ড. মনোরঞ্জন দাস-এর ১০টি ছড়া
১
কাঁদুনি পেত্নি
কাঁদুনি এক পেত্নি আছে
গাব গাছেতে বাস
অন্য সব পেত্নি জেনো
তার কাছে হে ত্রাস।।
সতীন তোর দেখলে পরে
চেঁচিয়ে উঠিস তুই
ককিয়ে জোরে,
বলতে থাকিস,
কোথায় তোরে থুই!
একটা মানুষ দেখলে পরে
কেঁদেই হোস হারা
তোর কাঁদা কি চলছে ওরে
বংশ পরম্পরা।।
ভূতের রাজা আসছে ঐ
তুই পালিয়ে যা
দাঁড়িয়ে তুই থাকলে পরে
বাঁচতে পারবি না।।
২
মেছো পেত্নি
মেছো পেত্নি, দেখছি তোর
জলার ধারে বাস
মাছটা তুই দেখলে পরে
খপাস করে খাস।।
বৃষ্টি যদি পড়ে জোরে,
তুই ভিজে মরিস
ঘর থেকে বেরিয়ে তুই
লোভের মাঝে থাকিস।।
বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকিস
জলার জলেতে
সর্দি তোর হবে ঠিকই
বলছি জোরেতে।।
একটা মাছও পেলি না,
অপেক্ষা হল সার
এবার তুই জলা থেকে
হ’রে পগাড় পার।।
৩
প্রেমিক পেত্নি
প্রেমিক পেত্নি বাস করে
বকুল গাছের ডালে
বিষ খেয়ে সে মরেছিল,
মরেছিল অকালে।।
সুন্দরী এক বামুন মেয়ে
ছিল জীবদ্দশায়
নীচু জাতে প্রেম করে
তারই এ হাল হায়!
বাবামা মত দিল না
সেও জেদী ভীষণ
সব কিছু ভেবেই সে
বেছে নিলো মরণ।
সেই থেকে সে পা ঝুলিয়ে
থাকে বকুল গাছে
বামুনকে সে ঘাড় মটকায়
এলে তার কাছে।।
৪
সাঁতারু পেত্নি
সাঁতার কাটে পেত্নি জলে
ভয় যে তার নেই
গভীর রাত হলে পরে
নামে জলেতেই।।
হাতপা ঘোরায় সে-ই,
মাঝ পুকুরে যায়
জলের শব্দ শুনে সবে
অবাক হয়ে যায়।।
দূর থেকে তার প্রেমিক ভূতো
পাড়ের পাশে আসে
এসেই সে চেঁচিয়ে বলে
মরবি অবশেষে।।
জলেই নাম, মরি দু’জন
সেটাই হবে বেশ
দ’জন মিলে প্রেমেই মজি
মজি সবিশেষ।।
৫
কেশো পেত্নি
পেত্নি থাকে পাহাড় পুরে
সে যে বহুদূর
কেশে কেশেই মরণ তার
কাশে সুপ্রচুর।।
কাশির শব্দ শুনে সবে
বিরক্ত যে হয়
সবাই তাক তাড়িয়ে দেয়,
হেথায় থাকা নয়।
বাধ্য হয়েই এবার সে
চড়ার পাশে আসে
চড়ার পাশে পাকুড় গাছে
বাসা-ই বাঁধে সে।
চার পাশে তার শূন্য শুধু
কেউ নেই কো পাশে
রাতভর সে আপন মনে
একাই শুধু কাশে।
৬
পেত্নিরানী
পেত্নিরানী ভূতরাজারই
পাঁচ নম্বর বউ
অন্য সব সতীন তার
নাচছে দ্যাখো ছৌ।।
রাজার কথায় পেত্নি রানী
নাচতে থাকে নিজে
সবার সাথে পা মেলে না
করবে সে কি যে!
ঘুঙুরে জোর শব্দ তোলে
অন্য পেত্নি সব
সোঁ সোঁ হাওয়ায় দ্যাখো
ওঠে ঐ কলরব।
রাত বাড়লে সব পেত্নি
পড়ে ক্লান্ত হয়ে
পেত্নিরাণী একা নিজে
যায় ঘরে সে ধেয়ে।
৭
ঝগড়ুটে পেত্নি
ঝগড়া করে সারা রাত
ঝগড়ুটে পেত্নি ঐ
তার মতো ঝগড়ুটে হে
এ পাড়াতে নেই।।
একটা ছুতো পেলেই সে
ঝগড়া বাধিয়ে দেয়
তাকে দেখে সবাই ভাই
দূরে সরে যায়।
ক্যাটর ক্যাটর করে সে
ভাষা কর্কশ বটে
তার দুর্ণাম দ্যাখো হে
পাড়ায় পাড়ায় রটে।।
মাঝে মাঝে তার বর
চুলের মুঠি ধরে
সবার মাঝে একাই সে
মারে জোরে জোরে।।
৮
ছিঁচকাঁদুনে পেত্নি
ছাতিম গাছে থাকে পেত্নি
ছিঁচকাদুনে বটে
কেন এমনটা করে সে?
কি আছে তার ঘটে?
বাতাসে যদি শুকনো পাতা
করে খস্ খস্
পেত্নি তখন কেঁদে ওঠে
করে ওঠ্ বস্।।
অন্য পেত্নি একটু জোরে
কথা যদি বলে
ছিচকাঁদুনে ফুপিয়ে কাঁদে,
কাঁদে নানা ছলে।।
ভূতের পাড়ায় তাকে নিয়ে
হয় নানান কথা
সবাই বলে, ছিঁচকাদুনে
একদম হে যা তা!
৯
নাচনি পেত্নি
ভূত দাদা, এসো ছুটে
নাচছে পেত্নি ওই
তার মতো নাচনি নাকি
এ পাড়াতে নেই।।
ধিনাক ধিনা নাচে সে
ভূতেরা তাল ঠোকে
এসব দেখে আরেক পেত্নি
আসর মাঝে ঢোকে।।
দুই পেত্নি নাচে বেশ
তাল কাটে না ওহে
নিঝুম রাতে বনের মাঝে
কভূ যেও না হে।।
ঘোমটা মাথায় পেত্নি দু’জন
নাচে ঘুরে ঘুরে
তাদের নাচে ভূতেরা সব
থাকে আজব ঘোরে।।
১০
ছেলে ধরা পেত্নি
গ্রামের মাঝে ঘুরে বেড়ায়
পেত্নি, ছেলে ধরা
বাচ্চা ছেলে খুঁজেই চলে
চলে অতি ত্বরা।
ছেলে ধরা পেত্নি সে-ই
ছলচাতরি করে
ভাবতে থাকে নিজেই সে,
ধরবো ছেলে জোরে।
একটা ছেলে আস্তে হেঁটে
গাছতলাতে দাঁড়ায়
ছেলে ধরা পেত্নি তখন
তার দিকেতে ধায়।
বিধূ খুড়ো, ওঝা বড়ো,
এই পথেতে আসে
খুড়োর দিকে তাকিয়ে পেত্নি
পালায় রুদ্ধশ্বাসে।
________________
ড. মনোরঞ্জন দাস একজন ভারতীয় লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক ও অর্থনীতিবিদ

