আলোর অভিযাত্রী–আখতার হুসেন
— আশফাকুজ্জামান
জন্ম অনিশ্চিত। মৃত্যু অনিবার্য। সে জন্যই হয়তো মানুষ জীবনকে এত ভালোবাসে। স্বর্গের অনন্ত সুখ শান্তির কথা শুনেও কেউ মরতে চায় না। সীমাহীন কষ্ট নিয়েও মানুষ বেঁচে থাকতে চায়। আখতার ভাইও হয়তো
বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এক সময় নিয়তির কাছে সবাইকে হার মানতে হয়।
চীনের একটি গল্পে আছে। এক রাজার পুত্র সন্তান হয়েছে। রাজা পৃথিবীর সব শ্রেষ্ঠ মানুষদের ডেকেছেন। তিনি জানতে চান তাঁর সন্তান কি হবে। কেউ বলল, বড় রাজা, কেউ বলল, বড় কবি, লেখক, বিজ্ঞানী বা দার্শনিক হবে। কিন্তু একজন ঋষি বলেছিলেন, সে কী হবে জানি না, তবে আপনার সন্তানের মৃত্যু হবে। অর্থাৎ, জন্ম ও মৃত্যুর এই চিরন্তন সত্যেই জীবন। আখতার ভাইকে সেই সত্যই মেনে নিতে হয়েছে।
ইংরেজ কবি জন ডানের কবিতায় আছে— ‘যেকোনো মানুষের মৃত্যু আমাকে ছোট করে। কেননা, আমি মানবতার অংশ। আর তাই জানতে চেও না কার জন্য বাজছে ওই ঘণ্টাধ্বনি। সে বাজছে তোমার জন্য।’ ‘যেকোনো মৃত্যুর মধ্যে আমি আমার মৃত্যুর প্রতিধ্বনি শুনতে পাই।’
কবি ও কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, চারদিকে জীবনের এত আয়োজন, ব্যস্ততার এত উপকরণ, জীবনের স্বাভাবিকতা এতটাই নির্মম যে আমরা প্রিয়জনকে বিস্মৃত হই, বন্ধুদের বিস্মৃত হই—আজ অথবা কাল। তবে আমরা বুদ্ধদেন বসুকে বলতে পারি আজ অথবা কাল কোনো দিন আখতার ভাইকে ভুলব না। আখতার হুসেন আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁর অমলিন হাসি, স্নিগ্ধ সুবাস ছড়ানো স্মৃতি আর বাংলা শিশুসাহিত্যের অমূল্য সৃষ্টিগুলো যুগ যুগ ধরে অনুপ্রাণিত করে যাবে নতুন প্রজন্মকে। ওপারে ভালো থাকবেন, প্রিয় আখতার ভাই।
অখতার ভাই আমার সহকর্মী ছিলেন। বহু বছরের সহকর্মী। খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখেছি। আমার জন্য এটা ছিল এক অনন্য সুযোগ। হাসি, আনন্দ, গল্পে, কৌতুকে সারাক্ষণ আনন্দে রাখতেন। তাঁর কাছে ছোট-বড় বলে কিছু ছিল না। সবাই তাঁর আপন, প্রিয়জন। সব বয়সী সহকর্মীর তিনি ছিলেন একান্ত বন্ধু। আখতার ভাইকে ঘিরে হতো আনন্দের আড্ডা। সবাই এসে ভিড় করত।
চাকরী জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি প্রথমা প্রকাশনে কাজ করেছেন। অমার একই ফ্লোরে বসেছি। কারও মন খারাপ থাকার উপায় ছিল। কোনো না কোনোভাবে মন ভালো করে দিতেন।
১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুরে তাঁর জন্ম। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন কাটিয়েছেন। খুব আন্তরিক, সুহৃদ, নির্লোভ মানুষ ছিলেন আখতার ভাই। তিনি ছিলেন তাঁর ছড়ার মতোই সহজ। তিনি শিশুদের জন্য লিখতেন, আবার তাঁর মনটাও ছিল শিশুদের মতো।
মাটির মানুষের মতো থাকতেন। এত বড় একজন সাহিত্যিক অথচ কোনোদিন, কখনো অহংকার করতে দেখিনি। নির্লোভ, নিরহংকার ও নির্বিবাদী একজন মানুষ।
কোনো খ্যাতি তাঁকে কখনো আকর্ষণ করেনি। নিজের মনে কাজ করতেন। তাঁর বিনয় ছিল বিস্ময়কর। পেশাগত জীবনে সাংবাদিক ছিলেন। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠ, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা পেয়েছেন।
দীর্ঘ বছর প্রথমা প্রকাশনের পাণ্ডুলিপি সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের দলীয় সংগীত রচনা করেন। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তাঁর ছড়া শিশুদের পাঠ্যক্রমে ছিল। বহু প্রজন্মের শিশু তাঁর ছড়া পড়েছে।
ভাবতেই কষ্ট হয় এই মানুষটি আমাদের মধ্যে আর নেই। চিরতরে চলে গেলেন ইহকাল থেকে অনন্তের পথে। আখতার ভাই আপনি যেখানে থাকুন আপনার আত্মা যেন শন্তিতে থাকে। এই প্রার্থনা করি।
লেখক: কবি, প্রবন্ধিক, সাংবাদিক ও সংগঠক

