প্রবাসের জানালায়
— মো. জোয়েল আহমেদ
বিমানটা যখন দেশের মাটি ছেড়ে আকাশে উঠল, তখন জানালার পাশে বসে শেষবারের মতো বাংলাদেশের দিকে তাকিয়েছিলাম। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠেছিল।
যত উপরে উঠ ছিলাম নিচে তত ছোট হয়ে আসছিল আমার পরিচিত শহর, গ্রামের পথ, সবুজ মাঠ আর সেই মানুষগুলো—যাদের ভালোবাসায় আমার জীবনটা গড়ে উঠেছে।
মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটা দেশ ছেড়ে যাচ্ছি না; সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি আমার শৈশব, আমার পরিবার, আমার ভালোবাসা, আমার অসংখ্য স্মৃতি।
মায়ের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। বাবার নীরব চাহনিটাও ভুলতে পারছিলাম না। আর প্রিয় মানুষটির সেই কথাটি—
“নিজের যত্ন নিও, তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।”
কথাটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, পুরো পৃথিবীর ভার যেন ওই কয়েকটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে।
প্রবাসে আসার স্বপ্নটা ছিল অনেক দিনের। ভালো একটা ভবিষ্যৎ, পরিবারের মুখে হাসি, নিজের একটা পরিচয়—এসব স্বপ্ন নিয়েই তো মানুষ ঘর ছাড়ে।
কিন্তু কেউ কি জানে, স্বপ্নের পেছনে কতটা কান্না লুকিয়ে থাকে?
প্রবাসের মাটিতে পা রাখার পর প্রথম যে জিনিসটা অনুভব করলাম, সেটা হলো—এখানে মানুষ অনেক, কিন্তু আপন মানুষ খুব কম।
চারপাশে অচেনা মুখ। অচেনা ভাষা। অচেনা রাস্তা। অচেনা জীবন।
তবুও নিজেকে শক্ত করে বললাম—
“কাঁদলে চলবে না। আমি এসেছি পরিবারের জন্য। আমাকে পারতেই হবে।”
দিনের বেলা কাজের ব্যস্ততা আমাকে নিজের কথা ভাবার সুযোগ দেয় না। কিন্তু রাত নামলেই যেন সবকিছু বদলে যায়।
ঘরের বাতি নিভিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ালে দূরের শহরের আলো দেখা যায়। সেই আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমার দেশের আকাশেও কি এখন একই চাঁদ উঠেছে?
মা কি ঘুমিয়ে পড়েছেন?
বাবা কি এখনও বসে আছেন?
আমার প্রিয় মানুষটি কি ফোনের অপেক্ষায়?
আর আমার ছোট্ট সন্তানটি—সে কি আমাকে খুঁজছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানি না।
শুধু জানি, প্রবাসের প্রতিটি রাত আমাকে একটু একটু করে বুঝিয়ে দেয়—ঘর থেকে দূরে থাকা মানে শুধু দূরত্ব নয়, প্রিয় মানুষগুলোর প্রতিটি মুহূর্তকে মিস করার নামও প্রবাস।
তবুও আমি হাসি।
কারণ আমার হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে পরিবারের স্বপ্ন।
আমি ক্লান্ত হই, কিন্তু থামি না।
আমি কাঁদি, কিন্তু কাউকে দেখাই না।
আমি একা থাকি, কিন্তু স্বপ্ন দেখি—
একদিন এই প্রবাসের জানালা দিয়ে শেষবারের মতো তাকিয়ে বলব,
“বিদায় হে প্রবাস বিদায়… এবার আমি আমার আপন ঠিকানায় ফিরছি।”

