সজারু ছানা ফিরলো বাড়ি, পিঠ ভর্তি আম নিয়ে
ফাতেমা ইয়াসমিন
গভীর জঙ্গলে বাস করতো এক সজারু।তার ছিলো একটি ছানা। সজারু তার ছানাকে সবসময় চোখে চোখে রাখত। গভীর জঙ্গলে নানা রকমের পশুপাখির বসবাস ,তাই মা সজারু তার সন্তানকে রক্ষা করার জন্য সব সময় সাথে নিয়ে ঘুরতো। মা সজারু সারাদিন বনে জঙ্গলে খাবার সংগ্রহ করে বাসায় ফিরতো। আর ছানাটিকে নিয়ে খাওয়া দাওয়া করতো ,ছানাটির যত্ন নিতো।ছানাকে শিক্ষাদিক্ষা দিতো।ছানাটির ছিলো ভিষন বুদ্ধি,আর সবার সাথে মিশতে খুব পছন্দ করতো। বিকেলে বাহিরে গিয়ে খেলতে খুব ইচ্ছে করতো। তাই সজারু ছানা মাঝে মাঝে বাহিরে খেলতে যেত । কিন্তু সজারু ছানাকে ভয়ে কেউ খেলতে নিতো না।সবাই বলতো ওরে বাবা তোর পিঠে কত কাঁটা ,আমাদের গায়ে ফুটলে রক্ত বের হবে। সজারু ছানা বলে,তোমরা আমার বন্ধু, আমি কেনো তোমাদের কাঁটা ফুটিয়ে দিব? সৃষ্টিকর্তা আমাকে এই কাঁটাওয়ালা শরীর সৃষ্টি করেছে ,তাই বলে ,আমি কেন অন্যায় করবো। তোমাদের
গায়ে কাঁটা ফুটিয়ে দিব ?সৃষ্টিকর্তা সকল সৃষ্টিকে কোনো না কোনো ভালো ভেবেই সৃষ্টি করেছে। প্রত্যেক সৃষ্টির একটি করে সৌন্দর্য্য আছে । সৃষ্টিকর্তা আমাকে হয়তো এভাবেই সৃষ্টি করেছেন ।আমার শরীরে কাঁটা দিয়েছে বলে আমি সবাইকে কাঁটা ফুটিয়ে আহত করবো, ক্ষতি করবো ,তা কি করে সম্ভব ।সত্যি বলছি আমাকে তোমরা খেলতে নাও ,আমি তোমাদের কোন ক্ষতি করব না। সবাই ভয়ে ভয়ে একটু একটু মিশে ।এভাবেই -সজারুছানা প্রকৃতির সাথে মিশে বড় হতে থাকে ।সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে সজারু ছানার বেশ আনন্দ লাগে। তাই প্রতিদিনই বন্ধুদের সাথে খেলা করতে যায়।
এখন গ্রীষ্মকাল, বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাস মিলে হয় গ্রীষ্মকাল। এ সময় প্রচন্ড গরম পড়ে ।বৃষ্টি কম হয় ।মাঝে মাঝে আকাশ কালো অন্ধকারে ভরে যায় ।দক্ষিণ কোণে কালো মেঘ জমে। মাঝে মাঝে কালবৈশাখী ঝড় হয়। এই ঝড়ে গাছপালা ঘরবাড়ি ভেঙে যায়, অনেক ক্ষয় ক্ষতি হয়। আবার জৈষ্ঠ্য মাসে গাছে গাছে আম পাকে। বনে জঙ্গলে পাকা জাম দেখা যায় ,রঙিন একটি ফল। খেলে মুখ রঙিন হয়ে যায়। জৈষ্ঠ্য মাসকে মধুমাস বলা হয়।রাখাল গরুর পাল নিয়ে যায় মাঠে, দুপুর বেলা ক্লান্ত হয়ে বসে বট বৃক্ষের ছায়া তলে। একটু বিশ্রাম নিতে।
একদিন জৈষ্ঠ্য মাসের বিকেল বেলা । জঙ্গলের পাশেই ছিল মস্ত বড় একটা আম বাগান। সজারু ছানা আমবাগানে প্রতিদিন বিকেল বেলা সাথীদের সাথে খেলা করতে যায়।
সেদিন সজারু ছানাকে ,মা বললো আজ আকাশে অনেক মেঘ দেখা যাচ্ছে ।আকাশটা কেমন গুমোট হয়ে আছে, মনে হচ্ছে কালবৈশাখী ঝড় উঠবে। খবরদার আজ বাহিরে খেলতে যাবে না। ঘরের মধ্যে চুপচাপ করে বসে থাকবে ,একাই খেলা করবে ।সজারু ছানা বলল, ঠিক আছে আমি বাহিরে যাব না।
এর মধ্যে আকাশে শুরু হলো তান্ডব ।জোরে জোরে দমকা হাওয়া বইছে, আকাশে মেঘের গর্জন ,চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। সজারু ছানা মনে মনে ভাবছে ,যদি বাহিরে যেতে পারতাম কি মজাই না হতো ,ওই আম বাগানে বেশ আম কুড়ানো যেত। কিন্তু মা তো ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে দরজায় ।কি করে বের হব? এরমধ্যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও শুরু হলো।মায়ের চোখের পলক পড়তেই সজারুছানা দিলো এক দৌড়,একদম মা টের পেল না। আম বাগানে ঢুকতেই সাথীদের দেখতে পেলো। সবাই হাতে হাতে আম কুড়াচ্ছে আর খাচ্ছে । সজারু ছানা গিয়ে মাটি থেকে একটা আম কুড়িয়ে মুখে নিয়ে খাওয়া শুরু করলো ।সবাই সজারু ছানাকে দেখে খুব হাসাহাসি শুরু করলো বলল, বেচারা সজারু ছানা তোর আছেই ওই একখানা মুখ, তুই ওই মুখ দিয়ে একটা একটাই খা ।আমরা সব পটাপট কুড়িয়ে ঝুলি ভর্তি করি ।তুই বসে বসে দেখ আমাদের। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল সজারু ছানার ।ভাবছে ,বেশি আম কুড়িয়ে নেয়ার সমর্থ সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেয়নি, আর ওদের হাত দিয়েছে ,বুদ্ধিমত্তা দিয়েছে তাই ওরা আমগুলোকে কুড়িয়ে থলি ভর্তি করতে পারছে ।ইস্ কি টসটসে পাকা আম ।এতো আম পড়ে আছে বাগানে, খুব লোভ হচ্ছে ।এদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে। সবাই বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।আমার আম খেয়ে তৃপ্তি হচ্ছে না। আমি কি করে বাড়ি যাবো। কিছু আম যদি নিয়ে যেতে পারতাম ,তাহলে বাড়িতে বসে মজা করে খেতে পারতাম ।মনটা খুব খারাপ করে।আমগুলো মুখ দিয়ে এক জায়গায় জমা করল সজারু ছানা।কিন্তু জমা করে কি হবে আমার একটা মুখে একটা আম ছাড়া তো নেয়ার কোন উপায় নেই।মাথায় কোন আইডিয়া আসছে না ,কি করে আমগুলোকে বাড়ি নিয়ে যাবো। কি চমৎকার টস টসে রসে ভরা পাকা আম। গাছের তলায় একটি উঁচু করে আমগুলো জমা করে রাখতে শুরু করলো সজারু ছানা।
হঠাৎ মাথায় একটা আইডিয়া আসলো, আরে সৃষ্টিকর্তা আমাকে হাত দেয়নি ঠিকই, কিন্তু আমার পিঠে অসংখ্য কাঁটা দিয়েছেন । বুদ্ধি পেয়েছি এবার হুররে….। সজারু ছানা এবার মহা খুশি। এবার গিয়ে উঠলো গাছের ডালে, ঠিক যে জায়গায় আমগুলো জমা করে রেখেছিল ওই জায়গায় গাছের ডালে উঠে দাঁড়ালো, সেখান থেকে দিল এক উল্টো লাফ, পিঠ গিয়ে পড়লো জমা করা আমগুলোর উপর। সবগুলো আম সজারু ছানার কাঁটার মধ্যে আটকে গেল। তারপর সজারু ছানা সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো, আমগুলো পিঠে নিয়ে সজারু ছানা বাড়ি ফিরল। বাহ্ কি চমৎকার, সজারু ছানা ফিরল বাড়ি ,পিট ভর্তি আম নিয়ে।
“সৃষ্টিকর্তা যাকে যে ভাবে সৃষ্টি করেছেন,তার ভিতরে কোন না কোন প্রতিভা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন।তাই কাউকে বিদ্রুপ করা উচিত নয়”।

