ভালোবাসার ভার: দুই কিলোমিটার পথ স্বামীকে কোলে নিয়ে হাঁটা এক স্ত্রীর গল্প
মো. ইমরান হোসাইন
আজকের সময়ে সম্পর্কের ভাঙন যেন খুবই সাধারণ ঘটনা। সামান্য অভিমান, আর্থিক সংকট কিংবা অসুস্থতা —এসবের কাছে অনেক সম্পর্কই হার মেনে যায়। অথচ আমাদের আশপাশেই নীরবে বেঁচে আছেন এমন কিছু মানুষ, যাদের জীবন প্রমাণ করে – ভালোবাসা আসলে কথায় নয়, ত্যাগে; প্রতিশ্রুতিতে নয়, দায়িত্বে।
আমাদের পাশের গ্রামের বাসিন্দা ইদু মিয়া সেই রকমই এক মানুষ। ছোটবেলাতেই তিনি হারান বাবাকে। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা ইদুর মা মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা করেন। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু মানুষের প্রতি তার ছিল অগাধ বিশ্বাস।
ইদু মিয়া ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল স্বভাবের। আমাদের পরিবারের সঙ্গেও ছিল তার আত্মিক সম্পর্ক। তিনি আমার বাবাকে “মামু” এবং মাকে “মাওয়ানি” বলে ডাকতেন। ক্ষুধার্ত হলে আমাদের বাড়ির উঠানে এসে “নানি” বা “মাওয়ানি” বলে ডাক দিতেন। ঘরে যা থাকত, সেটুকুই তাকে খেতে দেওয়া হতো। গ্রামের আরও অনেক মানুষও সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সাহায্য করতেন।
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর গ্রামের মানুষের উদ্যোগে তার বিয়ে হয় হাজেরা আক্তারের সঙ্গে। হাজেরাও ছিলেন এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে; সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে বড় হওয়া এক সংগ্রামী নারী। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল না হলেও তাদের বিয়ে হয়েছিল আন্তরিকতা আর মানুষের ভালোবাসায়।
কিছুদিনের মধ্যেই তাদের সংসার আলোকিত করে জন্ম নেয় একটি ছেলে সন্তান। কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ইদুর বৃদ্ধ মা আর কাজ করতে পারতেন না। সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে হাজেরার কাঁধে। তিনি অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে, কখনো দিনমজুরি করে সংসার চালাতে থাকেন। কাজ না পেলে মানুষের সহায়তায় কোনোমতে দিন কাটত।
এরই মধ্যে ইদু মিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ধীরে ধীরে তিনি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। প্রায়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে অজানা পথে চলে যেতেন। তখন হাজেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে স্বামীকে খুঁজে বাড়ি ফিরিয়ে আনতেন।
অনেকে তাকে নতুন করে জীবন শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, এমন অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে আর কতদিন? কিন্তু হাজেরা কখনো সেই পথ বেছে নেননি। বরং তিনি বিশ্বাস করেছেন, অসুস্থতার সময় মানুষকে ছেড়ে যাওয়া নয়, পাশে থাকাই প্রকৃত দায়িত্ব।
আজ ইদু মিয়া আর নিজের পায়ে হাঁটতে পারেন না। অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানায় পড়ে থাকেন। সম্প্রতি চুল কাটানোর প্রয়োজন হলে হাজেরা আক্তার প্রায় দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার পথ তাকে কোলে করে নাপিতের কাছে নিয়ে যান। কারণ তাদের ভাড়ার টাকা ছিল না, আর স্বামীকে অযত্নেও রাখতে চাননি।
এই দৃশ্য যারা দেখেছেন, তাদের অনেকের চোখেই জল এসেছে। কারণ এটি শুধু একজন স্ত্রীর দায়িত্ব পালন নয়; এটি ভালোবাসার এমন এক বিরল দৃষ্টান্ত, যা কোনো ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন।
ইদু মিয়া ও হাজেরা আক্তারের কোনো জমিজমা নেই, নেই আর্থিক সচ্ছলতা। কিন্তু তাদের আছে একে অপরের প্রতি অটুট আস্থা, দায়িত্ববোধ এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
আমাদের সমাজে এমন মানুষদের গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে। অথচ তারাই নীরবে আমাদের শেখান একটি সম্পর্ক টিকে থাকে সম্পদের জোরে নয়, বরং ত্যাগ, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার শক্তিতে।
হাজেরা আক্তারের মতো নারীরা হয়তো কোনো পুরস্কার পান না, ইতিহাসের পাতায়ও তাদের নাম লেখা হয় না। কিন্তু মানবতার ইতিহাসে তারা এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবেন। কারণ ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা অনেক সময় লেখা হয় না—নীরবে, প্রতিদিনের জীবনে বেঁচে থাকে।

