্যাপী।
আসলে আমরা তৈল আর চাতুর্য বুঝি বেশ। শ্রদ্ধা বা প্রেম বুঝি না। তাই নারীকে আজীবন নারীই বানিয়ে রাখা হয়। মানুষ আর গণ্য করা হয় না।

