একটি স্বপ্নের মৃত্যু
মোঃ আব্দুর রাজ্জাক রঞ্জু
নির্বাক রিপন দাঁড়িয়ে আছে নির্জীব পাথরের মতো।ঠিক সেখানটাতে, যেখানে কিছু মেঠো পথ পাড়ি দিয়ে সোনারায় গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সরু পিচঢালা পথটি মিলেছে ঢাকা-বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের প্রশস্ত বুকে।
মে মাসের তপ্ত দুপুরের সূর্যটা মাথার ওপর আগুন ঢালছে, কিন্তু রিপনের বুকের ভেতরের আগুনটার কাছে সেই উত্তাপ কিছুই না। তার দুচোখ বেয়ে নামা অশ্রুধারা গণ্ডদেশ বেয়ে রাস্তার কালো পিচে পড়ে মুহূর্তেই শুকিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বুকের ভেতর যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তা শুকানোর কোনো উপায় এই মুহূর্তে রিপনের জানা নেই।
রিপন দিনমজুর। আজীবন পরের জমিতে কোদাল চালিয়ে, কপাল বেয়ে পড়া ঘাম মাটিতে মিশিয়ে কোনো রকমে তার চার সদস্যের সংসারটা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। তবে গত একটা বছর ধরে তার চোখে একটা রঙিন স্বপ্ন ডানা মেলতে শুরু করেছিল। সেই স্বপ্নের নাম— “রাজা” আর “বাদশা”। গ্রামের মাতব্বর হাসেম আলীর বর্গা দেওয়া দুটি এঁড়ে বাছুর।
নিজের সন্তানের মতো পরম যত্নে, কখনো বিলের ধার থেকে কচি ঘাস কেটে, কখনো নিজের ভাতের মাড়টুকু খাইয়ে বাছুর দুটিকে বড় করে তুলেছিল সে। আসন্ন ঈদুল আযহার মহাস্থান হাটে গরু দুটি বিক্রি করে হাসেম মাতব্বরের আসল টাকা বুঝিয়ে দিয়ে নিজের ভাগে যা থাকবে, তা দিয়ে ঘরের চালটা মেরামত করবে আর ছোট মেয়েটার জন্য একটা লাল জামা কিনবে— এই ছিল রিপনের একমাত্র আকাশকুসুম কল্পনা।
আজ ছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ভোর হতেই রাজা-বাদশাকে গোসল করিয়ে গায়ে ও কপালে তেল মাখিয়ে, গলায় মালা পরিয়ে মহাস্থান হাটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল রিপন। বিশ্বরোডের কাছাকাছি আসতেই হাটের চেনা কোলাহল কানে ভেসে আসছিল। রাজার দড়িটা শক্ত করে ধরে আর বাদশাকে আলতো করে তাড়া দিয়ে মহাসড়কটা পার হতে যাচ্ছিল সে।
ঠিক তখনই যেন যমদূত নেমে এলো তাদের উপর।
উত্তরবঙ্গগামী এক বেপরোয়া দূরপাল্লার ট্রাক তীব্র গতিতে হর্ন বাজাতে বাজাতে ধেয়ে এলো। রিপন কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক বিকট শব্দ! চারপাশটা ধুলো আর রক্তের ঝাপটায় অন্ধকার হয়ে গেল। রিপন নিজে ছিটকে পড়ল রাস্তার পাশের খাদে।
কয়েক মুহূর্ত পর সম্বিত ফিরে পেয়ে যখন সে টালমাটাল পায়ে উঠে দাঁড়াল, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক দৃশ্যটি তার জন্য অপেক্ষা করছিল। মহাসড়কের ঠিক মাঝখানে নিথর হয়ে পড়ে আছে তার প্রাণ প্রিয় রাজা আর বাদশা। তাদের নিস্প্রাণ চোখ দুটিতে তখনও যেন লেগে আছে অবোধ বিস্ময়। রক্তে ভেসে যাচ্ছে কালো পিচের রাস্তা।
রিপন পাগলের মতো ছুটে গিয়ে গরু দুটোর ওপর আছড়ে পড়ল।
“ওরে আমার রাজা! ওরে আমার বাদশা! তোরা কথা কস না ক্যান বাপ জানেরা!”
তার বুকফাটা আর্তনাদে মহাসড়কের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ক্ষণিকের মধ্যেই উৎসুক জনতার ভিড় জমে গেল। কেউ সান্ত্বনা দিল, কেউ ঘাতক ট্রাকের ড্রাইভারকে গালি দিল, আবার কেউ কেউ হাইওয়ে পুলিশকে খবর দিতে ব্যস্ত হলো। কিন্তু এই কোলাহলের মাঝে রিপন যেন এক জীবন্ত লাশ হয়ে গেল। সে নিজে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও, তার বেঁচে থাকার সম্বল, তার স্বপ্ন, তার মেরুদণ্ড— সব ওই রক্তের স্রোতে ভেসে গেছে।
ধীরে ধীরে সূর্যটা হেলে পড়ছে পশ্চিম দিকে। সাথে সাথে কমছে আলোর তেজ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। মহাস্থান হাটের কোলাহল দূর থেকে ভেসে আসছে, কিন্তু সূর্য ডোবার সাথে সাথে যেন রিপনের পৃথিবী স্তব্ধতায় নিমজ্জিত হচ্ছে । সে এখন বাড়ি ফিরবে কোন মুখে?
তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে হাসেম মাতব্বরের কঠোর মুখচ্ছবি। বর্গাদারকে সে কী জবাব দেবে? লাখ টাকার ওপর দেনা, এই টাকা সে কীভাবে শোধ করবে? দিনমজুরি করে যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে এই ঋণের বোঝা সে কীভাবে বইবে? মাতব্বর কি তার এই চরম সত্যিটা বিশ্বাস করবে, নাকি চুরির অপবাদ দেবে? আর যদিও বা বিশ্বাস করে, তবু এই ক্ষতি সে মেনে নেবে কি? এমন নানা চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
”এখন আমি কী করমু? কোন দরিয়ায় ডুব দিমু?”— বিড়বিড় করে বলতে বলতে রিপন তার শূন্য, খসখসে হাত দুটোর দিকে তাকাল। যে হাত দুটোতে সকালে স্বপ্নের দড়ি ছিল, এখন সেখানে কেবলই শূন্যতা।
সোনারায় গ্রামের এক কোণে একটা ভাঙা ঘরে এখন এক জোড়া চোখ পথ চেয়ে বসে আছে— লাল জামার আশায়। আর এখানে, মহাসড়কের পাশে ধুলোবালি মাখা অবস্থায় বসে আছে এক নিঃস্ব মানুষ, যার আগামী দিনগুলো কুচকুচে কালো অন্ধকারের চেয়েও ভয়ানক। কালো মেঘ জমেছে আকাশে। এখনি বুঝি উঠবে কালান্তক ঝড়। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামার উপক্রম হলো, যেন প্রকৃতির চোখও রিপনের এই বোবা কান্নায় সামিল হতে চাইছে। কিন্তু রিপনের দুচোখের অশ্রুধারা যেন কোনো বাঁধ মানছে না, তা কেবলই বয়ে চলেছে এক অনিশ্চিত, অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে…।
[শব্দার্থ : কালান্তক ঝড়= সব ধ্বংসকারী বা বিনাশকারী ঝড়।]
লেখক: সহ অধ্যাপক, সরকারি মহাস্থান মাহীসওয়ার কলেজ বগুড়া ও সভাপতি পুণ্ড্র সাহিত্য সংসদ বগুড়া, বাংলাদেশ। ]

