৪৬ বার পড়া হয়েছে
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে জাতীয় কবিতা পরিষদের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন:
প্রখ্যাত লেখক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সমাজচিন্তক ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক-এর মৃত্যুতে জাতীয় কবিতা পরিষদের উদ্যোগে ৬ জুলাই ২০২৬, সোমবার, সকাল ১১টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হয়।
গত ৫ জুলাই ২০২৬ দুপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান এবং সাধারণ সম্পাদক রেজাউদ্দিন স্টালিন তাৎক্ষণিক এক যৌথ শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান। তাঁরা বলেন, দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন এক নির্ভীক, নীতিনিষ্ঠ ও আলোকিত চিন্তাবিদকে হারাল।
জাতীয় কবিতা পরিষদের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দুপুর ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিসহ সর্বস্তরের মানুষ এই মহান জ্ঞানসাধকের প্রতি পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
উপস্থিত জনতার উদ্দেশে কবি মোহন রায়হান বলেন,
“বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অন্যতম সৎ, ত্যাগী, নীতিনিষ্ঠ, আদর্শবান এবং আপসহীন মানুষ ছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তাঁকে ঘিরে কোনো বিতর্ক ছিল না। তিনি কখনো দলীয় সংকীর্ণতা কিংবা ক্ষমতার চাটুকারিতার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। আজীবন তিনি শোষণহীন, বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক—১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশের স্বপ্ন লালন করেছেন এবং সেই স্বপ্ন মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন।” প্রিয় শিক্ষকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, “অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন এক অকুতোভয়, আপসহীন ও বিবেকবান মানুষ। অনেকেই মনে করেন তাঁর কর্মপরিধি কেবল শিক্ষাঙ্গনেই সীমাবদ্ধ ছিল, বাস্তবে তা নয়। তিনি আজীবন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে মানবিক বোধ, মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীল চিন্তার দীপ্তি ছড়িয়ে গেছেন।”
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন,“অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক জ্ঞানের আলো নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং দেশের সামগ্রিক কল্যাণে তা উদারভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন।”
পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর কন্যা ড. শুচিতা শারমিন বলেন, “বাবা সারাজীবন মানুষের কল্যাণের কথাই ভেবেছেন।” কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তিনি তাঁর বাবার আত্মার মাগফিরাত কামনায় সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।
এর আগে সকাল ১০টায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহ বাংলা একাডেমীতে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীদের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে নেওয়া হয়।
সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ডীনসহ বাংলা বিভাগ ও ঢাবির ছাত্র-শিক্ষক ও বিশিষ্ট জনেরা তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে তাঁকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন শিক্ষক, সাহিত্যসমালোচক, গবেষক, প্রাবন্ধিক, সংস্কৃতিচিন্তক, রাষ্ট্রবিশ্লেষক এবং সর্বোপরি একজন বিবেকবান নাগরিক। সত্য, যুক্তি, মানবিকতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আজীবন অবিচল।
জাতীয় কবিতা পরিষদ মনে করে, তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ শুধু একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকেই হারায়নি হারিয়েছে এক অনন্য বিবেক, এক আলোকিত মনীষী এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে নির্ভীক এক কণ্ঠস্বর। তাঁর চিন্তা, মনন ও আদর্শ আগামী প্রজন্মকে দীর্ঘদিন অনুপ্রাণিত করবে।
— রাসেল আহম্মেদ
জাকপ প্রতিনিধি

