৪৭ বার পড়া হয়েছে
শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নারী অবমাননা বন্ধ করতে হবে
ফারজানা ইসলাম
আমাদের শিশুরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। দেশে শিশু ধর্ষণ নির্যাতন ও হত্যার সংখ্যাও বেড়েই চলেছে উদ্বেগজনকহারে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে সারা দেশ। প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ধর্ষকদের বিচারের দাবিতে শনিবার মধ্যরাত থেকেই শুরু হয় শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নারী অধিকার কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। আট বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনা, এটা সমাজের এক ভয়াবহ চিত্র। এ ধরনের ঘটনা সামাজিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত নজির।
বর্তমান সরকারের অবস্থানআইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ৯০ দিনের মধ্যে ধর্ষণ মামলার বিচার সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছেন। গত রোববার আইন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান তিনি। উপদেষ্টা বলেন, মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে ধর্ষণ মামলার তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তদন্ত শেষ করতে হবে। নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি আক্রমণাত্মক ভঙ্গি, কটূক্তি, ইভটিজিং, হেনস্তা, যৌন হয়রানি বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স হটলাইন সেবা চালু করেছে। দেশের যে কোনো স্থানে এরূপ ঘটনা ঘটলে এই হটলাইনে অভিযোগ দেওয়া যাবে । সমাজে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ঠুনকো কারণে শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে। আপনজনের হাতেও শিশুর জীবন চলে যাচ্ছে। কেবল তাই নয়। আমাদের কোমলমতি শিশুরা অবলীলায় নির্যাতন ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। অথচ শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমাজ তথা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ কান্ডারি। শিশুর সুস্থ বিকাশ কীভাবে হবে, কীভাবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের নতুনভাবে ভাবা উচিত। পাশাপাশি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে। এটা সত্য, পতিত স্বৈরাচার সরকারের সময়ে ছাত্রাবাস থেকে শুরু করে রাজপথে কোথাও বাকি ছিল না ধর্ষণের মচ্ছব। শেষ ছয় বছরেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭ হাজার শিশুসহ প্রায় ৪৩ হাজারের বেশি নারী। এই সময়ে নির্যাতন শিকার হয়েছেন ১ লাখ ৩৭ হাজার নারী। অপহরণের শিকার হয়েছেন ২৮ হাজার ৪৮ নারী ও শিশু। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী দ্বারা নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ছাত্রলীগের কর্মীরা নারীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণে বাধা দিতে যৌন নিপীড়ন ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় নারী আন্দোলনকারীদের বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। গত ছয় বছরে নারী ও শিশুদের ওপর সংঘটিত অন্য অপরাধের মধ্যে ১ হাজার ১৫২ জন নারী ও শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এবং অ্যাসিড নিক্ষেপেরে ঘটনা ঘটেছে ১৭৯ জন নারী ও শিশুর ওপর। মনে রাখতে হবে, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হলে মানুষ এসব অপরাধে যুক্ত হয় । নারী ও পুরুষের মধ্যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও অপরাধকে ছোট করে দেখার কারণে অপরাধীরা অপরাধ করার প্রশ্রয় পাচ্ছে। অপর দিকে মামলা হওয়ার পর দীর্ঘ সময় নিয়ে তদন্ত করা, ধর্ষণের মামলার ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রতিবেদন আবশ্যক, সেই প্রতিবেদন দেরিতে দেওয়া, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, বড় অপরাধেও আসামির জামিন হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় সমাজে অপরাধ বাড়ছে। নারীর প্রতি সহিংসতায় উত্তাল দেশ- এটি গরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বিক্ষোভকারীরা দ্রæত ধর্ষণকারীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি চেয়েছেন। তাদের চাওয়া যৌক্তিক ও ন্যায় সঙ্গত। শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নারী অবমাননা বন্ধ করতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।
লেখক: ফারজানা ইসলাম (কবি ও সামাজিক উদ্যোক্তা)