প্যাকলোবিউট্রাজল ব্যবহারে কতটা নিরাপদ আমাদের কৃষি
— মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
একটি ফলের বাগান শুধু কিছু গাছের সমষ্টি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন কৃষকের বছরের পর বছর ধরে লালন করা স্বপ্ন। একটি চারা রোপণ থেকে শুরু করে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে থাকে কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য, অনিশ্চয়তা এবং প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা। তাই বেশি ফলনের আকাঙ্ক্ষা কৃষকের জন্য একেবারেই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা যখন দ্রুত লাভের আশায় অতিরিক্ত রাসায়নিকনির্ভর হয়ে ওঠে, তখন উদ্বেগের জায়গাও তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ফলচাষে বহুল আলোচিত একটি নাম প্যাকলোবিউট্রাজল (Paclobutrazol)। আম, লিচু, পেয়ারা, লেবুসহ বিভিন্ন ফলগাছে দ্রুত ফুল আনা এবং ফলন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। অধিক উৎপাদন ও বেশি লাভের আশায় অনেক কৃষক এই প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—স্বল্পমেয়াদি লাভের এই পথ দীর্ঘমেয়াদে আমাদের কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ?
প্যাকলোবিউট্রাজল মূলত একটি উদ্ভিদ বৃদ্ধিনিয়ন্ত্রক। এটি গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে ফুল ও ফল ধারণে সহায়তা করে। বিজ্ঞানসম্মত মাত্রা ও নির্ধারিত নিয়ম মেনে ব্যবহার করলে কিছু ক্ষেত্রে এর উপকারিতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসরণ না করে অতিরিক্ত বা ভুলভাবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখান থেকেই শুরু হচ্ছে উদ্বেগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো কৃষি রাসায়নিকের মতো প্যাকলোবিউট্রাজলের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত মাত্রা, সময় এবং ব্যবহারবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্য, মাটি এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। স্প্রে করার সময় সরাসরি সংস্পর্শে এলে ত্বক, চোখ কিংবা শ্বাসতন্ত্রে সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায়ও সতর্কতার কথা বলা হয়েছে।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, মাঠপর্যায়ে অনেক কৃষক এখনো প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করেন না। গ্লাভস, মাস্ক কিংবা সুরক্ষিত পোশাক ছাড়াই তারা এসব রাসায়নিক প্রয়োগ করেন। ফলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় তারাই প্রথম স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হন। নিরাপদ কৃষি নিয়ে আলোচনা করতে হলে তাই কৃষকের নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এই রাসায়নিকের সম্ভাব্য প্রভাব শুধু মানুষের শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়। অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মাটির উপকারী অণুজীবের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে, কমিয়ে দিতে পারে মাটির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা। কৃষির প্রাণই যদি মাটি হয়, তবে সেই মাটির সুস্থতা রক্ষা করাই হওয়া উচিত আমাদের প্রথম দায়িত্ব।
তবে এটাও সত্য, প্যাকলোবিউট্রাজল নিজেই সব সমস্যার কারণ নয়। মূল সমস্যা তৈরি হয় যখন এটি অজ্ঞতাবশত, অতিরিক্ত বা নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করা হয়। প্রযুক্তি কখনো ক্ষতিকর নয়; ক্ষতিকর হয় প্রযুক্তির ভুল ব্যবহার। তাই কৃষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, সঠিক পরামর্শ এবং কার্যকর তদারকির বিকল্প নেই।
অধিক ফলনের জন্য নিরাপদ পথও রয়েছে। সুষম সার ব্যবস্থাপনা, জৈব উপাদানের ব্যবহার, নিয়মিত ছাঁটাই, উন্নত বাগান ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত সেচ এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করেও ভালো ফলন অর্জন করা সম্ভব। হয়তো এতে তাৎক্ষণিক চমক কম থাকবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কৃষক, ভোক্তা এবং পরিবেশ—সবার জন্যই এটি অধিক কল্যাণকর।
বাংলাদেশের কৃষি এখন এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লেই কৃষির সাফল্য পূর্ণতা পায় না। সেই খাদ্য যদি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, তবে সেই সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
একটি ফল কেবল বাজারে বিক্রির পণ্য নয়। এটি একটি শিশুর পুষ্টি, একজন অসুস্থ মানুষের খাদ্য, একটি পরিবারের প্রতিদিনের আহার এবং একটি জাতির সুস্থ ভবিষ্যতের অংশ। তাই ফলের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আমাদের সমান দায়িত্ব।
আজ প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত, কার্যকর তদারকি, কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ কৃষি প্রযুক্তির বিস্তার। উৎপাদনের সঙ্গে নিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই কৃষির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের কৃষি এগিয়ে যাক—তবে সেই অগ্রযাত্রা হোক নিরাপদ খাদ্য, সুস্থ মানুষ এবং জীবন্ত মাটির অগ্রযাত্রা। কারণ কৃষির প্রকৃত সাফল্য শুধু বেশি ফল উৎপাদনে নয়, মানুষের আস্থা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত। বেশি ফল নয়, নিরাপদ ফলই হোক বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের মূল অঙ্গীকার।
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
আলেম, কৃষি উদ্যোক্তা পরিচালক, কতকিছুর হাট ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

