মেঘ কেটে রোদ্দুর
— সুরমা খন্দকার
সিঁড়ি দিয়ে খটাখট শব্দ তুলে নামছে রিদিকা।
প্রতিটি পায়ের স্টেপ যেন এই বিশাল অট্টালিকার মার্বেল মেঝেতে একটা ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে-সে আসছে। পরনে দামী সিল্কের কুর্তি, কানে হিরের ছোট টপ, আর বাতাসে ভাসছে চড়া কোনো ফ্রেঞ্চ পারফিউমের গন্ধ। এই শহরের নামকরা শিল্পপতির একমাত্র মেয়ে সে। প্রাচুর্য যার চারপাশের বাতাসকে ভারী করে রাখে, যার জীবনের ডিকশনারিতে ‘না’ বলে কোনো শব্দ কোনোদিন যোগ হয়নি। রিদিকার প্রতিটি চলনে, চিবুকের ভঙ্গিতে এক ধরনের অহংকার নাকি তীব্র আত্মবিশ্বাস মিশে থাকে, তা দূর থেকে চট করে বোঝা যায় না।
ড্রয়িংরুমের কোণায় রাখা বিশাল সোফাটার ঠিক পাশে, দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল রবি।
তার পরনে ইস্ত্রিহীন সুতি শার্ট, পায়ে সস্তা স্যান্ডেল। গ্রাম থেকে এই প্রথম রবির চোখ ঘরের সিলিং ফ্যান, ঝাড়বাতি আর রাজকীয় আসবাবপত্রগুলোর দিকে চলে যাচ্ছিল। এত আলো, এত জাঁকজমক সে অভ্যস্ত নয়,জীবনে কখনো দেখেওনি। এই বিশাল প্রাসাদের রাজকীয় গাম্ভীর্যের সামনে নিজেকে ভীষণ ছোট, ভীষণ বেমানান লাগছিল তার।
ঠিক তখনই সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে থামল রিদিকা। খটাখট শব্দটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতেই রবি চমকে তাকাল।
রিদিকার চোখজোড়া এসে পড়ল রবির ওপর। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবার রবিকে দেখে নিল সে। তার সেই চাউনিতে কোনো ঘৃণা ছিল না, ছিল এক চরম অবহেলা আর একরাশ কৌতূহল। ঠিক যেভাবে মানুষ চিড়িয়াখানার কোনো অচেনা প্রাণীর দিকে তাকায়।
রিদিকা হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সুরে বলল, “বাবা কি এই অজপাড়াগাঁয়ের ছেলেটার কথাই বলছিল? একে দিয়ে আমার প্রজেক্টের কাজ হবে?”
রবির বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। সে রিদিকার কথার অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারল না, কিন্তু এই শহরের মানুষের হাবভাব আর কথার ভেতরের ধারটা সে টের পাচ্ছিল। সে শুধু দুহাতে তার কাপড়ের ব্যাগটা আরও জোরে চেপে ধরল। শহরের প্রথম বাতাসটাই তাকে বুঝিয়ে দিল-এখানে বাঁচতে হলে শুধু সোজা হয়ে দাঁড়ালেই চলে না, প্রাচুর্যের ভাষাটাও বুঝতে হয়। যে ভাষা রবির একেবারেই জানা নেই।

