সব প্রকল্পের আগে চাই মানুষ গড়ার প্রকল্প
মনিরুল ইসলাম
পর্ব ১: যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে থেকে গিয়েছিলাম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একবার দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। জীবনের সামনে নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে দেওয়ার মতো সুযোগ, কিন্তু যাইনি। যেতে মন সায় দেয়নি। তারুণ্যের সেই সময়ে বুকের ভেতর এক ধরনের প্রবল আবেগ কাজ করত—এই দেশ আমার, এই মাটি আমার, এই মানুষের মাঝেই আমার শিকড়। নিজের দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে ভালো থাকার চেয়ে নিজের দেশে থেকে দেশের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়াকেই অনেক বেশি অর্থপূর্ণ মনে হয়েছিল।
তারপর কত বছর চলে গেল! তারুণ্য পেরিয়ে যৌবন, যৌবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে জীবন এখন বার্ধক্যের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। মাঝেমধ্যে পেছন ফিরে তাকালে নিজের কাছেই একটি প্রশ্ন ফিরে আসে—যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে একদিন থেকে গিয়েছিলাম, সেই বাংলাদেশ কি আজও পেয়েছি?
প্রশ্নটির উত্তর এক কথায় দেওয়া কঠিন। দেশ এগিয়েছে—এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। রাস্তাঘাট হয়েছে, সেতু হয়েছে, বড় বড় অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তির বিস্তার ঘটেছে, অর্থনীতির আকার বেড়েছে। একসময় যা আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল, তার অনেক কিছুই আজ বাস্তব। তবু কোথায় যেন একটি গভীর অপূর্ণতা থেকে গেছে। আমরা কি শুধু অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি দেশ চেয়েছিলাম, নাকি এমন একটি বাংলাদেশও চেয়েছিলাম যেখানে উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষ হবে সৎ, মানবিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ, সহনশীল ও দায়িত্ববান?
রাস্তায় বের হলে দেখি, নিজের ঘর পরিষ্কার করে ময়লার প্যাকেটটি রাস্তায় ফেলে দিতে আমাদের অনেকেরই দ্বিধা হয় না। নিজের বাড়িটি সুন্দর রাখতে চাই, অথচ বাড়ির সামনের রাস্তাটিও যে আমার, সেই বোধটি কেন যেন কাজ করে না। সরকারি হাসপাতাল, অফিস-আদালত কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোথাও দায়িত্বহীনতা, কোথাও অব্যবস্থাপনা, কোথাও ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ। চাকরি পাওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়া হয়, আবার চাকরিতে ঢুকে সেই অর্থ তুলে আনার জন্য অসৎ পথ খোঁজার ঘটনাও ঘটে। একটি অন্যায় আরেকটি অন্যায়ের জন্ম দেয়; ধীরে ধীরে সেটিই যেন সমাজের স্বাভাবিক আচরণ হয়ে উঠতে থাকে।
রাজনীতি ও সামাজিক জীবনেও একই সংকটের নানা রূপ। মতের অমিলকে আমরা অনেক সময় মতের অমিল হিসেবে নিতে পারি না; প্রতিপক্ষকে প্রতিযোগী নয়, শত্রু ভাবি। সেই অসহিষ্ণুতা কখনো ঘৃণায়, কখনো সহিংসতায় পৌঁছে যায়। ক্ষমতার ছায়ায় গুম, খুন ও নিপীড়নের অভিযোগ যেমন বিবেককে আহত করে, তেমনি কর ফাঁকি, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনিয়ম, সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ লোপাটের খবরও হতাশ করে। বাজারে সুযোগ বুঝে দাম বাড়ানো, ব্যক্তিস্বার্থে নিয়ম ভাঙা, প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়া—সবকিছুর মধ্যেই যেন একটি অভিন্ন মানসিকতা কাজ করে: নিজের লাভটুকুই আগে। আমরা চাই অন্য মানুষটি সৎ হোক, কিন্তু নিজের স্বার্থের প্রশ্ন এলে অনেক সময় সততার সংজ্ঞাই বদলে ফেলি।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ও সম্মান থাকা জরুরি। একজন পুলিশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা যেমন সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কেউ ঘুষ, পক্ষপাত কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে সেটিও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর সঙ্গে আছে মাদকের ছোবল, তরুণদের একটি অংশের দিশাহীনতা, সাংবাদিকতার আড়ালে অপসাংবাদিকতা, জমিজমার বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা, ছিনতাই, সহিংসতা ও সামাজিক অসহিষ্ণুতা।
এসবের প্রতিকারে আমরা আইন করি, অভিযান চালাই, কমিটি করি, প্রতিষ্ঠান গড়ি, প্রকল্প নিই। কোনো কোনো উদ্যোগে সাফল্যও আসে। কিন্তু কিছুদিন পর একই রোগ অন্য কোনো চেহারা নিয়ে আবার ফিরে আসে।
তখন প্রশ্ন জাগে—এত আইন, এত প্রতিষ্ঠান, এত প্রকল্পের পরও কাঙ্ক্ষিত ফল আমরা কেন পাই না?
আমার মনে হয়, আমরা দীর্ঘদিন ধরে রোগের উপসর্গের চিকিৎসা করছি; কিন্তু রোগের শিকড়ে যথেষ্ট পৌঁছাতে পারিনি। আমরা রাস্তা বানিয়েছি, কিন্তু সেই রাস্তা নিজের সম্পদ মনে করার নাগরিক কতটা বানিয়েছি? হাসপাতাল বানিয়েছি, কিন্তু রোগীর যন্ত্রণাকে নিজের দায় বলে অনুভব করার সেবাবোধ কতটা গড়ে তুলেছি? বিদ্যালয়-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে, ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু শিক্ষা আর সুশিক্ষা যে এক নয়, সেই সত্যটি কতটা গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছি?
হয়তো আমাদের সমস্যার গভীরে আরও একটি বড় প্রশ্ন আছে—আমরা অনেক কিছু গড়েছি, কিন্তু মানুষ কতটা গড়তে পেরেছি?
তাই আসুন, মানুষ গড়ি; মানুষ হই।
লেখক: কবি, গবেষক, কথাসাহিত্যিক

