কবি সরকার মাসুদ: এক আলোকিত উচ্চারণ
জামিল জাহাঙ্গীর
বিক্রমপুরের কুঞ্জবিহারী মহাবিদ্যালয়—এক প্রাচীন বিদ্যাপীঠ, যার প্রাঙ্গণে বিদ্যার আলোয় যেন সময় থমকে থাকে। এইখানেই ইংরেজি পড়াতেন এক কবি—যাঁর কণ্ঠে গল্পের সুর, বাচনে কবিতার অনুরণন। আমি তখন পাশের উপজেলার সরকারি শ্রীনগর কলেজের ছাত্র। আমাদের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক গোপাল চন্দ্র দেব ও অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম। তাঁদের ক্লাসে The Gift of the Magi, Mother in Manville কিংবা The Luncheon পড়ে আমরা জেলার সেরা ছাত্রের খেতাব জিতে নিয়েছিলাম।
কিন্তু জেলা শহরে গিয়ে শুনলাম, কে বি কলেজে এমন একজন শিক্ষক আছেন, যিনি ইংরেজি পড়ান গল্প বলার মতো করে। কৌতূহল জাগল—কেমন করে পড়ান তিনি? একদিন কয়েকজন বন্ধু মিলে চুপিসারে ঢুকে পড়লাম তাঁর ক্লাসে। বন্ধুদের আগেই বলে রেখেছিলাম, স্যার যেন কিছুতেই টের না পান।
তাঁর বাচনভঙ্গি ছিল একেবারেই আলাদা। গানের মতো ধীর ছন্দে শুরু, তারপর ক্রমশ কণ্ঠের উচ্চতা বেড়ে ওঠে আবৃত্তির ঢেউয়ে। পেছনের বেঞ্চে বসে আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তিনি একবার আমাদের দিকে তাকিয়েছিলেনও, কিন্তু কিছু বলেননি। হয়তো বুঝে ফেলেছিলেন, এই তরুণদের চোখে সাহিত্য ও ভাষার নতুন রং জেগে উঠছে।
উইলিয়াম শেক্সপিয়র দেখতে গিয়ে যেন আমরা আবিষ্কার করলাম বব ডিলানকে—সুরে, বাক্যে, চিন্তায় এক অদ্ভুত সম্মিলন। ক্লাস শেষে মালখানগর মাঠে ফুটবল খেলতে গেলাম বটে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বরের সুর কিছুতেই মাথা থেকে নামল না।
এরপর শাহজাহান বাচ্চু ভাইয়ের ‘বিশাকা’য় পরিচয়। সেখানেই আবার দেখা সেই শিক্ষকের সঙ্গে, এবার কবি হিসেবে। যেন আরেক মানুষ—রংপুরের রঙ্গপ্রিয়তা আর চিকলি নদীর মতো স্বচ্ছ অথচ গভীর এক সত্তা নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত। তিনি ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দিনের মাটির সন্তান, আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য কণ্ঠ—কবি সরকার মাসুদ।
ইছাপুরা, সিরাজদিখান, মালখানগর—এসব জনপদ তাঁর কবিতার ভূগোল। আজকের এক্সপ্রেসওয়ে তাঁর জন্মভূমিকে আরও কাছে এনেছে বিশ্বের সঙ্গে। এই মাটিতেই তিনি শব্দের বীজ বুনেছেন; সেই বীজ থেকে জন্ম নিয়েছে মানবতা, প্রেম ও প্রজ্ঞার নানা বৃক্ষ।
আজ এই মহান শিক্ষক ও কবির জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। তাঁকে নিয়ে দু-চার লাইন লিখে শান্তি মেলে না। মনে হয়, অন্তরের কোথাও এক মহাকাব্যের প্রস্তুতি চলছে—যার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে জড়িয়ে আছে বিস্ময়, মুগ্ধতা আর ব্যক্তিগত ঋণস্বীকার।
জনপ্রিয়তা নয়, মানুষের ভালোবাসাই আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন। আপনি থাকুন হাসি ও আনন্দের যৌথ মেলায়, আমাদের কবিতার, শিক্ষার ও জীবনের এক প্রিয়জন হয়ে। আপনার আলোকিত উচ্চারণ ছড়িয়ে পড়ুক আগামী দিনের তরুণদের কণ্ঠেও।
শুভ জন্মদিন, প্রিয় কবি সরকার মাসুদ।

