কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ একজন মানুষ কবি মতিন সৈকত:
আজিম উল্যাহ হানিফ
এম. এ. মতিন—সবার কাছে পরিচিত মতিন সৈকত নামে । কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার আদমপুর গ্রামের একজন শিক্ষক, লেখক, কৃষি ও পরিবেশ সংগঠক, সমাজকর্মী এবং প্রকৃতিপ্রেমী। চার দশক ধরে তিনি কৃষক, কৃষি, নদী-খাল, জলাশয়, জীববৈচিত্র্য, নিরাপদ খাদ্য ও গ্রামীণ সমাজ উন্নয়ন নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করে আসছেন। তাঁর কাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি শুধু বক্তৃতা বা প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে নিজ এলাকায় বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
১. জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
মতিন সৈকতের জন্ম ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩, কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার আদমপুর গ্রামে। তাঁর পিতা কেরামত আলী ছিলেন সমাজসেবী এবং মাতা সাহানারা বেগম ছিলেন গৃহিণী।
শৈশব থেকেই সাহিত্য, প্রকৃতি, কৃষি ও গ্রামীণ জীবনের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তীতে শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষি, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়নকে তিনি নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন।
২. শিক্ষা ও পেশা
মতিন সৈকত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
তিনি পেশায় শিক্ষক ও সহকারী অধ্যাপক। পাশাপাশি তিনি প্রশিক্ষক, রিসোর্স পারসন, লেখক এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠক হিসেবে কাজ করছেন।
তাঁর পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শিক্ষকতার সঙ্গে মাঠের কৃষি ও পরিবেশ আন্দোলনকে যুক্ত করা। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে তাঁকে পরিবেশবিদ, কৃষি-উদ্ভাবক, সমাজ সংগঠক, শিক্ষাবিদ, সহকারী অধ্যাপক ও লেখক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. কৃষক ও কৃষির বন্ধু
মতিন সৈকতের কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কৃষকের পাশে দাঁড়ানো।
১৯৯৭ সালে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তিনি কৃষকদের সেচসহ বিভিন্ন কৃষি সহায়তা কার্যক্রমে আরও সক্রিয় হন। তিনি আদমপুর, পুটিয়া ও সিঙ্গুলা এলাকার কৃষকদের জন্য দীর্ঘদিন অত্যন্ত কম মূল্যে সেচসেবা দেওয়ার উদ্যোগ চালিয়ে আসছেন। The Financial Express-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি প্রতি বিঘা জমিতে মাত্র ২০০ টাকা সেচমূল্যে পানি সরবরাহ করেছেন।
এই উদ্যোগ তাঁকে স্থানীয় কৃষকদের কাছে “কৃষকের বন্ধু” হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।
৪. বিষমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন
মতিন সৈকতের সবচেয়ে পরিচিত কর্মসূচিগুলোর একটি হলো বিষমুক্ত কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন।
তিনি কৃষকদের—
কীটনাশকের ব্যবহার কমানো,
সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা IPM,
সমন্বিত শস্য ব্যবস্থাপনা বা ICM,
পার্চিং, সেক্স ফেরোমন ফাঁদ, জৈবসার, কম্পোস্ট, সবুজসার, খামারজাত সার
ব্যবহারে উৎসাহিত করেছেন।
২০০৬ সালে তিনি প্রায় ১০ হাজার কৃষককে নিয়ে IPM-ICM ক্লাব গঠনের উদ্যোগ নেন বলে জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর এই ধারাবাহিক কাজের সঙ্গে দাউদকান্দির বিষমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগও যুক্ত হয়েছে।
ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে তাঁর উদ্যোগসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনের কথাও The Financial Express প্রকাশ করেছে।
৫. নদী, খাল ও জলাশয় রক্ষার আন্দোলন
মতিন সৈকতের কর্মজীবনের আরেকটি বড় অধ্যায় নদী-খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার।
বিশেষ করে তিনি কালাডুমুর নদী পুনঃখনন, টামটা-বিটমান খাল, সুন্দলপুর খালসহ বিভিন্ন জলাধার রক্ষার আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন। জাতীয় পরিবেশ পদকের স্মারক-ভিত্তিক প্রতিবেদনে কালাডুমুর নদীর ১১ কিলোমিটার পুনঃখননের আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কালাডুমুর নদী পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর উদ্যোগের সঙ্গে কৃষি সেচ, বোরো ধান উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ এবং স্থানীয় জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ও যুক্ত ছিল।
এ কারণে তাঁর পরিবেশচিন্তায় নদীকে শুধু পানি প্রবাহের মাধ্যম হিসেবে নয়—কৃষি, মাছ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়।
৬. পাখি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ
মতিন সৈকতের পরিবেশকর্মের একটি আবেগময় অধ্যায় হলো পাখি ও বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণ।
প্রকাশিত তথ্যে আহত ও ধৃত পাখি উদ্ধার, চিকিৎসা এবং প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার কথা রয়েছে। জাতীয় পরিবেশ পদকের স্মারক-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি বিপুলসংখ্যক পাখি এবং বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও চিকিৎসা করে অবমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
পাখির আবাসস্থল তৈরির জন্য গ্রামে হাঁড়ি, কলসি ও ঝুড়ি দিয়ে কৃত্রিম বাসা তৈরির উদ্যোগও তাঁর প্রকৃতিপ্রেমের একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।
৭. প্লাবনভূমিতে মৎস্যচাষ
মতিন সৈকতের কাজের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র হলো প্লাবনভূমির সমাজভিত্তিক মৎস্যচাষ।
তাঁর বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে—
২০০০ সালে আপুসি মৎস্য প্রকল্প — ২৫০ বিঘা
২০০১ সালে বিসমিল্লাহ মৎস্য প্রকল্প — ১০০ বিঘা
২০১৮ সালে আপুবি মৎস্য প্রকল্প — ৪০০ বিঘা
এসব উদ্যোগে মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি বর্ষায় প্লাবনভূমির পানিকে কাজে লাগানো, কৃষি ও মৎস্যের সমন্বয় এবং স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর লক্ষ্য ছিল।
দাউদকান্দির প্লাবনভূমিতে মৎস্যচাষকে মডেল হিসেবে গড়ে ওঠার বিষয়টিও তাঁর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পুরোনো জাতীয় সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
৮. বাংলাদেশ পরিবেশ স্কুল
মতিন সৈকতের একটি বিশেষ উদ্যোগ হলো বাংলাদেশ পরিবেশ স্কুল প্রতিষ্ঠা।
তিনি ২০২১ সালে আদমপুরে এই উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি পরিবেশ শিক্ষা, গবেষণা, সচেতনতা ও প্রকৃতি সংরক্ষণে একটি স্থানীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
এ উদ্যোগের মূল দর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—শিশু-কিশোরদের শুধু বইয়ে পরিবেশ শেখানো নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
৯. Citizen Fertilizer ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
মতিন সৈকতের পরিবেশচিন্তার একটি সৃজনশীল দিক হলো “Citizen Fertilizer” ধারণা—অর্থাৎ মানুষের তৈরি জৈব বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করে কৃষির জন্য সার হিসেবে ব্যবহার করা।
এর মাধ্যমে তাঁর কাজের তিনটি বিষয় এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়—
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা → জৈবসার → নিরাপদ কৃষি।
এটি তাঁর পরিবেশ আন্দোলনকে শুধু বৃক্ষরোপণ বা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং কৃষি ও পরিবেশের একটি সমন্বিত মডেলের দিকে নিয়ে গেছে।
১০. জাতীয় স্বীকৃতি ও পুরস্কার
মতিন সৈকতের কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
জাতীয় কৃষি পুরস্কার
তিনি ২০১০ ও ২০১৭ সালে দুইবার জাতীয় কৃষি পদক লাভ করেন।
জাতীয় পরিবেশ পদক
২০২১ সালের জাতীয় পরিবেশ পদকে পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ ক্যাটাগরিতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মতিন সৈকত নির্বাচিত হন।
অর্থাৎ কৃষি ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই জাতীয় পর্যায়ে তাঁর কাজের স্বীকৃতি রয়েছে।
AIP
তিনি Agricultural Important Person (AIP) সম্মাননাও পেয়েছেন। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে কৃষিক্ষেত্রে অবদানের জন্য তাঁর AIP সম্মাননা পাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
International Creative Arts Award & Fellowship (University of Dhaka), 2025-ও তাঁর সম্মাননার তালিকায় রয়েছে।
১১. রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন
১৯৮৭ সালে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দনপত্র তাঁর কর্মজীবনের প্রারম্ভিক স্বীকৃতিগুলোর একটি।
এটি তাঁর দীর্ঘ কর্মযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
১২. সংগঠন ও নেতৃত্ব
মতিন সৈকত বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষি, পরিবেশ, পানি ও সমাজ উন্নয়নভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।
তাঁর সঙ্গে যুক্ত উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—
Bangladesh Environment School
SAFE Bangladesh / Safe Bangladesh Nature, Agriculture & Waterbody Movement
কৃষি-পরিবেশ আন্দোলন
খাল-নদী-জলাধার সংরক্ষণ আন্দোলন
পরিবেশ সচেতনতা ও নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন
তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সঙ্গেও যুক্ত। বাপা জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং লাইফ মেম্বার।
কুমিল্লা অঞ্চলে পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন।
১৩. লেখক মতিন সৈকত
মতিন সৈকতের আরেকটি পরিচয়—তিনি লেখক।
কৃষি, পরিবেশ, প্রকৃতি, পানি, সমাজ, ইসলাম ও মানুষের জীবন নিয়ে তাঁর লেখালেখি রয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর গ্রন্থ:
“পানি সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও পরিবেশ প্রকৃতি”
এই গ্রন্থে পানি, প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ে কুরআনের আয়াতকে কেন্দ্র করে পরিবেশ-সচেতনতার একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
বর্তমানে তাঁর জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক নিয়ে বই, প্রবন্ধ, জীবনী, স্মৃতিচারণ ও তথ্যচিত্রধর্মী লেখা প্রস্তুত করছেন—এটিও তাঁর লেখকসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ।
১৪. তাঁর কর্মদর্শনের মূল কথা
মতিন সৈকতের দীর্ঘ কর্মযাত্রাকে কয়েকটি শব্দে প্রকাশ করলে বলা যায়—
কৃষক → কৃষি → পানি → নদী → মাছ → পাখি → জীববৈচিত্র্য → নিরাপদ খাদ্য → পরিবেশ → মানুষ।
অর্থাৎ তাঁর কাছে পরিবেশ সংরক্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে মাটি ও পানি রক্ষা করতে হবে, পানি রক্ষা হলে নদী-খাল বাঁচবে, নদী-খাল বাঁচলে মাছ ও জীববৈচিত্র্য বাঁচবে—আর সবশেষে মানুষই উপকৃত হবে।
এক কথায় মতিন সৈকত
মতিন সৈকত হলেন দাউদকান্দির মাটি, পানি, কৃষক, নদী, খাল, পাখি ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একজন মাঠভিত্তিক সমাজ-পরিবেশ সংগঠক।
তাঁর বিশেষত্ব শুধু পুরস্কারের সংখ্যায় নয়; বরং তিন দশকের বেশি সময় ধরে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে থেকে কৃষি, নিরাপদ খাদ্য, সেচ, নদী-খাল পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য, পাখি সংরক্ষণ ও পরিবেশ শিক্ষাকে একই কর্মধারায় যুক্ত করার প্রচেষ্টায়। জাতীয় সংবাদমাধ্যমেও তাঁর এই দীর্ঘ কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতি পাওয়া যায়।
এছাড়াও তিনি বইপড়া এবং পাঠাগার আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত। ১৯৮৭ সালে তিনি গড়ে তুলেন অলংকার সাহিত্য সংসদ পাঠাগার।

