কবি সাঈদা আজিজ চৌধুরীর কবিতাগুচ্ছ
১) পদচিহ্ন
সময়ের সাথে দারুণ দ্বন্দ্ব আমার চিরকাল
সময়কে পেছনে টেনে ছবি আঁকে সমকাল
ক্যানভাসে নির্বাক শীতল কোনো পোর্ট্রেট
এভাবেই চলে সকাল সন্ধ্যে নিশির চিত্রপট
ঝড়ে উপড়ে পড়া বৃক্ষ শত শত
ক্ষয় হলো কতো ইমারত নিস্পন্দ প্রাণহীন বন্দর কতো
দাঁড়িয়ে আছি একা তাণ্ডবের অরণ্যে জনপদ ভাঁজে
এতো ভাঙচুর তবু কোথাও তো রয়েছো পথের খাঁজে
প্লাটফর্মে হঠাৎ লোডশেডিং ভুতুড়ে পরিবেশ
আদিম গন্ধটুকু পাই তোমার অস্তিত্ব আশপাশ
ভিড়ের ভেতর ছায়াদের বিড় বিড় সংলাপ
মেঘে মেঘে কৃষ্ণপক্ষ ডাকে জোছনার সন্তাপ
পৌষের ঘন কুয়াশা বেপরোয়া শীত হিম হাওয়া
শুকনো পাতাদের ওড়োওড়ি আসা যাওয়া
নৈঃশব্দের অন্ধকার ছুঁয়ে তুমিও কি রহস্য চাদর?
নিয়ত পদচিহ্ন রেখে যাও বারবার প্রতিবার
ক্ষয়ে যাওয়া পায়ের ছাপ এসেছি সেই নদী তীরে
জলবৃক্ষটি রেখেছি যতনে একান্ত নিজের করে
স্বত্ব সংরক্ষিত
৫/১/২০২৬
২) সোনালি ইজেল
নাভিপদ্ম প্রোথিত এইখানে বৃক্ষছায়ায়
বিমূর্ত ভালোবাসায় স্মৃতির শিকড়
অন্ধকারে চড়ে বসি সুরমার পারাবত
বুকের ভেতর শীতল নদী কুলুকুলু বয়ে যায়।
অতল বর্ষার জলভরা ভাবনা নদীর তীর
এলোমেলো শূন্যতায় খোলা জানালা-
টুংটাং শব্দে বিস্তৃত পালকের আকাশ
রাতের সুগন্ধি বোঁটায় শিউলি শিশির।
ভাটিয়ালি ভাওইয়া আবদুল আলীম দরাজ পল্লীগীতি
হলুদিয়া পাখি,সোনারই বরণ পাখিটি—
বাতাসে ঢেউ তুলে ভাটিয়ালি,উদাস দুপুর
‘প্রিয় বন্ধু কাজল ভোমরা’-ধীরেন মাঝির সুর।
মসলিন তন্তু বোনা অর্ফিয়াসের সুরেলা জীবন
কিশোর,হেমন্ত,পঙ্কজ উদাস,মেহেদী হাসান
ট্রানজিস্টারে কান লাগিয়ে স্বাধীনতার গান।
ভাবনা নদীর ছলছলে চোখে চোখ রাখি
লাল নীল বৈঠা জলের তাল,ঝপাৎ ঝপাৎ নৌকা বাইচ
সুরের সাথে সুর মিলিয়ে হাওয়ার পাখি।
জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ অমর রচনা
দেবদাস উপন্যাস—অসীম কষ্ট বেদনা
নূপুর ছন্দে প্রেম প্রকৃতি ঢাকনা আঁটা সোনার কলস
গান আর কবিতায় প্রাত্যহিক জীবনের সিলেবাস।
কখনো বা একপায়ী তালগাছের নীচে রবীন্দ্রনাথ
শুকনো পাতারা নুপুরের তালে ডেকে আনে নজরুল।
আরো খানিকটা পথ বেগুনি ঝুঁটিওয়ালা জারুল বন
বেহুলার কান্না নিথর লখিন্দর,পুঁথির সুরে সোনাভান
গাজী কালু চম্পাবতী কিংবদন্তী পালাগান
হ্যাজাক আলোয় অনুরাগে কাঁপে গুচ্ছ শিমুল।
দূরে দেখা যায় ফেরিওয়ালা বটের ছায়ায়
বাহারি কানের দুল,নেকলেস পশরা
টলোমলো শিশিরে ঘাসফুল হাসে সূর্য-বন্দনায়।
আলী আমজাদের ঘড়ি সুরমা নদীর চোখ
এম সি কলেজ আর্টস বিল্ডিং,টিলার ওপর কমনরুম
আজিজ স্যারের পেছনে অর্থনীতির লাজুক মুখ।
নগরীর কোলাহলে লড়ে যাওয়া মানুষ এখন
ঘুম ভাঙে যন্ত্রের শব্দে বিষণ্ন সলিলকি কালো ধোঁয়া কার্বন।
ভাবনা নদীর অজস্র অশ্রু সুরমা কুশিয়ারার জল
বিস্মৃতির ব্যবচ্ছেদ গোপন ক্যামেরায় সোনালি ইজেল।
স্বত্ব সংরক্ষিত
২৩/৮/২০২৫
৩) বন্ধু যদি এমন হয়
বন্ধু যদি এমন হয়,আমি যেমন চাই
এমন একজন—ভাদ্রের তালপাকা রোদে শীতল ছায়া
অবিনশ্বর সেই ছায়ার মায়ায় হাঁটবো দীর্ঘপথ
অন্ধকারে ছাড়বেনা একা,ছিঁড়ে যাবেনা মায়া।
কথার কারুকাজ মনখানি নরোম থকথকে মাটি
খোলা মাঠ পূর্ণ চাঁদ জোছনা নিখুঁত খাঁটি।
দুঃখ বেদনা আনন্দ বেহালা এক সাথে
নিঃস্বার্থ নিবিড় রেশম বুনন জীবন গাঁথে।
লৌকিক ভাষা ভুলে নিঃশব্দ ভালোবাসা
ভেঙেচুরে যত্নে মুছে দেবে পথে হাঁটা ক্লেদ
বন্ধু যদি হয় এমন একজন-
ঝরিয়ে দেবে বিষাদ ঢালা দহন,ক্লান্তির মেদ।
হাতের মুঠোয় গুঁজে দেবে আলোক-বোধির ফুল
এমন নির্মল নির্জন নদী যার কাছে ঢেলে দেবো
চৈত্রের দুপুর বিষণ্ন নিগূঢ়
হাওয়ায় ভাসা দীর্ঘশ্বাস,আমার যত ভুল।
স্বত্ব সংরক্ষিত
২২/৮/২০২৫

