পঞ্চাশ বছরের আলোকযাত্রায় শিল্প স্মৃতি ও ভালোবাসার এক সন্ধ্যা
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছিল। তখনও থামেনি শহরের ব্যস্ততা। কিন্তু ত্রিলোক-এর আঙিনায় শুরু হয়েছিল এক অন্য সময়। সেখানে ঘড়ির কাঁটা নয়, সময়কে মাপা হচ্ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসায, সংগীত, হাসি গান আর আনন্দ আলোচনায়। মনে হচ্ছিল, এই সন্ধ্যা যেন আবৃত্তি শিল্পী ইতিহাসের এক জীবন্ত পুনর্মিলন।
কেউ জন্মদিন পালন করেন কেক কেটে। কেউ ফুল আর উপহারের আনুষ্ঠানিকতায়। কিন্তু কিছু জন্মদিন আছে, যা ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে একটি শিল্পযাত্রার উৎসব, এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা। মাসুম আজিজুল বাসার-এর সুবর্ণজয়ন্তী ছিল তেমনই এক বিরল আয়োজন। যেখানে একজন মানুষের জন্মদিন ধীরে ধীরে রূপ নিল অনন্য বর্ণিল উৎসবে। 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর পঙ্ক্তি যেন সেদিনের পরিবেশকে অনবদ্যভাবে ধারণ করেছিল—
‘এ দিন আজি কোন্ ঘরে গো
খুলে দিল দ্বার।
আজি প্রাতে সূর্য ওঠা
সফল হল কার…’
সত্যিই যেন একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল—শিল্প, সাহিত্য, বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার এক অপূর্ব মিলনমেলায়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রখ্যাত অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি, স্মৃতিমাখা কথন এবং আবৃত্তির মাধুর্যে সন্ধ্যা পেয়েছিল এক ভিন্ন মাত্রা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিমুল মুস্তাফা, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ছড়াকার রহিম শাহ, বহুমাত্রিক কবি, সংগীত ও চিত্রশিল্পী শেখ রবিউল হক, আবৃত্তিশিল্পী মাসকুর-এ কল্লোল ও কামরুল হাসানসহ আরও অনেকে গুণীজন। তাঁদের বক্তব্যে এসেছে আবৃত্তি শিল্পী আজিজুল বাসারকে নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন, শিল্পচর্চার দীর্ঘ পথচলা, অভিজ্ঞতা, আগামী দিনের প্রত্যাশা।
অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল হাসি, স্মৃতিচারণ, রসিকতা, আবৃত্তি, গান এবং শিল্পভাবনার গভীর আলাপ। কেউ বলেছেন কবিতার কথা, কেউ মানুষের কথা, কেউ উচ্চারণের দায়বদ্ধতার কথা, আবার কেউ বলেছেন ভালোবাসা আর মানবিকতার কথা। গুরুগম্ভীর আলোচনার ভেতরেও ছিল আন্তরিক হাসির ঝরনা। মনে হচ্ছিল—সাহিত্য যখন মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়, তখন তা আর কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন থাকে না; হয়ে ওঠে জীবনের উৎসব।
মাসুম আজিজুল বাসার শুধু একজন আবৃত্তিশিল্পী। আবার তিনি মানুষের কণ্ঠে কবিতার আলো জ্বালিয়ে দেওয়া এক নিবেদিত শিক্ষক। একজন সাংস্কৃতিক সংগঠক ও শিল্পসাধক। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ত্রিলোক’ বছরের পর বছর ধরে নতুন প্রজন্মকে শিখিয়ে চলেছে। তাদের দর্শনে কবিতা শুধু মুখস্থ করার বিষয় নয়। কবিতা অনুভবের, বেঁচে থাকার, প্রতিবাদের, ভালোবাসার ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিল্প।
একজন চিত্রশিল্পী যেমন রঙ দিয়ে ক্যানভাস ভরিয়ে তোলেন, তেমনি একজন আবৃত্তিশিল্পী শব্দ দিয়ে মানুষের হৃদয়ে আঁকেন আলো, প্রতিবাদ, প্রেম, বেদনা ও স্বপ্নের প্রতিকৃতি। সেই আজিজুল বাসার অর্ধশতাব্দীর এক দীপ্ত অধ্যায় অতিক্রম করে আজ তিনি পৌঁছেছেন সুবর্ণজয়ন্তীর গৌরবময় প্রান্তে। এই পথচলা যেমন ব্যক্তিগত অর্জন তেমনি এটি অসংখ্য শিক্ষার্থী, সহযাত্রী ও শিল্পপ্রেমী মানুষেরও গর্বের ইতিহাস।
আরও যাদের উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠান আলোকিত হয়ে উঠেছিল সেইসব কবি, সংগীত শিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শুভানুধ্যায়ী ও প্রিয়জনের মধ্যে ছিলেন— ইউসুফ রেজা, আবিদ এ রেজা, সহিদুল জয়, এহসানুল হক, মাসরুবা ক্রান্তি, জুবায়ের, নাজমিন আহমেদ, আরিফুল ইসলাম, দীপ্তি ইসলাম, মিসবাহিল মোকার রাবিন, পলি পারভীন, অনন্যা রেজোয়ানা, সামান্তা শাহীন, জান্নাতুল ফেরদৌস মুক্তা, সহিদুল জয়, অমিত, নার্গিস সুলতানা, জাকির মোল্লা, কামরুল ইসলাম, এমদাদ হোসেন, রাকিব হাসানসহ আরও অসংখ্য শিল্পপ্রেমী। তাঁদের উপস্থিতি সন্ধ্যাটিকে আরও প্রাণবন্ত, আরও অর্থবহ করে তুলেছিল।
সন্ধ্যা গড়িয়ে যখন রাত দশটা, তখনও কারও মনে হচ্ছিল না সময় শেষ হয়েছে। মুহূর্তগুলো যেন অজান্তেই স্মৃতি হয়ে যাচ্ছিল। অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে, কিন্তু শেষ হয়নি অনুভূতির রেশ। বিদায়ের ক্ষণেও বাতাসে ভাসছিল কিছু উচ্চারণ, কিছু কবিতার পঙ্ক্তি, কিছু হাসি, কিছু করতালি আর অগণিত শুভেচ্ছার অনুরণন।
কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক আশফাকুজ্জামান-এর সমাপনী বক্তব্য যেন সন্ধ্যার সমস্ত অনুভূতিকে এক সুতোয় গেঁথে দিল। মনে হলো, এ যেন একটি জন্মদিনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি নয়, বরং শুরু হলো আরও দীর্ঘ, আরও আলোকিত, আরও সৃজনময় এক শিল্পযাত্রার নতুন অধ্যায়।
শুভ জন্মদিন, প্রিয় বাসার ভাই।
আপনার কণ্ঠের কবিতা আরও বহু বছর মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালুক। আপনার উচ্চারণ নতুন প্রজন্মকে সত্য, সৌন্দর্য ও মানবতার পথে অনুপ্রাণিত করুক। ত্রিলোক আরও অসংখ্য তরুণের কণ্ঠে জাগিয়ে তুলুক শিল্পের সৌন্দর্য, মানবিকতা এবং সৃজনশীলতার দীপ্তি।
কারণ, কিছু মানুষ শুধু বয়সে বড় হন না—তাঁরা সময়কে বড় করে তোলেন। একটি প্রজন্মকে আলোকিত করেন। সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেন।
মাসুম আজিজুল বাসার সেই বিরল মানুষদের একজন।
শুভ সুবর্ণজয়ন্তীতে এই প্রত্যাশা যে-–
আপনার প্রতিটি উচ্চারণ হোক মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন। প্রতিটি স্বপ্ন হোক আগামী দিনের প্রেরণা। আর প্রতিটি পদচারণা হয়ে উঠুক বাংলা আবৃত্তি ও সংস্কৃতির ইতিহাসে নতুন আলোর দিশারি।
আশফাকুজ্জামান
কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক

