১৮ বার পড়া হয়েছে
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের জন্মদিন উদযাপনের স্মৃতি
আহমাদ মাযহার
২৫ জুলাই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের জন্মদিন। যদ্দূর মনে পড়ে তাঁর জন্মদিন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পালন শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সালে, আমারই নেতৃত্বে। আমি তখন কেন্দ্র-সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছিলাম! মনে পড়ছে সেসময় অধ্যাপক আনোয়ারা বেগমের উৎসাহে ‘রবীন্দ্র অধ্যয়ন চক্র’ নামে পাঠচক্র চলছিল। ‘মুক্তিযুদ্ধ পাঠচক্র’ ‘গ্রীক নাটক পাঠচক্র’–এরকম আরো কিছু পাঠচক্র তখন চলছিল। আমি, রবিশঙ্কর মৈত্রী মিলে চালাতাম নন্দন চক্র! আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কয়েকটি বক্তৃতা করেছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের রবীন্দ্র অধ্যয়ন চক্রে! সায়ীদ স্যারের নির্দেশে আমি আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছিলাম সৈয়দ আকরম হোসেনকে। মনে পড়ে তিনি পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও গভীর বক্তৃতা করে মুগ্ধ করেছিলেন সবাইকে।

সায়ীদ স্যারের জন্মদিন পালনের জন্য সে বছর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের হলদেটে রঙের পুরোনো ভবনের বারান্দার সামনে তিরিশ চল্লিশ জনের একটা দল জমায়েত হয়েছিলাম। স্যারকে কিছু আগে জানানো হয়নি। মনে পড়ে নানা কায়দা করে তাঁকে সেখানে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। খুব ছোট্ট অনাড়ম্বর সেখানে গিয়ে স্যার আমাদের ওপর রাগ করতে গিয়েও পারেননি সকলের আন্তরিক শুভেচ্ছা বর্ষণের তোড়ে। কিন্তু পরে আমি তিরস্কার শুনেছিলাম এই আয়োজনের জন্য! কেন্দ্রের একাউন্টস থেকে কোনো টাকা যেন খরচ না হয়–মনে আছে এমন কঠোর নির্দেশনা ছিল তাঁর। আমরা জানতাম এমনই কথা বলবেন তিনি। তাই কর্মীদের নিজেদের স্বল্প সামর্থ্যের সম্মিলনে সে আয়োজন হয়েছিল। আয়োজনও ছিল খুব ছোট। একটা সাধারণ ফুলের তোড়া ছিল। একটি করে মিষ্টি বরাদ্দ করা গিয়েছিল। তাও সবার ভাগে পড়েছিল এমন কথা নিশ্চিত করতে পারব না! যদ্দূর মনে পড়ে সেদিন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকেও পেয়েছিলাম রবীন্দ্র অধ্যয়ন চক্রের সূত্রে! সেবারের ছোট্ট আনুষ্ঠানিকতা আমাদের উৎসাহ বাড়িয়ে দিয়েছিল। পরের বছর অনুমানের ভিত্তিতেই বড় হয়ে উঠেছিল সে আয়োজন। যদিও আয়োজন হতো যথা সম্ভব নিভৃতে, স্যারের অজ্ঞাতে। গোপনে জানানো হতো ভাবী রওশন আরা সায়ীদকে। স্যারের দুই কন্যা লুনা সায়ীদ ও রঞ্জনা সায়ীদ জানত। সন্ধ্যার পর স্যারের যেসব রুটিন কাজ চলার তা চলত স্বাভাবিক নিয়মেই। কেন্দ্রের কর্মীরা স্যারকে জন্মদিন নিয়ে কিছু বলত না! কিন্তু ইসফেন্দিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনে আপনা আপনি জমায়েত হয়ে যেত। কারণ ততদিনে কেন্দ্রের ঢাকা শহরের স্কুল কর্মসূচি, ঢাকার বাইরের কর্মসূচি সংগঠক-কর্মীদের আনোগোনা বেশ বড় হয়ে উঠছিল। জন্মদিনে সবাই স্যারকে তাদের মধ্যে চাইত! স্যার চরম অনিচ্ছুক থাকলেও সবার ডাক উপেক্ষা করতে পারতেন না।
চেষ্টা ব্যর্থ হবে বুঝে পরে আর তিনি এই আয়োজন থামানোর চেষ্টা করেননি! এখনো সম্ভবত কারও আমন্ত্রণের অপেক্ষা করা হয় না। তাঁর ছাত্র শুভানুধ্যায়ীরা জমায়েত হয়ে যায় স্বতঃপ্রণোদিতভাবেই! ‘হাঁড়ির খবর’ নামে দ্বিতীয় বারের আয়োজনের খবর কেন্দ্রের বুলেটিন ‘ঘরোয়া খবর’ (জুন-সেপ্টেম্বর ১৯৯৬) সংখ্যায় [সম্পাদক: মৃদুল ভৌমিক, বর্তমানে মৃদুল আহমেদ নামে নিউ ইয়র্কবাসী] রিপোর্ট খুঁজে পেয়েছি এ বিষয়ে। সেখান থেকে মৃদুলেরই লেখা হুবহু তুলে দিচ্ছি:
“শিকে যখন ছিঁড়ল!
কিছু কিছু জনমদুখী মানুষ থাকেন, যাঁদের কপালে কখনোই বেশি সুখ সয় না। এঁদের ক্ষেত্রে কখনো বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে বটে, কিন্তু সেটা সৌভাগ্য বলে বিবেচিত হয় না। কারণ শিকে ছিঁড়ে শিকের বস্তু গিয়ে পড়ে নিচে অপেক্ষমাণ বেড়ালের একেবারে ঘাড়ের ওপর, ফলে শিকস্থ বস্তুর রসাস্বাদন করা দূরে থাক, জীবনধারণের ব্যাপারেই রীতিমতো একটি সংশয় উপস্থিত হয়।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্ভবত সেই গোত্রেরই একজন। গত ২৫ জুলাই ছিল তাঁর জন্মদিন। জাভিকের মিটিংয়ের দরুন সেদিন বিকেলে তিনি কেন্দ্রে উপস্থিত হতেই তাঁকে ঘিরে ধরল সবাই। ছিলেন ছাদে বসে, সেখান থেকে তাঁকে টানাটানি করা শুরু হল নিচে অডিটোরিয়ামে এসে জন্মদিনের একটি খণ্ড উৎসবে যোগ দেবার জন্য, সেখানে ইতিমধ্যেই সংক্ষিপ্ত সাজসজ্জা সম্পন্ন হয়ে গেছে শিল্পী মিলন রায়ের তড়িৎগতি হস্তক্ষেপে।
সভাপতি কিছুতেই নিচে নামবেন না, ভ্রূ কুঁচকে ‘আঃ কী যে কর তোমরা!’
কিন্তু মুখে তাঁর সূক্ষ্ম হাসির ছাপ। শেষপর্যন্ত বেশ খানিক সাধ্যসাধনার পর নামলেন নিচে–কিন্তু হরিষে বিষাদ! সাড়ে ছটা বেজে গেছে তখন, সেদিন যাঁদের অনুষ্ঠান, অডিটোরিয়ামে তাঁরা হাজির হয়ে গেছেন।
আবার ফিরে আসতে হল। তবে সব শেষ শেষ নয়। কর্মীদের পক্ষে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, কর্মীদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা উপহার তুলে দিলেন আহমাদ মাযহার। পরপর ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাল বিপাশা, জলি; ফুলের সঙ্গে বিপাশার বাড়তি শুভেচ্ছা ছিল এক প্যাকেট ডাবলি মটর-যা আমাদের সায়ীদ স্যারের অতি প্রিয় জিনিস। উপস্থিত অনেকে আবার স্যারের জন্মদিনের কথা জানত না। একে একে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেল তারাও। ডালিয়া আবার মাছের তেলে মাছ ভাজার নগদ উদাহরণ দেখিয়ে গেল কেন্দ্রের বাগান থেকে ফুল ছিঁড়ে সায়ীদ স্যারকে শুভেচ্ছা জানিয়ে। একটু দেরিতে উপস্থিত হলেও জন্মদিনের উপহার নিয়ে হাজির হলেন শাহ আলম সারওয়ার ও ঝর্ণা সারওয়ার দম্পতি। এভাবেই শেষ হল সেদিনকার আনন্দময় পর্ব। আর আমরাও আজ এখানে শেষ করতে পারি জনাব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে।”
আমি এখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পুরোনো মেয়াদোত্তীর্ণ মানুষ! সায়ীদ স্যারের নৈকট্য লাভ এখন আমার জন্য দুই গোলার্ধ-ব্যবধী ব্যাপার! একদা আমি ছিলাম তাঁর নিত্য সহচর! তার ধূসর স্মৃতি-অনুষঙ্গ দিয়ে জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছা জানাই!

