২৯৫ বার পড়া হয়েছে
রামমোহন রায়ের জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
রাধাকান্তর পরাজয়
হিন্দু কলেজের চারদিকে ঘন জঙ্গল ছেয়ে রয়েছে। বট, অশ্বত্থ, নিম, জামরুল গাছে পরিবেষ্টিত এই অঞ্চল। অদূরে অতি বিরাট একটি দীঘি। সেই দীঘির চারপাশে দুপুরবেলা মাছ ধরবার জন্য যেন ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিতে, সারিবদ্ধভাবে উপবেশন করে শৃগালের পাল। রাত্রে তারা আবার হুক্কা- হুয়া স্বরে তীব্র চিৎকার করে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে। সুবিশাল জলাশয় বা দহটিতে এত শৃগালের বসতি বলে জায়গাটিকে অনেকে শিয়ালদহ বলে অভিহিত করে আজকাল। এই অঞ্চলে মানুষের বসতি প্রায় নেই বললেই চলে। একটু দূরে চিৎপুর আর জোড়াসাঁকো গেলে দেখা যাবে কল্লোলিনী কলকাতার মানুষের জনজীবন। প্রচুর গাছ কেটে শুধু এখানে গড়ে উঠেছে হিন্দু কলেজ নামের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একটু দূরে অবশ্য সংস্কৃত ভাষায় বুৎপত্তি অর্জনের জন্য আর একটি কলেজ নির্মিত হয়েছে । হিন্দু কলেজের পিছনে গড়ে উঠেছে হিন্দু স্কুল।
হিন্দু কলেজের বাইরে এখন ছায়া ঘেরা স্নিগ্ধ একটি দ্বিপ্রহর গড়িয়ে যাচ্ছে বিকেলের দিকে। কিন্তু কলেজের ভিতরে আজ গনগন করে ঝরে পড়ছে উত্তপ্ত আগুনের খরতপ্ত হলকা। শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রাণপুরুষ রাধাকান্ত দেব আর ব্রাহ্মসমাজের রাজা রামমোহন রায়ের মধ্যে যে তর্কাতর্কি আজ সকালে শুরু হয়েছিল তা যেন কলহে পর্যবসিত হতে চলেছে।
জমিদারপুত্র রাধাকান্ত দেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত স্তরে আক্রমণ শুরু করেছেন রামমোহন রায়-কে।
রাধাকান্তর বক্তব্য স্পষ্ট তিনি নিজেকে একজন নিষ্ঠাবান হিন্দু সন্তান মনে করেন। তাঁরই হাতে প্রতিষ্ঠিত এই হিন্দু কলেজ। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ভিতর হিন্দুধর্ম বিরোধী কোনো কথা তিনি সহ্য করবেননা। হেনরি ভিভিয়ান ডিরোজিও নামে এক খ্রীষ্টান অধ্যাপককে রামমোহন এই কলেজের অধ্যক্ষ করেছিলেন। তখন রাধাকান্ত বাধা দেননি। কিন্তু তাবলে সেই ডিরোজিও যে রীতিমতো কনফারেন্স করে ছাত্রদের মাথায় হিন্দুধর্ম বিরোধী বিষ ঢালতে পারেন তা রাধাকান্ত স্বপ্নেও ভাবেননি। ইতিমধ্যেই ডিরোজিওর মাথায় পাঁক আর বর্জ্য ঢেলেছেন একদল গোঁড়া হিন্দু ছাত্র। রাধাকান্ত এইসব অশান্তিও তাঁর শিক্ষাঙ্গনে বরদাস্ত করতে চাননা। কলেজে ছাত্রদের মধ্যে দুটো দল তৈরি হয়েছে। একদল চূড়ান্ত হিন্দুধর্মের বিরোধিতা করতে গিয়ে সত্যি বোধহয় কলেজে যে তারা লেখাপড়া করতে এসেছে সেকথা বিস্মৃত হয়েছেন। তাঁরা এমন আচরণ করছেন যেন হিন্দুধর্মের গোঁড়ামির বিরোধিতা আর জোরদার আন্দোলন কবরার জন্যই তাঁরা কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। ইয়ং বেঙ্গল নাম নিয়ে একটা দল করেছেন এরা। ডিরোজিওর কাছে বসে তাঁর নির্দেশে এরা কলেজ চত্বরেই শুরু করছেন হিন্দু ধর্মের নিয়ম ভাঙার আলোড়ন। আর একদল ছাত্র আবার প্রবল হিন্দুত্ববাদী তারা ডিরোজিওর ভক্ত এই ইয়ং বেঙ্গলের অতি বিপ্লবী ছাত্রদের দেখলেই পাল্টা মার দিচ্ছে। কলেজে শিক্ষার পরিবেশ ডকে উঠছে। নিজের সন্তান স্নেহে গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এরকম হুজ্জোতি রাধাকান্ত কেনই বা মেনে নেবেন? কিন্তু একা রাধাকান্তর হাতে তো আর এই প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়নি। ইংরাজ শিক্ষাব্রতী ডেভিড হেয়ার থেকে শুরু করে কলকাতায় ব্রিটিশ নির্মিত ন্যায়ালয়ের প্রধানবিচারপতি স্যর এডওয়ার্ড ইস্ট। ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামমোহন রায় সহ একাধিক ব্যক্তির দানে ও পরিশ্রমে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এমনকি জানবাজারের রাণি রাসমনিও অর্থ সাহায্য করেছেন এই হিন্দু কলেজ গড়ে তুলতে। ফলে শোভাবাজারের রাধাকান্তর একার হাতে এই প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ রাশ নেই। কিন্তু রাধাকান্ত আজ যেন প্রতিজ্ঞা করে এসেছেন ডিরোজিও নামের একটি সমস্যাকে তিনি আজই তাঁর কলেজ থেকে উৎখাত করে কলেজে পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনবেন। কলেজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠাতা গণ্যমান্য ব্যক্তিরা কেউ রাধাকান্তর সঙ্গে ঝামেলায় জড়াতে চাইছেননা। ডিরোজিও-কে যদি রাধাকান্ত বহিস্কার করতে চান তো করুন। শুধুমাত্র বিশিষ্ট আর ভদ্র পরিবারের হিন্দুদের পুত্র সন্তানদের এই হিন্দু কলেজে পড়বার অধিকার রয়েছে । ডিরোজিও সেখানে এসে যদি একদল ছাত্রকে খেপিয়ে হিন্দুয়ানির চরম বিরোধিতার দিকে ছাত্রদের নিয়ে যেতে চায় সেক্ষেত্রে কে ডিরোজিওর পাশে দাঁড়াবেন? কেউ-ই ডিরোজিওকে সমর্থন করলেননা প্রকাশ্যে। রাধাকান্ত অতি সহজে ডিরোজিওকে কলেজ থেকে বহিস্কার করতে পারতেন। রাধাকান্ত তা পারলেননা শুধু রামমোহন রায় নামে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করা আর বঙ্গ সমাজে সর্বদা পশ্চিমি কালচারের আমদানি করা একটি মানুষ ডিরোজিওকে সমর্থন করলেন বলে। রাধাকান্তর সঙ্গে তাল তুমুল লেগে গেল রামমোহনের।
রাধাকান্ত জানতে চাইলেন কলেজে যে বিশৃঙ্খল উৎশৃঙ্খলতা চলছে তাতে যদি বড়ো রকমের কোনো অঘটন ঘটে যায়, কোনো ছাত্র যদি গুরুতর আহত হয় তার দায় কি রামমোহন নেবেন?
রামমোহন জানালেন যে কলেজে পড়াশোনা ছাড়া অন্য উপসর্গ বেশি বেড়ে যাক তা তিনিও চাননা। তবে তিনি এটাও মানেন যে ডিরোজিও যে কথাগুলো বলছেন সেগুলোয় যুক্তি রয়েছে।
ফুঁসে উঠলেন রাধাকান্ত: ডিরোজিও চায় হিন্দুধর্ম ধ্বংস হোক, হিন্দু সমাজ রসাতলে যাক। ডোম চন্ডালের, মুচি মেথরের ছেলেপিলেরা এই কলেজে এসে লেখাপড়া করুক বর্ণ হিন্দুদের পাশে বসে। এখানেই শেষ নয় ডিরোজিও লোকটার মাথায় ছিট আছে। নাহলে সে বলে কিনা যে হিন্দু কলেজের দরজা সব জাতের জন্যে খুলে দেওয়া হলেই কাজ শেষ হবেনা। স্ত্রীলোকদেরও এখানে পড়াশোনা করবার অধিকার দিতে হবে। সম্পূর্ণ পারভার্ট ছাড়া এমন কথা কেউ বলতে পারে বলে রাধাকান্ত স্বপ্নেও ভাবতে পারেননা। ভদ্র ঘরের স্ত্রীলোকেরা ব্যাটাছেলেদের পাশে বসে পড়াশোনা করবে? এইকথা কোনো ভদ্রলোক কখনো মুখে উচ্চারণ করতে পারে?
রামমোহন নিজের যুক্তি সাজাচ্ছিলেন। তিনি বললেন ডিরোজিও সাহেব কিন্তু হিন্দু ধর্মের বিরোধিতা করেননি। হিন্দুু ধর্মের নাম দিয়ে যেসব কুসংস্কার চলে আসছে উনি তারই বিরোধিতা করেছেন। হিন্দুধর্ম নারীশিক্ষার বিরোধী কখনোই নয়। হিন্দুধর্ম একটি অতি উচ্চস্তরের দর্শনও বটে। সেই ধর্মের নাম কলঙ্কিত করে কিছু স্বার্থজীবি অনেক কুপ্রথাকে টিকিয়ে রাখছেন নিজেদের কায়েমি স্বার্থে। এতে তো হিন্দুদর্মেরই অপমান হচ্ছে। সতীদাহ, বহুবিবাহের মতো প্রথাগুলো কেন হিন্দু ধর্মের ওপর চেপে বসবে? শ্রী রামচন্দ্রও তো বহুবিবাহ করেননি।
এবারে সার্বিক ধৈর্যচ্যুতি ঘটল রাধাকান্তর। রাখুন মশাই আপনার রামচন্দ্র। সে ছিল সত্য যুগ আর এটা কলিযুগ। পুরুষমানুষের একটা বিয়ে করবার বর্বর প্রথা এই কলিযুগে চলতে পারেনা। আপনি ব্রিটিশের সাহায্যে সতীদাহ বন্ধ করে কী ভেবেছেন যে সমাজটা আপনার হাতের তেলোয় নাচবে? আজ আমি সকলের সামনে একটা কথা বলছি হয় ডিরোজিও এই কলেজে থাকবে নাহলে রাধাকান্ত থাকবে। যদি ডিরোজিওর ছায়া কখনও এই কলেজে দেখা যায় তাহলে রাধাকান্ত সেদিনই শেষবার এই কলেজ ছেড়ে বেরোবে আর এখানে কখনো ঢুকবে না।
কলেজের গণ্যমান্যরা সেদিন কেউ- ই ডিরোজিও- কে রেখে দিয়ে রাধাকান্তকে হারাতে চাননি। ফলে সেদিন জিতেছিলেন রাধাকান্তই। শুধু রামমোহন বলেছিলেন ডিরোজিওকে তাড়ালেও এই কলেজের অন্তরাত্মায় তিনি বেঁচে থাকবেন। আজ থেকে বহু বছর পর যখন আমরা কেউ থাকবনা তখনও এই কলেজে দেখা যাবে ডিরোজিওর ছায়া।
প্রায় দুশো বছর পর আজও জায়গাটিতে সত্যি ডিরোজিওর ছায়া দেখা যায়, বরঞ্চ সেখানে রাধাকান্তকেই এখন আর চোখে পড়ে না।
প্রেসিডেন্সি কলেজের পোর্টিকোতে ছেলেদের পাশে বসে মেয়েরা যখন সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আকাশের দিকে তাকায় তখন মেঘের আড়াল থেকে কৌতুকের হাসি ছুড়ে দেন হেনরি ভিভিয়ান ডিরোজিও আর রামমোহন রায়। তাঁরা ভাবেন রাধাকান্ত ভাগ্যিস আর এই কলেজের ধারেকাছে কোথাও নেই। কারণ রাধাকান্ত যে সহ্য করতে পারতেননা এই তীব্রতর দৃশ্য। যে দৃশ্যের ভিতর রাধাকান্তর অপরিসীম পরাজয় লুকিয়ে রয়েছে। প্রেসিডেন্সি থেকে যে দুশো বছরেও ডিরোজিওকে সরাতে পারেলেননা রাধাকান্ত। কলেজে ডিরোজিওকে রেখে দেবার লড়াইতে চিরকালের জয়টা হোলো রামমোহনেরই।