ধানমন্ডি আড্ডার-
এক নান্দনিক বিকেলের গল্প…
আনন্দ-বেদনা যেখানে-
শব্দে গাথা…
ধানমন্ডি আড্ডা শব্দপ্রেমী জনের আনন্দের ঠিকানা। সাহিত্যপ্রেমীদের এক অপূর্ব মিলনমেলা। প্রতিমাসে এখানে কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও শিল্প-সাহিত্যের আলোচনা হয়। এ যেন ব্যস্ত শহরের এক ছোট্ট সাহিত্য দ্বীপ। রাজনীতি, সময়, জীবন, সব যেন দ্রুত বদলে যায়। কিন্তু মানুষ যতদিন স্বপ্ন দেখবে, ততদিন সাহিত্য থাকবে। আর যতদিন সাহিত্য থাকবে, ততদিন কোথাও না কোথাও এমন আড্ডা হবেই। যেখানে মানুষ শব্দের ভেতর দিয়ে নিজেকে খুঁজবে।
গতকাল ধানমণ্ডি–আড্ডার ১৯তম আয়োজনে ছিল ‘শিখা গোষ্ঠী : ভাব সংঘাত, ভাব সমন্বয়’ শিরোনামে এক প্রাণবন্ত আলোচনা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক সোহানুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন কবি ও কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ শামসুজ্জামান। আলোচনায় অংশ নেন কবি ও প্রাবন্ধিক সৈকত হাবিব এবং প্রাবন্ধিক ও গবেষক মামুন সিদ্দিকী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবিদের নির্বাচিত কবিতা পাঠ এবং তজিরুল ইসলাম-এর সংগীত পরিবেশনা আড্ডাকে আরও সমৃদ্ধ করে। ধানমণ্ডি–আড্ডার সভাপতি মোহিত কামাল এবং সাধারণ সম্পাদক নূর কামরুন নাহারের আন্তরিক আয়োজনে এক স্মরণীয় সন্ধ্যা হয়ে ওঠে।
‘শিখা’-একটি পত্রিকা এক বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের প্রতীক।
শিখা গোষ্ঠীর ভাবসংঘাত ছিল অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ও মানসিক জড়তার বিরুদ্ধে। বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আধুনিক চিন্তার প্রতি শ্রাদ্ধাশীল। ধর্ম ও যুক্তি, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে একটি সৃজনশীল সমন্বয়ের পথই ছিল তাঁদের লক্ষ্য।
এর অমর উচ্চারণ:
‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’
তখন ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ। এই সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র ছিল ‘শিখা’। ১৯২৭ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে মোট পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। কিন্তু বাংলা মুসলিম সমাজের চিন্তা-জগতে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
শিখা গোষ্ঠীর স্বপ্ন ছিল, একজন মানুষ একই সঙ্গে আদর্শ মুসলমান এবং খাঁটি বাঙালি হতে পারেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চাকে তারা বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।
তাঁরা ইসলামের মানবিক ও নান্দনিক মূল্যবোধকে ধারণ করেছেন, আবার পাশ্চাত্যের রেনেসাঁ, বসমন্বয় ছিল উদার, মানবিক, মুক্তবুদ্ধি ও আধুনিক সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন। এই আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন আবুল হুসেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, আব্দুল কাদির, মোতাহের হোসেন চৌধুরী এবং চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেনসহ আরও অনেক প্রগতিশীল মানুষ। তাঁদের লেখা বাংলা মুসলিম সমাজে যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ ও মুক্তচিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
শিখা পত্রিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল, এটি সাহিত্যকে কেবল নন্দনতত্ত্বের বিষয় হিসেবে দেখেনি, সমাজ-সংস্কার, শিক্ষা, নারীজাগরণ, বিজ্ঞান, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রশ্নেও সাহসী অবস্থান নিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, পাশ্চাত্য দর্শন ও বিশ্বসাহিত্যের নানা ধারা নিয়ে মুক্ত আলোচনা ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
অবশ্য এই মুক্তচিন্তার মূল্যও দিতে হয়েছে। রক্ষণশীল সমাজের তীব্র বিরোধিতা, সামাজিক আক্রমণ ও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন উদ্যোক্তারা।
সম্পাদক আবুল হুসেনকে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৩১ সালে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। তবু মাত্র পাঁচটি সংখ্যার জীবনকালেই ‘শিখা’ প্রমাণ করে—একটি পত্রিকার শক্তি তার আকারে নয়, তার চিন্তায়। বাংলা মুসলিম সমাজে আধুনিক মনন, যুক্তিবাদ, মানবিকতা ও মুক্তবুদ্ধির যে আলোকশিখা তারা জ্বেলেছিলেন, তার দীপ্তি আজও নিভে যায়নি।
শিখা মনে করিয়ে দেয়—অন্ধ অনুকরণ নয়, মুক্ত চিন্তাই সভ্যতার অগ্রযাত্রার প্রধান শর্ত। তাই আজও তাদের উচ্চারণ সমান প্রাসঙ্গিক-‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’
ধানমণ্ডি –আড্ডা মানেই এক অন্যরকম সাহিত্যো উৎসব। গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ সাহিত্য, সাক্ষাৎকার, কবিতা সব মিলে যেন এক পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য আড্ডা। এই আড্ডায় গতকাল ছিল সাহিত্যের প্রতি মানুষের ভালোবাসার এক উজ্জ্বল উৎসব।
হয়তো বহু বছর পরে এই সন্ধ্যার কথা অনেকের মনে পড়বে। মনে পড়বে এক সন্ধ্যা ছিল, যেখানে লেখকেরা জড়ো হয়েছিল শুধু সাহিত্যের টানে। আর এই সাহিত্যে হয়তো একদিন হয়ে উঠবে সময়ের ইতিহাস।
গ্রিক পুরাণের দেবতা প্রমিথিউস। তিনি মানুষের জন্য আগুন এনেছিলেন। আর সেদিন থেকে বদলে গিয়েছিল মানুষের জীবন। কিন্তু সভ্যতার আরেক বিস্ময়কর আবিষ্কার সাহিত্যে। আগুন উষ্ণতা দেয়, কিন্তু সাহিত্যে দেয় প্রেম, ভালোবাসা, সম্পর্ক, স্মৃতি। সাহিত্যে থেকেই জন্ম নেয় গল্প, উপন্যাস কবিতা ও জীবনের বলা না বলা কথা। আর সেই সাহিত্যেরই এক দীপ্ত সমাবেশ ধানমন্ডি আড্ডা। ধানমন্ডি আড্ডা এমন এক ঠিকানা যা পাঠকের হৃদয় আলোকিত করে।
এ আড্ডার সভাপতি-কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল ও সাধারণ সাম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক নূর কমরুন নাহার মনে করেন সাহিত্য হলো আত্মার সঙ্গে সংলাপ। সেই বিশ্বাস থেকেই এই আড্ডাকে এগিয়ে নিতে চান।
ধানমণ্ডি আড্ডায় উপস্থিত থাকেন দেশ বরেন্য কবি, লেখক, আলোচক, সমলোচক, গল্পকার, উপন্যসিক, অনুবাদক, প্রবন্ধরকারসহ আরও অনেকে। এখানে কেউ গল্পের ভাষা নিয়ে বলেন। কেউ কবিতা, কেউ বা আবার অনুবাদ সাহিত্যে নিয়ে বলেন। ধানমণ্ডি আড্ডা যেন নতুন লেখকের সম্ভাবনা ও সমকালীন বাংলা সাহিত্যের পথরেখা।
নূর কামরুন নাহারের উপস্থাপনায় কখনো হাসির ঝলক, কখনো নীরবতা সব মিলে ধানমণ্ডি আড্ডা উপহার দিল এক অসাধারণ প্রাণবন্ত সাহিত্যসন্ধ্যা। সাহিত্যের অনুষ্ঠান এমনই এটি একই সঙ্গে ভাবায়, আনন্দ দেয়, প্রশ্ন করতে শেখায়।
১৩১ বার পড়া হয়েছে

