মাতৃত্বে নারীবান্ধব সমাজ অপরিহার্য
— অ্যাডভোকেট জান্নাতুননেছা তমা
মাঝে মাঝে পৃথিবীর রঙটাকে ফ্যাকাশে মন হয়! মাতৃত্ব এবং ক্যারিয়ার দুটো একসাথে গড়ে তোলা যেন জীবনের সবচেয়ে নিকৃষ্ট অভিজ্ঞতা এমনকি সন্তানের সেবার জন্য ক্যারিয়ার ত্যাগ করতে হচ্ছে অনেক নারীর কিন্তু প্রতিদানে কি পাচ্ছে তারা??
গত সপ্তাহে আমি দুজন গৃহীনি মায়ের সাথে কথা বলেছি যারা দুজনেই মাস্টার্স পাস এবং ক্যারিয়ারমুখী নারী কিন্তু সন্তানের দেখভাল করার জন্য তাদের আর চাকরি করা হয়নি এমনকি সাংসারিক কাজের পর একটু বই পড়ার এনার্জি থাকে না আর এর বিনিময়ে শ্বশুর বাড়ির অপমান আর হজম করতে পারছেননা একজন, এমনকি বাবার বাড়ি থেকে সাপোর্ট নিয়ে তাকে একরকম পেইং গেস্ট হয়ে স্বামীর সংসার করতে হচ্ছে। অন্যজন সহ্য করতেছে স্বামীর পরোকিয়া কেননা সন্তানের মায়ের তো চেহারা খারাপ হয়ে গেছে, স্বামীকে সময় দিতে পারে না, স্বামীর সামনে সাজুগুজু করে মনোরন্জন করতে সে ব্যার্থ। সবচেয়ে বড় কথা এই দোষগুলো স্বামী নিজ মুখে তাকে বুঝিয়ে দেয় এবং অন্য নারীর সুন্দর গেটআপ আর ভাল ব্যবহারে সে মুগ্ধ।
আচ্ছা!! সন্তান জন্মদান থেকে শুরু করে লালন – পালন সবকিছু কি একমাত্র মায়ের দায়? বাবা কেবল টাকা দিলেই সকল দায়িত্ব পালন করলো?? দাদীর কি দায়িত্ব নেই নাতি-নাতনীদের কে লালান পলানে অংশ নেওয়া নাকি বৌমা পরের মেয়ে বলে তাকে সাহায্য করা যায় না?? আমাদের সমাজে একটি মেয়ের বাচ্চা হলে মেয়েটিকে সাপোর্ট করে তার নিজের মা অর্থাৎ বাচ্চার নানী তাহলে দাদি কিভাবে নিজেকে আপন মানুষ বলার অধিকার রাখে??
এমন কথা বললে আবার সাংসারিক বিষয় চলে আসবে যা আমার বলার বিষয় নয়। আমার বলার বিষয় হচ্ছে, এই ক্যারিয়ারমুখী নানীর জীবনে বাচ্চা বাধা আবার ক্যারিয়ার শুরুর পর বাচ্চার জন্য ক্যারিয়ার ত্যাগ করে সংসারের যাতাকলে নারীর নিঃশ্বেষ হয়ে যাওয়া, এটা নিয়ে কি আমাদের কারো কিছু করার নেই??
এবার বলি ডে-কেয়ার সেন্টারের কথা। ডে- কেয়ার সেন্টার আমাদের সমাজে নারীদের একটা বিশাল সাপোর্ট এবং এই ডে-কেয়ার ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবিতে থেমে নেই, এটা এখন জাতীয় দাবি নারীর ক্যারিয়ার রক্ষায় এমনকি শ্বশুর বাড়িতে সংসার করা গৃহিনী মায়ের জন্য আরো বেশি জরুরি একটু বিশ্রামের সময় পাওয়ার জন্য কেননা আমাদের সমাজে বেশিরভাগ পরিবারে শ্বশুর বাড়িতে ছেলের বউ বিনা বেতনের চাকরানী আর বাচ্চা হলে তো তার শারীরিক মানসিক যন্ত্রণার সীমা থাকে না।
আমাদের সুশীল সমাজ এবং সরকার বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে জনজীবনে শান্তি আনার বিষয় সচেতন আমরা জানি। এখানে আমার অনুরোধ এবং আমি কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবো-
আমাদের সমাজে এখনো নারীরা প্রয়োজনে ঘরের বাহির হয়; কেউ চাকরি করে কেউ বা বিজনেস করে তার জীবিকা নির্বাহ করে আর এই সুস্থ স্বাভাবিক সমাজ গঠনে নারীর অবদানকে আমরা অস্বীকার করতে পারিনা তাই সমাজকে নারীবান্ধব হতে নারীকে সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে, ক্যারিয়ারে নারীর পাশে মানসিক সাপোর্ট হতে ডে-কেয়ারের বিকল্প নেই।
বাচ্চার জন্য ন্যানী রাখার সামর্থ সবার নেই, বাচ্চার সাথে থাকতে সকল মেয়ের মা – বোন নেই, বাচ্চার জন্য ক্যারিয়ার ছেড়ে দেওয়ার মতন আর্থিক বা মানসিক সাপোর্ট সবার নেই।
সুস্থ ধারার সমাজ গঠনে নারীর গুরুত্ব অপরিসীম এবং আমাদের পারিবারিক ও সমাজ ব্যবস্থার উন্নয়নে নারীর উৎপাদন শক্তি কে কাজে লাগাতে নারী বান্ধব সমাজ গঠনে ডে-কেয়ার অপরিহার্য।
এছাড়াও আমাদের প্রবাসী নারীরা সন্তানকে ছেড়ে বছরের পর বছর দূরে থাকে এবং তাদের বৃদ্ধ মা (সন্তানের নানী) ওই সন্তানকে লালন পালন করতে শরীরে শক্তি পায়না, অনেক সন্তান মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, বিপথে চলে যায়।
আমাদের প্রবাসী নারীরা প্রতিমাসে দেশে রেমিট্যান্স পাঠায় কিন্তু তাদের সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার কেউ নেই।
একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায় আমাদের দেশে গৃহিণী থেকে শুধু করে গার্মেন্টস কর্মী, প্রবাসী কর্মী বা দেশীয় অন্য কর্মক্ষেত্রে নারীরা সবসময়ই সন্তান নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
তাই, ডে-কেয়ার সেন্টার এখন আমাদের সামাজিক উন্নয়নের একটি সিড়ি হয়ে দাড়িয়েছে এবং এই সিড়ি সমাজকে উন্নয়নের পথে আরো বেশি এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কর্মজীবী নারী কেবল পারিবারিক সাপোর্টার নয় বরং সন্তানের জন্য মডেল কেননা সন্তানেরা সর্বপ্রথম নিজ বাবা-মা কে অনুসরণ করে।
এছাড়াও মায়ের জীবন ছেলে – মেয়েদেরকে খুব প্রভাবিত করে, মায়ের সাথে হওয়া আচরণগুলোর ওপর ভিত্তি করে সন্তানেরা দাদা বাড়ি আর নানা বাড়ির সম্পর্কগুলো নিজ হৃদয়ে ধারণ করে, তাই সন্তানকে সুস্থ মানসিকতার মানুষ করে গড়ে তুলতে মায়ের সুস্থ জীবন অপরিহার্য এবং এজন্য আমাদেরকে নারীবান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করতে হবে।
ডে- কেয়ার হতে পারে আমাদের নারীবান্ধব সমাজ গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
লেখক:
জান্নাতুননেছা তমা
আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

