সাংস্কৃতিক আধিপত্য
— ড. শেখ আকরাম আলী
সাংস্কৃতিক আধিপত্য হলো এক মারাত্মক ভাইরাসের মতো, যা ধীরে ধীরে এবং ক্রমান্বয়ে একটি সমাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে। বাঙালি মুসলিম সমাজ দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের হুমকির মুখোমুখি হয়ে আসছে। অতীতের কিছু মহান বাঙালি মুসলিম সাংস্কৃতিক কর্মী কেবল এর বিরুদ্ধে লড়াই-ই করেননি, বরং তাঁদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একে বড় পরিসরে প্রতিরোধ করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। অবিভক্ত বাংলার বাঙালি মুসলিমদের জন্য একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক জীবন গঠনে তাঁরা সফল হয়েছিলেন।
তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন ও গোলাম মোস্তফা; সাংবাদিক মাওলানা আকরাম খাঁ, আবুল মনসুর আহমদ ও আবুল কালাম শামসুদ্দীন; এবং সঙ্গীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আবদুল আলিম, ফিরোজা বেগম ও আবদুল লতিফ। এছাড়া জয়নুল আবেদিন, হাশেম খান এবং সুলতান আহমদের মতো শিল্পীরাও শিল্পকলা ও চিত্রকলা ক্ষেত্রে বিশাল অবদান রেখেছিলেন।
তাঁদের সূচনা করা ধারাটি পাকিস্তানের শুরুর দিনগুলোতে সক্রিয় থাকলেও, পরবর্তীতে বাঙালি সংস্কৃতির উত্থানের কারণে তীব্র চাপের মুখে পড়ে এবং চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জোয়ার দেখা গিয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত মুসলিম বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশকে ম্লান করে দেয়। এর পরিবর্তে তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের দ্রুত উত্থান ঘটে এবং প্রতিবেশীর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের জন্ম হয়। দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনুভূতির বিপরীতে গিয়ে পুরো সমাজ দ্রুত বিকাশমান বাঙালি সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত হয়।
এই বাঙালি সংস্কৃতি মূলত হিন্দু সংস্কৃতি হিসেবেই পরিচিত, ব্রিটিশ আমলে যার প্রধান প্রবক্তা ছিলেন সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র এবং কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁরা তাঁদের মুসলিমবিদ্বেষী লেখার জন্য বিখ্যাত ছিলেন—বিশেষ করে শরৎচন্দ্র, তবে তৎকালীন সময়ে তাঁরা মুসলিম সমাজকে তেমন একটা প্রভাবিত করতে পারেননি। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারতের সরাসরি উৎসাহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশে বাঙালি সংস্কৃতির জন্য একটি পূজনীয় ব্যক্তিত্ব (cult) হিসেবে আবির্ভূত হন। যদিও ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য এক স্বপ্নের মতো এসেছিল, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন এবং বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তাঁর লেখা গানটিই বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হয়, যা মানুষকে অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও গ্রহণ করতে হয়েছিল। একেই বলে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস; এবং রবি ঠাকুরই বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হন।
স্বাধীনতার পর শুরুর দিনগুলোতে ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্য কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি, তবে ইসলামী ভাবধারায় পুষ্ট ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর উত্থান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দৃশ্যপট বদলে দেয় এবং মানুষ এই আধিপত্যবাদী পরিবেশ থেকে স্বস্তি পায়। কবি সৈয়দ আলী আহসান, ফররুখ আহমদ এবং আল মাহমুদ প্রকৃত অগ্রদূত হিসেবে কাজ করেছিলেন; অন্যদিকে সাংবাদিক খন্দকার আবদুল হামিদ, আখতারুল আলম এবং সানাউল্লাহ নূরী ছিলেন বাংলাদেশের নিষ্ঠাবান সাংস্কৃতিক যোদ্ধা। কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আগমন সমাজে বাঙালি সংস্কৃতির দ্রুত বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয়।
এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দেয় এবং কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই এটি বাংলাদেশের সমগ্র সমাজকে গ্রাস করে নেয়। দেশের সাধারণ মানুষ ও এই মাটির সংস্কৃতি টিকে থাকার ক্ষেত্রে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির আগ্রাসী আধিপত্যের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে সম্প্রতি ঘটা পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত ইসলাম এবং ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান ভারতের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল।
দেশের মানুষ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের আশা করেছিল, কিন্তু জাতিকে এই সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত করার জন্য এ পর্যন্ত কিছুই করা হয়নি; বরং এটি আগের মতোই বাধাগ্রস্ত না হয়ে স্বাভাবিকভাবে চলে আসছে। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম, যা অগ্রদূত হিসেবে কাজ করার কথা, তারা এখনও শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ের মতোই তাদের ভূমিকা পালন করে চলেছে।
উদীয়মান সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সহ উদীচী এবং ছায়ানটের মতো সমস্ত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কোনো পরিবর্তন ছাড়াই তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে কাজ করে চলেছে। একই ঘটনা ঘটেছে “ইতিহাস একাডেমি ঢাকা”-র ক্ষেত্রেও, যা বাংলাদেশের একটি স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও তাদের আগের দৃষ্টিভঙ্গি এখনও বদলে ফেলতে পারেনি। অনেকেই এখনও এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিবেশীর যোগসূত্র খুঁজে পান এবং বাংলাদেশের মানুষের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য কাজ করার বদলে এদেরকে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট মনে করেন। ২০২৪ সালের সাম্প্রতিক বিপ্লব নিয়ে সেমিনার আয়োজনেও তাদের অনিহা দেখা গেছে। এর সাধারণ সদস্যরা আগ্রহী হলেও একাডেমির ভেতরের একটি গোষ্ঠী জুলাই বিপ্লবের চেতনার বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে।
যেহেতু একটি সমাজের সংস্কৃতিকে জাতির প্রাণশক্তি (লাইফলাইন) হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাই এটিকে ভাইরাসমুক্ত বিশুদ্ধ রক্তপ্রবাহের মতো সচল রাখতে হবে। সংস্কৃতির মূল উৎসসমূহ—যেমন ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, ভাষা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মানুষের জীবনধারাকে বাইরের কোনো বাধা ছাড়াই স্বাভাবিক বিকশিত হতে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে কোনো সমাজের সংস্কৃতিকে বহিরাগত প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখা একটি কঠিন কাজ; তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে যেন অন্য সংস্কৃতির জোয়ারে নিজেদের সংস্কৃতির মূল ভিত্তিমূল ভেসে না যায়।
বিগত বছরগুলোতে আমাদের দীর্ঘদিনের নিজস্ব সংস্কৃতিকে গ্রাস করে নেওয়া আধিপত্যবাদী সাংস্কৃতিক পরিবেশকে দূর করা কঠিন মনে হতে পারে; তবে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন আমাদের সাংস্কৃতিক জীবন জাতির মৌলিক চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এবং ‘ইসলামী মূল্যবোধ’ একটি সুদৃঢ় ভিতের ওপর জাতির সংস্কৃতি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হওয়া উচিত।
বর্তমানে দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর ও তাঁর দল, দৈনিক আমার দেশের ড. মাহমুদুর রহমান ও তাঁর দল চমৎকার কাজ করে যাচ্ছেন; পাশাপাশি কবি আবদুল হাই শিকদার দীর্ঘদিন ধরে এই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া খোমিনী এহসান, ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল করিম, আবদুল জব্বার, ডিউক হুদা, রাশেদ প্রধান, মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল হক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান এবং মেজর দেল এইচ খান যুদ্ধের চেতনা নিয়ে ভারতের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন।
যেহেতু জাতির সংস্কৃতি গঠনে শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই সঠিকভাবে অবদান রাখার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে হবে। খাঁটি সংস্কৃতি লালন করা, জনগণকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং একই সাথে প্রতিবেশীদের ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সম্পর্কে তাদের সতর্ক রাখার ক্ষেত্রে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। তারা মূলত ইসলামী মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং ভবিষ্যতেও তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির নামে হিন্দু সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
তারা বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেস ও মিডিয়া এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাদের হয়ে কাজ করার মতো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ তৈরি করতে সফল হয়েছিল। দেশজুড়ে অজানা সংখ্যক সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো বাঙালি সংস্কৃতির প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
এগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে। সৌদি আরব, পাকিস্তান, ইরান, মিসর ও তুরস্কের মতো কিছু মুসলিম দেশের সাথে সাংস্কৃতিক বন্ধন গড়ে তুলতে হবে। এতে অবহেলা চরম সংকট ডেকে আনতে পারে এবং সমাজে ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।
আমাদের সাংস্কৃতিক বিষয়ে প্রতিবেশীদের আর নাক গলাতে দেওয়া যাবে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সীমিত ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সতর্কতার সাথে পাঠ করতে হবে এবং একই সাথে রবি ঠাকুরকে প্রতিরোধ করতে আমাদের সমাজে নজরুলের চর্চাকে আরও বেগবান করতে হবে। শহীদ ওসমান হাদী কর্তৃক সূচিত ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-কে সবার পৃষ্ঠপোষকতা করা উচিত, যাতে এটি তাঁর জীবদ্দশার স্বপ্ন অনুযায়ী একটি যথাযথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের রূপ নিতে পারে।
জুলাই বিপ্লবের চেতনায় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং এটিকে প্রতিদিনের সংগ্রামের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় হাতিয়ার দিয়ে এই লড়াই সঠিকভাবে চালাতে হবে এবং প্রতিদিন ও প্রতি মুহূর্তে উদ্ভূত হতে যাওয়া ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক যুদ্ধের ময়দানে জয়লাভ করতেই হবে। বাংলাদেশের আকাশ এখনও পুরোপুরি মেঘমুক্ত নয়; তবে খাঁটি বিশ্বাসই পারে এই লড়াই চালিয়ে যেতে এবং ইনশাআল্লাহ বিজয় ছিনিয়ে আনতে সাহায্য করতে।
লেখক: ডিন, আইন অনুষদ, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।
১৭ অক্টোবর ২০২৬

