এক জীবনে অনেক জীবন…
অনেককে বলে থাকি, মানুষটা খুব ভালো। হয়তো বলার জন্য বলি। অনেক সময় মানুষটা ভালো না জেনেও বলি। কিন্তু ইসহাক ভাই মানুষটা সত্যি সত্যিই ভালো মানুষ। একদিন বাসায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার বড় আয়োজন করেছিলেন। সে কারণে বলছি না। একেবারে মন থেকে, বিশ্বাস থেকে বলছি।
আবার দীর্ঘ পরিচয় থাকলে এমন নিশ্চিত করে বলা যায়। কিন্তু ইসহাক ভাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ পরিচয় নয়। খুব অল্প দিনের জানাশোনা। তাঁকে দেখে মনে হয়েছে, ভালো মানুষ চিনতে দীর্ঘ পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না।
ইসহাক ভাইয়ের যে বয়স, সেটা নিয়ে অহংকার করা যায়। অতএব, তাঁর জন্মদিন উৎসবের সঙ্গেই পালন হওয়া উচিত।
শুভ জন্মদিন, ইসহাক ভাই।
ইসহাক ভাই কবিতা লেখেন কি না জানি না। তাঁর মুখে কবিতা শোনা হয়নি। কিন্তু ভাবছিলাম, যদি তিনি তাঁর জন্মদিনে কবিতা লিখতেন, তাহলে কী লিখতেন? হয়তো লিখতেন—
‘মোমবাতির আলোয় জ্বলে উঠুক আমার তারুণ্য আরেকবার।’
সেই প্রার্থনাই করি—
‘মোমবাতির আলোয় ইসহাক ভাইয়ের তারুণ্য জ্বলে উঠুক বারবার।’
জন্ম অনিশ্চিত। কিন্তু মৃত্যু নিশ্চিত। মৃত্যু নিশ্চিত বলেই মানুষ হয়তো জীবনকে এত ভালোবাসে। কবিও বলেছেন—
‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।’
ইসহাক ভাইদের মতো মানুষ হয়তো অনাবিল আনন্দ নিয়ে বাঁচেন। কিন্তু কেন যেন আমার কেবলই মনে হয়, বেঁচে থাকাও অত সহজ নয়। মানুষের বেঁচে থাকা আশ্চর্য ঘটনা! মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে, সে এক বিস্ময়!
একজন মানুষের জীবনে অনেকবার মৃত্যুর সম্ভাবনা তৈরি হয়। তার ওপর নানা সংকট, নানা সমস্যা, নানা বৈরিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এত কিছুর পরও যে মানুষ বেঁচে থাকে, তাঁকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে।
ইসহাক ভাই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। কোনো মুক্তিযোদ্ধাই জানতেন না যে তিনি আর ফিরে আসবেন। জীবন হাতে নিয়েই যুদ্ধে গিয়েছিলেন। যুদ্ধ থেকে অনেকেই ফিরে আসেননি। তিনি যে ফিরে এসেছেন, এ-ও তাঁর এক নতুন জীবন।
তা ছাড়া ইসহাক ভাই একজন লেখক। লেখকেরা এক জীবনে অনেক জীবনের অনুভূতি পান। প্রত্যেক চরিত্রের মধ্যেই তাঁরা নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন।
জীবনকে গভীরভাবে ভালো না বাসলে সে জীবন আনন্দ দেয় না। ইসহাক ভাইয়ের মধ্যে এই ভালোবাসাটাই দেখেছি।
আইরিশ সাহিত্যিক বার্নার্ড শ একটু পাগলাটে ছিলেন। তিনি মরতে চাইতেন না। বিরানব্বই বছর বয়সে ঘোষণা করলেন, তিনি মরবেন না। সবাই ভাবতে শুরু করল, তিনি হয়তো মরবেন না। অথচ মৃত্যুর পরও তিনি কী দারুণভাবেই না বেঁচে রইলেন। ইসহাক ভাইদেরও বেঁচে থাকার সেই শক্তিটা আছে।
জন্মদিন হলো ব্যাংকের সুদের মতো—বাড়তেই থাকে, কমে না। কিন্তু জন্মদিনের রহস্য হলো, এমন দিনে মনে হয় বয়স যেন আবার আঠারো। আর ইসহাক ভাইয়ের ক্ষেত্রে সেটা আরও কম।
শুনেছি, এক চীনা কবির ‘জং’ নামে একটি কবিতা আছে। কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্র এমন চমৎকার অনুবাদ করেছিলেন যে এক-দুই সংস্করণের পর আর চীনা কবির নাম থাকে না। কবিতাটি প্রেমেন্দ্র মিত্রের নামেই ছাপা হতে থাকে।
কবিতাটি হলো—
হাওয়া বয় সন সন
তারারা কাঁপে।
হৃদয়ে কি জং ধরে
পুরোনো খাপে।
কার চুল এলোমেলো,
কী-বা তাতে এলো-গেলো!
কার চোখে কত জল,
কে-বা তা মাপে?…
জেনে কী-বা প্রয়োজন—
অনেক দূরে বন
রাঙা হলো কুসুমে, না
বহ্নিতাপে?
এই কবিতাটি মানুষের গভীর একাকীত্ব এবং উদাসীনতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। চারপাশের চেনা জগতের মাঝেও কবি এক বিমূর্ত বিষাদের ছবি এঁকেছেন।
মানুষের দীর্ঘদিনের জমানো দুঃখগুলো এখানে রূপক হয়ে উঠেছে। জাগতিক কোনো সম্পর্কের প্রতিই কবির মনে আর কোনো মোহ বা আকর্ষণ নেই। কারও চোখের জল কিংবা এলোমেলো চুলের বেদনা পরিমাপ করারও ইচ্ছে তাঁর নেই।
সবশেষে তাঁকে এক অদ্ভুত বৈরাগ্য ভর করে। দূরের বন ফুলের রঙে রাঙা হলো, না আগুনের তাপে পুড়ে গেল—তাতে তাঁর কিছুই আসে যায় না। সৃষ্টি আর ধ্বংসের এই চিরন্তন খেলায় তাঁর মন আজ নির্লিপ্ত।
কিন্তু আমাদের ইসহাক ভাই মোটেই সেরকম নন। তাঁর জীবনে কোনো একাকীত্ব বা উদাসীনতার ছোঁয়া নেই। কারও চোখে জল এলে কিংবা কারও চুল এলোমেলো হলে তিনি গভীর বেদনায় ডুবে যান। দূরের কোনো বন ফুলের রঙে রাঙা হলে তিনি তার ঐশ্বর্য অনুভব করেন। আবার পুড়ে গেলেও দুঃখ পান। অন্তত যতদিন শ্যামলী আপা এই আকাশের নিচে আছেন।
আমাদের ইসহাক ভাই বরং ওই কবিতাটাই বিশ্বাস করেন—
দুর্বার তরঙ্গ এক বয়ে গেল তীর-তীব্র বেগে,
বলে গেল : আমি আছি যে মুহূর্তে আমি গতিমান;
যখনই হারাই গতি, সে মুহূর্তে আমি আর নাই…
তবে বেঁচে থাকা নিয়ে আমার ব্যক্তিগত ধারণা বদলে গেছে। যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল, মুদ্রাস্ফীতি আর যানজট, তাতে অন্তত কাউকে বেঁচে থাকার দোয়া করতে সাহস পাই না। হা হা হা! এ মাসে আমার নিজেরই বিদ্যুৎ বিল গত মাসের দ্বিগুণেরও বেশি এসেছে। বাসার খরচের জন্য তন্দ্রকে যে টাকা দিই, এবার বিদ্যুৎ বিলের জন্য সে আরও বেশি টাকা নিয়েছে।
মানুষ কারণে অনেক কিছু বলে। আবার অকারণেও বলে। এখানে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনের একটি গল্প হয়তো অকারণেই বলছি।
সে অনেক আগের কথা। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক। সালটি ১৯৪১। তখন নজরুলের বয়স ৪২ বছর। দুই বাংলায় প্রথমবারের মতো তাঁর জন্মদিন পালিত হচ্ছে। চারদিকে সাড়া পড়ে গেল। কারণ, সে সময় রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, বঙ্কিম কিংবা শরৎচন্দ্র—কারওই পঞ্চাশ বছরের আগে জন্মদিন পালন হয়নি। সেখানে নজরুলের জন্মদিন পালিত হওয়া ছিল এক বিরাট ঘটনা।
কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এবং চট্টগ্রামের বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পরিষদ—সম্ভবত সংগঠন দুটির নাম এমনই ছিল—তাঁদের উদ্যোগেই জন্মদিনটি পালিত হয়।
মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সওগাত পত্রিকায় এ উপলক্ষে একটি অসাধারণ সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল—
‘এত অল্প বয়সে একজন কবির এই স্বীকৃতি আমাদের আনন্দিত করে। এটা অনেক বড় কথা। কিন্তু নজরুল এই বড় কথার থেকেও অনেক বড়। কারণ, তিনি একজন খাঁটি যুগস্রষ্টা।
রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, বঙ্কিমও যুগস্রষ্টা। কিন্তু তাঁদের যুগস্রষ্টা হইবার জন্য সারা জীবন সাধনা করিতে হইয়াছে। কিন্তু নজরুলকে যুগস্রষ্টা হইবার জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করিতে হয় নাই। তিনি সাধারণ মানুষের মুখের বাণী সঙ্গে নিয়াই আসিয়াছেন। তিনি আসিয়াই যুগস্রষ্টা হইয়াছেন। শুরু থেকেই মানুষ তাঁহার পরিচয় পাইয়াছে। তাঁহাকে ভালোবাসিয়াছে। বাংলার মানুষ তাঁহার কণ্ঠস্বর শুনিয়াই বুঝিয়াছে যে, তাহাদের নায়ক আসিয়াছে। অতএব, যতই নজরুলের জন্মদিন পালন হইবে, ততই তাঁহাকে আরও বেশি জানিবার সুযোগ হইবে।’
শুধু শেষ কথাটুকু দিয়েই শেষ করি—
‘যতই ইসহাক ভাইয়ের জন্মদিন পালিত হইবে, ততই তাঁহাকে আরও বেশি করে জানিবার সুযোগ হইবে।’
শুভ জন্মদিন, ইসহাক ভাই। এই বঙ্গদেশে জন্মেছিলেন বলেই আপনাকে নিয়ে দুই কলম লেখার দুর্লভ সুযোগ হলো। ভালো থাকবেন জীবনের প্রতিটি দিন। অনেক অনেক শুভেচ্ছা, শুভকামনা, অভিনন্দন ও ভালোবাসা।
আশফাকুজ্জামান
কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক

