নিরন্তর শুভকামনা রইল কবির জন্য।
কবি নাবিল নিশাত’র গুচ্ছকবিতা :
1) আকাশ-সমান্তরাল
চারিদিকে দৃশ্য জেগে ওঠে, আলো ও অন্ধকারের ছায়াপথে,
চোখে ধরা পড়ে ধ্বংসস্তূপের ফুল, অথচ—তুমি নেই।
তুমি, যে আছো এই একই আকাশের নিচে,
তবু যেন ভিন্ন কোনো স্তরভিত্তিক জ্যোতিরেখায় বাস করো।
আমার আকাশে প্রতিনিয়ত ঝড়—
নীরব বজ্রপাত, শব্দহীন বিদ্যুৎ,
রাতের গর্ভে জন্ম নেয় জলভরা সংলাপ।
তোমার আকাশে কি সেগুলো থেমে থাকে?
নাকি সেখানেও মেঘ জমে, শুধু বৃষ্টির ভাষা বদলে যায়?
আমি বাতাসে স্পর্শ খুঁজি,
জানালার কাঁচে তোমার অনুপস্থিতির ছায়া দেখি—
এবং ভাবি,
তুমি কি সেই আলোক-ছায়ার মাঝের স্থগিত রেখা,
যেখানে দিন আর রাত কেবল স্পর্শ করে,
কখনো মেশে না?
তুমি কি দেখো না,
সমান্তরালে হাঁটতে হাঁটতে
আমরা কেবলই দূরত্বের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হয়ে উঠছি—
তুমি সেই আকাশের যার রং আমি ভুলে গেছি,
আমি সেই ভূমি, যার ভূকম্পনে
তোমার পদচিহ্ন আর অনুরণিত হয় না।
2) অলিখিত জলরেখা
রাত্রির ক্যানভাসে কেউ একফোঁটা ঘুম ফেলে গিয়েছিল—
তা থেকে জন্ম নিল এক শহর
যেখানে প্রতিটি বাড়ির ছাদ
একটি অনুচ্চারিত প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
আমরা হাঁটছি না আসলে—
আমরা প্রতিফলনের সঙ্গে চলি
পায়ের নিচে নয়, কুয়াশার ভিতরে সরে যায় ভূমি
আর আমরা তা ভুল করি পরিচিত পথ ভেবে।
তুমি কি কখনো ছুঁয়েছো কাচের ভেতরে আটকে থাকা গন্ধ?
ওটা আসলে এক অসমাপ্ত গল্পের মৌনতা
যা ফুল হয়ে ফোটে না—
শুধু প্রতিদিন আরও ঘন হয়ে ওঠে একেকটি শব্দহীন পাপড়িতে।
কোনো রংয়ের নিজস্ব ব্যথা থাকে—
যেমন নীল…
যার গভীরে ডুবে থাকে সমস্ত না-বলা অনুরাগ
আর লাল—
যা আসলে সূর্যাস্তের মুখোশ পরে, নিঃশব্দ বিদায় চায়।
ছায়া এখানে শুধু আলো নয়—
একটি বিকল্প জীবনের অসম্পূর্ণ ছাপ
যা বাস্তবের তুলনায় বেশি সত্য
আর কম প্রমাণযোগ্য।
এখানে কেউ কাউকে বোঝে না
তবে ছায়াগুলো ঠিক বুঝে ফেলে—
কে কতটুকু আলো গোপন রেখেছে নিজের ভেতর।
3) ঝিলামের সুর
আমি ঝিলামের মতো অসম্পূর্ণ—
যার মোহে আকৃষ্ট ভুবন তবুও যেমন তার গায়ে পরাধীনতার শেকল
ঠিক তেমনই!
আমার অন্তরের ফসিল তোমার নামে লেখা
অথচ_ আমার খোঁজ নেই সময়ের কার্নিভালে কিংবা তোমার হৃদয়ে।
যদিও আমি ভুলে ভরা ছন্দহীন কবিতার উপমা
তবুও তোমার উরোজে মাথা রাখার পরম প্রত্যাশায় প্রত্যাশীত —
আমার হৃদবিছানা।
আমার অসংলগ্ন মৌন বাক্যের অমিয় সুধা টেনে
অযাচিত ভুলের সকল আক্ষেপ ভেঙে
কভুও যদি তোমার অশান্ত নদীর জোয়ার বোঝে, আমার সুপ্ত বাসনা
তবে ডাইকো!
আমি পরাধীন দ্রোহের মিছিলের সারি টুটে ঠিকই পৌঁছে যাবো তোমার কাছে!
যেখানে বর্ষায় মেলে বসন্ত
আর বসন্ত মানে সব ভুলে নতুনভাবে আবিষ্কারের যৌথ প্রযোজনা।
শুধু একবার,
আরেকবার,
আমারে ডাইকো!
———————————————————————///—————————————————
এক নজরে কবি নাবিল নিশাত :
নাম: নাবিল নিশাত (নাবিল আহমেদ নিশাত) সমকালীন বাংলা সাহিত্যের একজন উদীয়মান তরুণ কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। ২০০৯ সালের ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশের জামালপুর জেলার লাঙ্গলজোড়া বিলপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে (মন্ডলবাড়ী) তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতার নাম এস. এম. সোহেল এবং মাতার নাম মর্জিনা বেগম। বর্তমানে তিনি জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে অধ্যয়নরত আছেন।
অত্যন্ত অল্প বয়স থেকেই সাহিত্যের জগতে নাবিল নিশাতের পদচারণা। মানুষের জীবনের জটিল মনস্তত্ত্ব, গভীর জীবনদর্শন এবং আত্মোপলব্ধিকে শান্ত-সমাহিত ও নান্দনিক শব্দবুননে কবিতায় ফুটিয়ে তোলাই তাঁর লেখার মূল বৈশিষ্ট্য। তাঁর প্রশংসিত প্রথম একক কাব্যগ্রন্থ ‘ফিলোসোফির অদৃশ্য অসুখ’ পাঠক ও সাহিত্যমহলে বেশ সমাদৃত হয়েছে।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নাবিল নিশাত একজন আবৃত্তিশিল্পী, উপস্থাপক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক। বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবিতার তরুণ কবিদের মাঝে তিনি অন্যতম। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে সৃজনশীল উপায়ে তুলে ধরাই তাঁর ভবিষ্যৎ লক্ষ্য।

