৪৫ বার পড়া হয়েছে
হাসনাত আবদুল হাইয়ের বাড়িতে ভ্রামণিকদের সান্ধ্য আড্ডা
হাসনাত আবদুল হাই পৃথিবীর সুন্দরতম নগরী প্যারিস গিয়েছেন ৬ বার― ১৯৬২, ১৯৭২, ১৯৮৪, ১৯৯২, ১৯৯৭ ও সর্বশেষ ২০০২ সালে― বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত। এ নিয়ে লিখেছেন ছয়টি ভ্রমণোপন্যাস। এবছর বইমেলায় ছয়টি আলাদা ঈদসংখ্যায় ছাপা হয়েছিল সবকটিই। সেগুলো এক মলাটে আবদ্ধ করে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘প্যারিসে কয়েকবার’ বইটি। গতকাল সন্ধ্যায় তাঁর ধানমন্ডি বাসায় এক ঘরোয়া সান্ধ্যআড্ডায় তিনি আমাদের হাতে বইটি তুলে দিলেন। আমন্ত্রিতরা সকলেই ছিলেন ভ্রামণিক ও ভ্রমণলেখক এবং সকলেই তাঁর নির্বাচিত। এঁরা হলেন মাহমুদ হাফিজ, মহুয়া রউফ, ক্ষমা মাহমুদ, এলিজা বিনতে এলাহী ও আমি।
আগমন সময় ছিল বিকেল পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটা। আমি পৌঁছে যাই পাঁচটার অব্যবহিত পরে আর পৌঁছে দেখি আমিই প্রথম। হয়ত একটু সতর্কই ছিলাম, কেননা এ মাসের ১৭ তারিখে তাঁর জন্মদিনেও আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, টেলিফোন বিভ্রাটে আমি তা টের পাইনি। সে দুর্ভাগ্যকে অপসারণ করতে সকলের আগে হাজির হই আর সৌভাগ্য হিসেবে দেখা দেয় তাঁর সাথে প্রাথমিক আলাপন। দেয়াল জুড়ে চিত্রকলা সন্নিবেশিত তাঁর বড়োসড়ো বসবার ঘরটির চারিদিকে শুধু বই আর বই। কেবল দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় অর্থাৎ অগ্নি কোণে কিছু সোফা পাতা। নিচু টেবিলে চায়ের সরঞ্জাম, অনেকগুলো চা-পাত্র, দুপ্রকার ফালি করে কাটা কেক রাখা আর সেই বই― সমুদ্রনীল রঙে দুপাশ মোড়ানো ‘প্যারিসে কয়েকবার’ বইটির পাঁচটি কপি।
তাঁর প্রিয় পোষাকরঙ সাদায় আচ্ছাদিত হয়ে তিনি এলেন। ‘প্যারিসে কয়েকবার’ বইটির প্রচ্ছদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসু হতেই তিনি বললেন, প্যারিসের সীন নদীতে একবার নৌভ্রমণে গেলে সেখানে যে খাবারের মেন্যুটি পেয়েছিলেন, সেই মেন্যু থেকে প্রচ্ছদটির আইডিয়া পেয়েছেন― প্যারিসের প্রতীক আইফেল টাওয়ার, সীন নদীর উপর একটি ব্রিজ, ধূষর রেখায় কিছু উঁচুমাথা ইমারতের ছায়া আর টাওয়ার ঘিরে উৎসবের আতশবাজির ফুলকি। ভ্রমণের বইতে যেমনটা দেখা যায় ফটোগ্রাফের ব্যবহার,এ প্রচ্ছদ সেরকম কিছু নয়। কয়েকটি পুরু ও অনেকগুলো সরু আঁচড়ে আঁকা, the minimal স্কেচটি যেন অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট, ফটোগ্রাফের রিয়ালিস্টিক ছবি নয়। আর ওতেই শিল্পের সৌন্দর্য সন্নিবেশিত।
তিনি বসবার ঘরে এসে বসার আগে আমি একঝলক চোখ বুলিয়ে নিয়েছিলাম বইটির ‘ভূমিকা’ অংশে। তাতে জেনেছি তিনি দুভাবে ভ্রমণকথা লেখেন, বেশিরভাগ লিখেছেন ভ্রমণ শেষ হবার কিছুদিন পরে, টাটকা স্মৃতির সাহায্যে; বাকিটা ভ্রমণ সম্পন্ন হবার অনেক অনেক বছর পরে। দুটো ক্ষেত্রেই তিনি নোট নেন। টাটকা স্মৃতির বিকল্প হয়ে ওঠে পুরনোদিনের নোট। প্যারিস ভ্রমণেও তিনি নোট নিয়েছিলেন, আর কী আশ্চর্য বহুবার বাসাবদল কলেও নোটগুলো হারিয়ে যায়নি। ডুব দিয়ে থাকা তিমির পিঠের মতো তারা মাঝে মাঝে ভেসে উঠেছে দৃষ্টির সমুদ্রজলপৃষ্ঠায় আর স্মরণ করিয়ে দিয়েছে সেগুলো লিখে ফেলার প্রতিশ্রুতি। প্যারিস ভ্রমণের নোটগুলোও সেভাবেই তাকে সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, ‘নোটগুলো আমাকে ছাড়ে না। তারা উদিত হয় আর নীরবে বলে, `You had a commitment to write.’
আমায় তিনি জানালেন বহুবছর আগে তিনি জাপানের মন্দিরনগরী কিয়োটোতে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে যোগ দিতে ছয়মাস ছিলেন। আমি ছিলাম মাত্র ছয়ঘণ্টা। ওই ছয় ঘণ্টাতেই কিয়োটো নগরীর মন্দিরগুলো আমার চোখে ও হৃদয়ে চিরকালের জন্য লেপ্টে থাকবে। তিনি আমাকে জানালেন কিয়োটো খুব প্রাচীন নগরী, প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী। সেখানে রাস্তাগুলো এত সরু যে রিকশাও ঢুকতে পারবে না, কেবল পায়ে হেঁটে চলাচল করা যায়। সেখানে পাহাড় থেকে নেমে এসেছে কোমো নদী, তাতে অনেকগুলো বাধ দেওয়া হয়েছে। সময় স্বল্পতার জন্য আমি কোমো নদী বা সে নদীর বুকে বাধ― কোনোটিই দেখতে পারিনি। হাসনাত আবদুল হাই আরও একটি চমৎকার তথ্য দিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে আমেরিকা যে দুটো আনবিক বোমা ফেলে জাপানে― তার একটি হিরোশিমায় এবং অন্যটি কিয়োটোতে ফেলার পরিকল্পনা ছিল। আমেরিকার এক জেনারেল জানতেন কিয়োটোর ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যর কথা। তিনি প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন দ্বিতীয় বোমাটি কিয়োটো নয়, অন্য কোথাও ফেলতে। আমেরিকা বেছে নেয় হিরোশিমার আরও দক্ষিণের নাগাসাকি শহর। ষাটের দশক থেকে ভ্রমণকাহিনি লেখা শুরু করা হাসনাত আবদুল হাই শেষ ভ্রমণকাহিনিটি লিখতে চান জাপানের এই কিয়োটো নগরী নিয়ে।
আমি তাঁর জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম আমার উজবেকিস্তান ভ্রমণকাহিনি ‘আমির তিমুরের দেশে’। তিনি জিজ্ঞেস করলেন সে সময়ে উজবেকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাসখন্দে মসয়ূদ মান্নান ছিলেন কিনা? আমি মাথা নাড়ি এবং বলি মসয়ূদের আমন্ত্রণেই আমার যাওয়া, সে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন। তিনি যেবার উজবেকিস্তান ভ্রমণে গিয়েছিলেন তখন রাষ্ট্রদূত ছিলেন খাজা পরিবারের কোনো এক সদস্য। তিনি নামটি স্মরণ করতে পারলেন না। দূতাবাস থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা পাননি। ওদেশে ভ্রমণের সবচেয়ে বড়ো অসুবিধা হলো ভাষা। দোভাষী ছাড়া ভ্রমণ করা কঠিন, কারণ উজবেকরা ইংরেজি জানে না। তাকে সাহায্য করেছিলেন জাতিসংঘের অভিবাসন নিয়ে কাজ করা এক বাঙালি অফিসার, যিনি অল্পস্বল্প উজবেক ভাষা জানতেন। তারা ঘুরেছিলেন ঐতিহ্যবাহী নগরী সমরখন্দ, বুখারায়।
এর মাঝে মাহমুদ হাফিজ চলে এলেন। তার হাতে কালো কাপড়ের ব্যাগে কয়েক কপি ‘ভ্রমণগদ্য। তার সামান্য পরেই ঘরে প্রবেশ করলেন প্রথমে মহুয়া রউফ, পরে ক্ষমা মাহমুদ। ক্ষমা মাহমুদের সমুদ্রনীল শাড়ি যেন প্রচ্ছদের বাইরে উড়ে আসা এক নীলাভ পাল। আমরা তখন কথা বলছিলাম প্রচ্ছদ ও বইয়ের ভেতরকার ছবি নিয়ে। হাসনাত আবদুল হাই স্বীকার করলেন ক্ষমা মাহমুদের বইতে যেমন লেখা ও ছবির একটি ঐক্য আছে, টেক্সটের নিকটেই রয়েছে প্রাসঙ্গিক ছবিটি, তেমন সাযুজ্য রাখা যায়নি ‘প্যারিসে কয়েকবার’ বইটিতে।
(চলবে)

