৩৬৬ বার পড়া হয়েছে
দৃষ্টির দৃষ্টি ফেরা
শারমীন সুলতানা
(দ্বিতীয় খণ্ড)
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দৃষ্টির ক্লাস পরীক্ষা চলছিল। তাই অনেকদিন আর আগের মতো ব্যালকনিতে বসা হয় না। পড়াশোনার চাপে দিনরাত ডুবে আছে সে। টবের গাছগুলোও যেন অবহেলায় শুকিয়ে যাচ্ছে। পাতাগুলোতে ধরেছে হলুদাভ রং।যেন তারা বোঝাচ্ছে, যত্নের অভাব কতটা কষ্ট দেয়।
দৃষ্টির এখন একটাই লক্ষ্য,পরীক্ষায় ভালো করা। তাই সবকিছু ভুলে বইয়ের পাতার ভেতরেই ডুবে থাকে তার চোখ আর মন।
অবশেষে পরীক্ষা শেষ হয়। সেদিন বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে দীর্ঘ এক ঘুম দেয় দৃষ্টি। এতদিনের ক্লান্তি যেন শরীর থেকে ধুয়ে গেছে। ঘুম ভাঙার পর নিজেকে খুব হালকা লাগে।
দক্ষিণের খোলা জানালা দিয়ে বসন্তের ঝিরঝিরে হাওয়া ঢুকে পড়ে ঘরে। দূরে উঁচু এক গাছের মগডালে বসে কোকিল ডাকছে, কুহু… কুহু…
এই সুর যেন দৃষ্টির মনেও অদ্ভুত এক উদাসীনতা ছড়িয়ে দেয়। প্রকৃতির এমন এক খেলা—সে মানুষকে নিজের মতো করেই নাচায়।
হাতমুখ ধুয়ে দৃষ্টি ব্যালকনিতে আসে। রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসতেই চোখ হঠাৎ চলে যায় পাশের ব্যালকনিতে।
আবার সেই ছেলেটি।
নীরবে বসে আছে, আর তার দিকেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
দৃষ্টির ভেতরটা হঠাৎ রাগে জ্বলে ওঠে।কী অসভ্যতা! এতদিন তো এমন দেখিনি!
মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়—আজই এর একটা ব্যবস্থা করবে।রাগে তার মুখ লাল হয়ে ওঠে। দ্রুত লিফটে উঠে গ্রাউন্ড ফ্লোরের বোতাম চাপ দেয়।নিচে নেমে সোজা সেই বাসার সামনে গিয়ে কলিংবেল বাজায়।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে দেন চল্লিশোর্ধ্ব এক সুন্দরী মহিলা। ভদ্র ও পরিপাটি পোশাকে তার আভিজাত্য স্পষ্ট।
মহিলা বিস্মিত চোখে দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকেন।
দৃষ্টি আগে কথা বলে,আমি দৃষ্টি। পাশের বাসায় থাকি। আপনারা কি এ এলাকায় নতুন?
মহিলা মৃদু হেসে বলেন,হ্যাঁ, মাত্র এক সপ্তাহ হলো এখানে এসেছি। আমার স্বামী একজন আর্কিটেক্ট।
দৃষ্টি একটু থেমে বলে,আপনাদের ব্যালকনিতে একটি ছেলে বসে থাকে। প্রতিদিন আমাদের ব্যালকনির দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। এ কেমন অসভ্যতা! এই পাড়ায় তো এমন আচরণ দেখিনি। এখানে থাকতে হলে কিছু নিয়মকানুন মানতে হবে।মহিলাটি কিছু বলার আগেই দৃষ্টি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেখান থেকে চলে আসে।
দিন কেটে যায়।অনেকদিন আর সেই ছেলেটিকে ব্যালকনিতে দেখা যায় না।
দৃষ্টির মনটা অদ্ভুতভাবে ধাক্কা খায়।
সে ভাবে,সেদিন কি খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলাম?
মহিলাটিকে তো নিজের কথা বলার সুযোগই দিলাম না!কী অন্যায়ই না করেছি!ছেলেটির সেই উদাসীন চাহনি বারবার মনে পড়ে।সে তো কখনও কোনো অশোভন অঙ্গভঙ্গি করেনি!একজন মানুষকে না জেনে এমন রূঢ় ব্যবহার করা,এটা কি ঠিক হলো! দৃষ্টি অনুশোচনায় ভুগতে থাকে।অবশেষে একদিন সিদ্ধান্ত নেয়,সে যাবে, ক্ষমা চাইবে।
ভয়ে ভয়ে আবার সেই বাসার কলিংবেল চাপ দেয়।দরজা খুলে আবার সেই মহিলাই।মহিলা মৃদু হেসে বলেন,তুমি দৃষ্টি, তাই না? সরি, তোমাকে তুমি করে বললাম। কিছু মনে করোনি তো?না না, কেন মনে করবো! আপনি আমাকে তুমি করেই বলবেন।আসো, ভেতরে আসো।
দৃষ্টি ড্রইংরুমে গিয়ে বসে।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর সে বলে,আপনাদের বাসায় আর কে কে থাকেন? কাউকে তো দেখছি না।তারপর হঠাৎ মাথা নিচু করে বলে,আসলে আমি খুব লজ্জিত। কীভাবে আপনার কাছে ক্ষমা চাই বুঝতে পারছি না।
মহিলা শান্ত গলায় বলেন,আমি বুঝেছি। কোনো সমস্যা নেই। তুমি তো আমাদের সম্পর্কে কিছুই জানো না। এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।তিনি একটু থেমে আবার বলেন,
আমরা চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে এখানে এসেছি। আমি, আমার স্বামী আর আমার দেবর। তুমি যার জন্য নালিশ নিয়ে এসেছিলে,সে আমার দেবর, শাহেদ। আমাদের কোনো সন্তান নেই। তাই দেবরই আমাদের সন্তানের মতো।
দৃষ্টি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,আপনার দেবর কী করেন?
মহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
সে এক দীর্ঘ ইতিহাস।
বলুন প্লিজ।
মহিলা ধীরে ধীরে বলতে থাকেন।আমার দেবর বিদেশে পড়াশোনা করত। স্কলারশিপ নিয়ে লন্ডনে গিয়েছিল। একদিন ল্যাবরেটরিতে ক্যানসারের অনুজীব নিয়ে গবেষণা করছিল। হঠাৎ দুর্ঘটনাবশত তার চোখে এসিড পড়ে যায়। আর সেই দিনই সে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারায়।
দৃষ্টি যেন স্তব্ধ হয়ে যায়।
কী বলছেন!
মহিলা বলতেই থাকেন,
তারপর সে দেশে ফিরে আসে। এখন সারাদিন ঘরেই থাকে। মাঝে মাঝে ব্যালকনিতে গিয়ে বসে।
দৃষ্টির চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
তিনি এখন কোথায়?
তার ঘরে।
আমি কি একটু দেখা করতে পারি?
অবশ্যই। চলো।
দৃষ্টি ভাবির পেছনে পেছনে শাহেদের ঘরে ঢোকে।ভেতরে গিয়ে দেখে,শাহেদ আনমনে ভায়োলিনে আঙুল চালাচ্ছে। কী অপূর্ব তার হাত! যেন আঙুলগুলো ভায়োলিনের তারে অলংকার হয়ে ঝুলছে।
ভাবি ডাক দেন,
শাহেদ, তোমাকে দেখতে এসেছে একজন।
কে ভাবি।
কথা বলো। দৃষ্টি ধীরে বলে,
আমি দৃষ্টি।
শাহেদ মৃদু স্বরে বলে ওঠে
একজন দৃষ্টি… আর একজন দৃষ্টিহীন।
কিছু বলছেন?না কিছুনা।
তারপর শান্ত গলায় বলে,
বলুন তো, আমি কি জানতাম আপনি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছেন?
দৃষ্টির কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।
সরি… আমি সত্যিই খুব লজ্জিত। আমাকে কি ক্ষমা করবেন?
শাহেদ মৃদু হেসে বলে
ক্ষমা চাইছেন কেন? আপনারই বা দোষ কী!
দৃষ্টি একটু সাহস করে বলে,
আমার মামা একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ। যদি আপনি চান, আমি আপনাকে মামার কাছে নিয়ে যেতে পারি।
ঠিক তখনই ভাবি নাস্তার ট্রে হাতে ঘরে ঢোকেন।
দৃষ্টি, তোমাকে কিছু না দিয়েই এতক্ষণ কথা বলছি! নাও, শাহেদের সাথে গল্প করো আর এগুলো খাও।
ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে,
যেখানে অপরাধবোধ, সহানুভূতি আর নতুন এক সম্পর্কের সূচনা একসাথে ধীরে ধীরে জন্ম নিতে থাকে।
নাস্তার ট্রেটা টেবিলে রেখে ভাবি মৃদু হেসে বললেন,
তোমরা গল্প করো, আমি আসছি।
ঘরটা আবার নীরব হয়ে যায়।
দৃষ্টি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। শাহেদের আঙুল তখনও ভায়োলিনের তারে ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যাচ্ছে। সুর যেন পুরো ঘরটাকে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ভরে দেয়।
দৃষ্টি আস্তে বলে,
আপনি খুব সুন্দর বাজান।
শাহেদ একটু হেসে বলে
দেখতে না পারলে মানুষ শুনতে শেখে। শব্দ তখন অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দৃষ্টি কথাটা শুনে কিছু বলতে পারে না।
কিছুক্ষণ পর সে বলে,
আপনি কি প্রতিদিন ব্যালকনিতে বসতেন?
হ্যাঁ।
কেন?
শাহেদ একটু চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে,
আমি দেখতে পাই না ঠিকই, কিন্তু বাতাসের শব্দ শুনতে পাই। পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পাই। কখনও কখনও পাশের ব্যালকনি থেকে বইয়ের পাতার শব্দও ভেসে আসতো।
দৃষ্টি চমকে ওঠে।
বইয়ের পাতার শব্দ?
হ্যাঁ। কেউ একজন পড়াশোনা করতো। মাঝে মাঝে টবের গাছে পানি ঢালার শব্দও শুনতাম। মনে হতো খুব যত্নশীল কেউ সেখানে থাকে।
দৃষ্টির বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে ওঠে।
সে ধীরে বলে
সেই মানুষটা আমি।
শাহেদ একটু থেমে হালকা হাসে।
আমি জানতাম।
জানতেন?
হ্যাঁ। মানুষের হাঁটার শব্দও আলাদা হয়।
দৃষ্টি বিস্ময়ে চুপ করে থাকে।
তারপর ধীরে বলে
তাহলে আপনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকতেন না?
শাহেদ মৃদু হেসে বলে
আমি তো তাকাতেই পারি না।
এই কথাটা শুনে দৃষ্টির চোখ আবার ভিজে ওঠে।
সে ধীরে বলে
আমি আপনাকে খুব ভুল বুঝেছিলাম।
মানুষ ভুল বুঝতেই পারে। এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু আমি খুব রূঢ় আচরণ করেছি।
তবুও আপনি আজ এসেছেন। সেটাই তো বড় কথা।
দৃষ্টি মাথা নিচু করে বসে থাকে।
হঠাৎ জানালার বাইরে আবার কোকিল ডাকে
কুহু… কুহু…
শাহেদ বলে
কোকিল ডাকছে?
দৃষ্টি অবাক হয়ে বলে,
।আপনি বুঝলেন?
হ্যাঁ। এই সময়টায় প্রায়ই ডাকে।
তারপর একটু থেমে বলে
বসন্ত এসেছে, তাই না?
দৃষ্টি ধীরে জানালার দিকে তাকায়।
গাছের পাতাগুলো বাতাসে দুলছে।
সে আস্তে বলে,
হ্যাঁ… বসন্ত এসেছে।
শাহেদ মৃদু কণ্ঠে বলে,
বসন্ত মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
দৃষ্টি হঠাৎ অনুভব করে,এই মানুষটি অন্ধ হলেও তার ভেতরের আলো অনেক গভীর।
কিছুক্ষণ পর সে বলে,
আপনি কি আবার ব্যালকনিতে বসবেন?
যদি কেউ রাগ না করে।
দৃষ্টি হালকা হেসে বলে
আমি নিজেই আপনাকে ডেকে বসাবো।
শাহেদ কিছু বলে না।
শুধু ভায়োলিনের তারে আবার ধীরে ধীরে আঙুল চালায়।
সুর ভেসে ওঠে,
নরম, বিষণ্ণ, অথচ আশাব্যঞ্জক।
দৃষ্টি অনুভব করে,
আজ তার জীবনে যেন এক নতুন গল্পের শুরু হলো।
হয়তো এই গল্পে দৃষ্টি দেখবে…
আর শাহেদ অনুভব করবে।
দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকবে,
একটি ব্যালকনি, কয়েকটি টবের গাছ, আর বসন্তের কোকিলের ডাক।

