সাহসই দেখায় পথ
— ড. শেখ আকরাম আলী
একজন নেতার জন্য সাহস অত্যন্ত অপরিহার্য, এবং এর অর্থ হলো বিপদ, অসুবিধা বা কষ্টের মুখোমুখি হওয়ার মতো নৈতিক শক্তি। অন্যের বিরোধিতা বা চাপ থাকা সত্ত্বেও সঠিক কাজটি করা এবং নিজের বিশ্বাসের ওপর অটল থাকার ক্ষমতাই হলো সাহস। এটি স্বাধীনভাবে কীভাবে বাঁচতে হয় তা শেখায় এবং চলার জন্য সঠিক পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। একটি জাতির জীবনে নানা উত্থান-পতন থাকে, কিন্তু একজন শক্তিশালী নেতা সর্বদা সাহসের সাথে তার মুখোমুখি হন। চ্যালেঞ্জ ও সংকটের সময়ে তিনি শান্ত ও দৃঢ় সঙ্কল্পবদ্ধ থাকেন।
অতীতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে, তবে ফ্যাসিবাদের পতনের পর এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করা হয়। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতের কাছ থেকে কোনো সমর্থন পায়নি, বরং তারা বাংলাদেশের মানুষের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করেছিল। ভারত বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ভিসা সেবা বন্ধ করে দেয় এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বহু প্রতিকূল নীতি গ্রহণ করে।
তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তারেক রহমান ক্ষমতায় এলে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলার আশায় ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করে এবং মোদী সরকার তাকে যত দ্রুত সম্ভব ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানায়। অন্যদিকে চীনও তারেক রহমানকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চীন সফরের আমন্ত্রণ জানায়।
এটি তারেক রহমানের জন্য একটি দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছিল যে—তিনি আগে কোথায় যাবেন, দিল্লি না বেইজিং? ঢাকার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়াটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছিল, কিন্তু তারা প্রথমে মালয়েশিয়া এবং তারপর চীন সফরের একটি সাহসী ও পরিপক্ক কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান প্রথমবারের মতো তার কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ দেন। বাংলাদেশের মানুষ বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগকে সর্বান্তঃকরণে স্বাগত জানায়। সাহসই সঠিক পথ দেখিয়েছে এবং এমন একটি দেশের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে যা এখন বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমানের সরকার জনগণের পালস বা অনুভূতি বুঝতে পেরেছিল এবং সে অনুযায়ী কাজ করেছে।
এটি ভারতকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং তারা আগের চেয়ে আরও বেশি বৈরী হয়ে ওঠে। তারা শেখ হাসিনাকে একটি ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করে তাকে ৫ই আগস্ট সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলার অনুমতি দেয়। এটি কূটনৈতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্পষ্ট হস্তক্ষেপ। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে এবং ভারত সরকারের কাছে পাঠানো একটি কড়া চিঠির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বাংলাদেশের জনগণ বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছে এবং তারা এটাও জেনে আনন্দিত যে চিঠিটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে লিখেছেন। এর পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি জানা থাকা সত্ত্বেও তারেক রহমানের সরকারের জন্য এটিকে একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। খলিলুর রহমান জাতির জন্য আবারও তার কূটনৈতিক ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন।
বর্তমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল করার জন্যই ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘শেখ হাসিনা কার্ড’ ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। ভারতের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশে একটি গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করা এবং তা নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করা। এমনকি তারা ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী দুষ্কৃতকারীদের মাধ্যমে রংপুর দখল করার চেষ্টা করতে পারে—যেমনটা তারা শেখ মুজিবের পতনের পর কাদের সিদ্দিকীর মাধ্যমে করেছিল, যেখানে সামরিক সহায়তা সহ সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের ভেতরে আওয়ামী লীগ নেতাদের গতিবিধির ওপর সরকারি সংস্থাগুলোকে নজর রাখতে হবে। পতিত আওয়ামী লীগের এমন যেকোনো উদ্যোগ কুঁড়িতেই বিনষ্ট করার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নিতে হবে। যেকোনো মূল্যে জনগণের ঐক্য বজায় রাখতে হবে। সংকটকালে করণীয় নির্ধারণে সরকার ও বিরোধী দলের এখনই বৈঠকে বসা উচিত। এটা নিশ্চিত যে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চরম কোনো পদক্ষেপ নিতে ভারত দ্বিধা করবে না।
সরকারের প্রথম কাজ হবে—ভারত যদি ভবিষ্যতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তবে যেসব দেশ সেগুলো সরবরাহ করতে পারবে তাদের সাথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পরবর্তী পদক্ষেপ হবে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া যাতে বাংলাদেশে নিযুক্ত বর্তমান ভারতীয় হাইকমিশনারকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হয়। বিরোধী দলসহ সব দলের সদস্যদের নিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে নাগরিক কমিটি গঠন করতে হবে। এটিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে কার্যকর করা উচিত।
অবশেষে, পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক এমন হতে হবে যাতে তারা ভবিষ্যতের সংকটকালে সব ধরনের সহায়তা দিতে সক্ষম হয়। মার্কিন সরকারের সাথে বর্তমান সম্পর্ক বজায় রেখে তাদের সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। এটাও বিশ্বাস করা হয় যে প্রকৃত সংকটের সময়ে চীন বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকবে।
তবে এটি একটি ভালো লক্ষণ যে, ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার সঠিক অভিমুখে রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভবিষ্যতে দেশের জন্য যা কল্যাণকর তা বজায় রাখতে যথেষ্ট সক্ষম। ইতিমধ্যে তিনি “বাংলাদেশ ফার্স্ট” বা “সবার আগে বাংলাদেশ”—এই নীতি মাথায় রেখে পররাষ্ট্রবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনায় যথেষ্ট পরিপক্বতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।
বাংলাদেশ এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। জিয়াউর রহমান তার সরকারের আমলে অনুরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং ভারতের সাথে তার সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল; কিন্তু তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বিশ্বের সমর্থনে সাহসের সাথে তা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তবে বর্তমানে পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বজায় রেখে একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—উভয়ের সমর্থন পাওয়ার জন্য বাড়তি সতর্কতা ও উদ্যোগের প্রয়োজন। কাজটিকে বেশ কঠিন মনে হলেও, একই সাথে এই দুই পরাশক্তির সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।
ঠিক এখানেই একজন নেতার সাহসের গুরুত্ব, যা তাকে তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার সঠিক পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। বিজয় সর্বদা তাদের জন্যই আসে যারা নিজেদের লক্ষ্য ও কর্মে সাহসী এবং তা অর্জনে কঠোর পরিশ্রম করে। কষ্ট বিনা কে মেলে কেষ্ট! (No pains no gains)
বাংলাদেশকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারলে এই দেশের জনগণই হবেন তার মূল শক্তি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে তার মিশনে বেশ আন্তরিক ও আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হচ্ছে এবং এতে তিনি সফল হবেন বলেই আশা করা যায়। লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধারাবাহিকতা ও সাহস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি নিয়ামক, এবং এই দুটি গুণই তার মধ্যে দৃশ্যমান।
উদ্বৃত্ত এই সাফল্যই শেষ নয়, বরং বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশের জন্য টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বাস্তবায়নের সূচনা মাত্র। দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসছে, কিন্তু তাদের জীবনে এখনো কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পায়নি। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পতনের মধ্য দিয়ে তারা প্রাথমিক সাফল্য অর্জন করেছে এবং শীঘ্রই চূড়ান্ত সাফল্য দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
বর্তমান সরকার জুলাই বিপ্লবের ফসল এবং তারা পুরো জাতির আস্থা ও বিশ্বাস উপভোগ করছে। বৈষম্যহীন সমাজ এবং বহিরাগত প্রভাবমুক্ত একটি নতুন বাংলাদেশের প্রতি জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা, তা পূরণে তাদের সততা ও আন্তরিকতার সাথে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আর এই সাহসিকতাই একটি সত্যিকারের সফল যাত্রার পথ দেখাতে পারে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক: আইনের অধ্যাপক
০৮ আগস্ট, ২০২৬

