শিক্ষা কি শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার জন্য? মুখস্থ বিদ্যার গণ্ডি পেরিয়ে প্রয়োগমুখী শিক্ষার প্রত্যাশা
শিক্ষা মানুষের জীবনকে বদলে দেওয়ার কথা। অথচ আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা অনেক সময় পরীক্ষার খাতার কয়েকটি পাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তব জীবনে সেই শিক্ষার প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না।
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থা কেমন, তার ওপর। শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি বাড়াবে, বাস্তবতা বুঝতে শেখাবে, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করবে এবং একজন শিক্ষার্থীকে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে, আমরা কি সত্যিই শিক্ষা গ্রহণ করছি, নাকি শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য তথ্য মুখস্থ করছি?
ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই আমাদের ‘Traffic Jam’ নিয়ে paragraph মুখস্থ করানো হয়। পরীক্ষার খাতায় কয়েকটি লাইন লিখে নম্বরও পাই। কিন্তু কখনো কি আমাদের বলা হয়, চলো এবার বাস্তবে দেখি একটি শহরে যানজট কেন তৈরি হয়? শিক্ষার্থীদের কি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দেওয়া হয়? ট্রাফিক আইন মানার গুরুত্ব বোঝাতে কোনো বাস্তবভিত্তিক কার্যক্রম করা হয়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর হবে, না।
আমরা ‘Traffic Jam’ paragraph মুখস্থ করি, কিন্তু যানজটের বাস্তব কারণ বিশ্লেষণ করতে শিখি না। আমরা ‘Environment Pollution’ নামের paragraph মুখস্থ করি, কিন্তু পরিবেশ রক্ষায় বাস্তবে কী করা যায়, তা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ খুব কমই পাই। ‘Tree Plantation’ সম্পর্কে paragraph লিখি, কিন্তু বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে কতজন শিক্ষার্থী অংশ নেয় বা অংশ নিতে উৎসাহিত হয়?
আমরা ‘First Aid’ সম্পর্কে পড়ি, কিন্তু জরুরি মুহূর্তে একজন আহত মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার বাস্তব প্রশিক্ষণ কয়জন শিক্ষার্থী হাতে-কলমে পায়?
এখানেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তা হলো জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞানের প্রয়োগের মধ্যে বিশাল দূরত্ব।
একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারে, ‘Traffic jam is a common problem in Bangladesh.’ কিন্তু সেই শিক্ষার্থী যদি বাস্তবে যানজটের কারণ চিহ্নিত করতে না পারে, পথচারী ও চালকদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করতে না পারে কিংবা ছোট পরিসরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে কাজ করতে না পারে, তাহলে সেই জ্ঞান কতটা কার্যকর?
একইভাবে একজন শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় লিখতে পারে, ‘Plastic pollution is harmful to the environment.’ কিন্তু তাকে যদি বলা হয়, তোমার এলাকায় প্লাস্টিক দূষণের ওপর একটি ছোট জরিপ করো, সমস্যার কারণ খুঁজে বের করো এবং সমাধানের একটি পরিকল্পনা তৈরি করো, তখনই বোঝা যাবে সে আসলে কতটা শিখেছে।
শিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা পরীক্ষার খাতায় ভালো ফলাফল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের উপকার করতে পারাই শিক্ষার বড় সাফল্য।
আমাদের দেশে প্রতি বছর অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করছে। তাদের অনেকেই ভালো ফলাফল করছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে গিয়ে কিংবা বাস্তব জীবনের সমস্যার মুখোমুখি হয়ে অনেকেই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এর একটি কারণ হতে পারে, দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে তারা বই ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক জ্ঞান অর্জন করলেও বাস্তব সমস্যার সমাধান করার পর্যাপ্ত সুযোগ পায়নি।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যদি শিক্ষার্থীদের শুধু বইয়ের পাতা পড়ানো না হয়ে বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরাই হয়ে উঠতে পারে পরিবর্তনের অন্যতম শক্তি। এতে তারা যেমন বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবে, তেমনি তাদের জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে সমাজের ছোট-বড় অনেক সমস্যার সমাধানও বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে তাদের problem-solving বা সমস্যা সমাধানের দক্ষতাও বাড়বে।
সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনাও আমরা দেখেছি, যেখানে যানজটের কারণে গুরুতর অসুস্থ মানুষকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। কখনো কখনো একটি অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ যানজটে আটকে পড়লে পরিস্থিতি জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
একটি অ্যাম্বুলেন্স যখন যানজটে আটকে থাকে, তখন বিষয়টি আর ‘Traffic Jam’ নামের একটি paragraph-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে, আমরা বছরের পর বছর যানজট সম্পর্কে পড়ছি, লিখছি এবং পরীক্ষায় নম্বর পাচ্ছি, কিন্তু এই সমস্যার বাস্তব সমাধান নিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা ভাবছে?
তাহলে কি আমাদের শিক্ষার্থীদের এসব সমস্যার সমাধানের অংশ করা যায় না?
অবশ্যই যায়।
আমাদের দেশে মেধার অভাব নেই। সম্ভাবনারও অভাব নেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য, কী নেই বাংলাদেশে? ছয় ঋতুর বৈচিত্র্য, উর্বর ভূমি ও অসংখ্য নদ-নদী আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই সম্ভাবনাকে কতটা কাজে লাগাতে পারছি।
আমরা প্রায়ই উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর উদাহরণ দিই। তারা প্রযুক্তিতে এগিয়ে, গবেষণায় এগিয়ে, উদ্ভাবনে এগিয়ে। তাদের সাফল্যের পেছনে উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রয়েছে গবেষণার সুযোগ, হাতে-কলমে শিক্ষা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার সংস্কৃতি।
একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, মানবসম্পদ। আর সেই মানবসম্পদকে দক্ষ করে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমগুলোর একটি হলো শিক্ষা।
এখনই সময় এসেছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু মুখস্থনির্ভর না রেখে চিন্তানির্ভর, গবেষণানির্ভর ও প্রয়োগমুখী করে তোলার। শিক্ষার্থীর হাতে শুধু বই তুলে দিলেই শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। তাকে বাস্তবতা দেখতে দিতে হবে, প্রশ্ন করতে দিতে হবে, ভুল করার সুযোগ দিতে হবে, সমস্যার মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে এবং সমাধান খোঁজার সুযোগ দিতে হবে।
কারণ শিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা তখনই একটি জাতির জন্য সুফল বয়ে আনবে, যখন পরীক্ষার খাতায় লেখা জ্ঞান বাস্তব জীবনে মানুষের উপকারে আসবে।
মো. ইয়াছিন আরাফাত
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

