মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত
শাকেরা বেগম শিমু
বাংলাদেশ একটি সাহিত্য সমৃদ্ধ দেশ। এদেশে জন্ম নিয়েছেন বিভিন্ন বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকগণ। যারা এদেশের নাম বিশ্বের দরবারে উজ্জ্বল করে তুলে ধরেছেন।। তেমনি একজন কবি হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি প্রথমে হিন্দু ছিলেন তখন তার নাম ছিলো শুধু মধুসূদন দত্ত। কিন্তু পরে তিনি খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহন করায় তার নামের আগে যোগ হলো মাইকেল। তাকে বলা হয় বাংলাদেশের মহাকবি। বাংলাদেশের বড় বড় উপাধি সমৃদ্ধ কবি রয়েছেন পাঁচজন। তারা হলেন:
১/বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২/বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম
৩/পল্লীকবি জসিমউদ্দীন
৪/ছন্দের জাদুকর সত্যেদ্রনাথ দত্ত ও
৫/মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
এই পাঁচজন হলে দেশের বিখ্যাত পাঁচ কবি যাদের নামের সাথে আলাদা উপাধি যুক্ত হয়েছে। তন্মধ্যে ‘মহাকবি’ হলো মাইকেলের মধুসূদন দত্তের উপাধি। এখন আমরা তার সংক্ষিপ্ত জীবনী সম্পর্কে জানবো।
জন্ম: মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পরিবার ছিলো অতীব উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত, সম্মানিত, একটি হিন্দু কায়স্থ পরিবার। তার বাবার নাম রাজনারায়ন দত্ত ও মায়ের নাম জাহ্নবী দত্ত। তিনিই ছিলেন পরিবারের প্রথম সন্তান।
কৈশোর ও যৌবন: কবি মধুসূদনের বাবা ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন ধনী ও সম্পদশালী জমিদার। এমনও শুনা যেতো তিনি যখন কৈশোরে স্কুলে যেতেন তখন একজন চাকর তার মাথায় ছাতা ধরে রাখতো ও আরেকজন তার স্কুলের ব্যাগ বহন করতো। খানদানি পরিবার বলতে যা বুঝায় আর কি। তিনি শৈশব থেকেই পড়াশুনায় খুবই ভালো ছিলেন। এভাবেই রাজকীয়ভাবে তার শৈশব ও কৈশোর বেলা কেটে যায়। ভীষণ মেধাবী ছাত্র মধুসূদন এর ইংরেজি ভাষায় ছিলো অগাধ পান্ডিত্য। ছোটবেলাতেই তিনি বাংলা ভাষার চেয়ে ইংরেজি ভাষাতেই বেশী আসক্ত হয়ে পড়েন। যার ফলে তিনি প্রথমে কলকাতার হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে পড়াশুনা শেষ করে তিনি ইংরেজি শিখার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন সুদূর ইংল্যান্ডে।
ধর্মান্তর ও বিয়ে: কবি দেশে থাকাকালীন সময়েই তিনি ইংরেজি ভাষার প্রতি গভীর টান অনুভব করেছিলেন। সেজন্য তিনি স্বপ্ন দেখেন ইংরেজিতে একজন বড় কবি হবার। আর সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই তিনি পাড়ি দেন ইংরেজি প্রধান খ্রিষ্টান দেশ ইংল্যান্ড এ। সেখানে গিয়ে তিনি তার হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহন করেন।
তখন তার নামের আগে যোগ হয় মাইকেল শব্দটি। এরপর তিনি রেবেকা নামের স্কটল্যান্ড প্রবাসী একজন নারীকে বিয়ে করেন। তারপর একসাথে পড়াশুনা ও সংসার দুটিই চালিয়ে যান তিনি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তার এই বিয়েটি বেশিদিন টিকেনি। রেবেকার সাথে একসময় উনার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আর উনি হিন্দুধর্ম ত্যাগ করায় তাকে পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হয়। একদিকে ঘরণী হারানোর শোক ও আরেকদিকে পরিবার থেকে ত্যাজ্য হওয়া উনাকে ভীষণ কষ্টকর পরিস্থিতির সম্মুখীন করে তোলে।
দ্বিতীয় বিয়ে: কবির প্রথম স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ হবার পর তিনি মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়েন। তার অনেকদিন পর তিনি আবারো ফরাসী নারী হেনরিয়েটা সোফিয়া হোয়াইট এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। উনার জীবনের বাকি সময়টা তিনি এই স্ত্রীর সাথেই কাটিয়েছিলেন। এই সংসারে একে একে তিনি চার সন্তানের জনক হন। তবে নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দরুণ তিনি মানসিকভাবে খুবই ব্যথিত ছিলেন। তার জীবনটা ছিলো অনেকটা বেদনাময় ও নাটকীয়। আর এইসবই তার সৃষ্টি সাহিত্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছিলো।
লেখালেখির শুরু : তিনি বিদেশে থেকেই ব্যারিস্টারি পড়ার পাশাপাশি লেখালেখি শুরু করেন। তবে বাংলা ভাষার চেয়ে তার বেশীরভাগ লেখাই ছিলো ইংরেজি ভাষায়। তিনি লিখতেনও অনেক ভালো কিন্তু তিনি জন্মগতভাবে বাঙ্গালী বলে তার এসব লেখা তখন ততোটা জনপ্রিয়তা পায়নি। এরপর তিনি পরিবার নিয়ে ফ্রান্সে চলে যান। সেখানে গিয়ে একগ্রচিত্তে ভীনদেশী ভাষায় লেখালেখি চালিয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি খুব ভালো মানের একটি ইংরেজি বই বের করেন। তিনি আশা করেছিলেন বইটি সমাজে অনেক বেশী সমাদৃত হবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছিলো তার উল্টোটা। তিনি অন্য দেশের অন্য ভাষার নাগরিক বলে তেমন কেউ তার বইটাকে ভালোভাবে গ্রহন করেনি। এ বিষয়ে তিনি নিরাশ হয়ে তখনকার জ্ঞানীদের শরণাপন্ন হলে উনারা এই বলে উপদেশ দেন যে : “আপনি অনেক ভালো একজন লেখক কিন্তু আপনি আমাদের দেশের নাগরিক নন। তাই আমাদের দেশে আপনার প্রতিভার তেমন একটা মূল্যায়ন হচ্ছেনা। আপনি বরং নিজের দেশে ফিরে যান। গিয়ে আপনার দেশের রাষ্ট্রভাষা দিয়ে সাহিত্য রচনা করুন। এতেই আপনি উপযুক্ত মূল্যায়ন পাবেন।”
বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা : কবি মাইকেল ফ্রান্সের জ্ঞানী লোকদের কথায় যেন হুশ ফিরে পান। উনার টনক নড়ে ওঠে। সত্যিই তো! যে দেশে তিনি জন্ম নিয়েছেন সেই দেশ ও দেশের ভাষাকে তিনি অবহেলা করে পাশ্চাত্য দেশ ও তার ভাষা নিয়ে মেতে উঠেছিলেন! আর তাই এটারই তিনি উপযুক্ত শিক্ষাও পেয়েছেন। এরপরই তিনি সেখানে থেকেই লিখেন নিজ এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া “কপোতাক্ষ নদ” নিয়ে একটি সনেট কবিতা। যারা প্রথম লাইনগুলো এরকম:
“সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে,
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।”
সতত যেমনি লোক নিশার স্বপনে,
শুন মায়া মন্ত্রধ্বনি তব কলকলে।
হ্যাঁ! তখন সত্যিই তিনি ঐ একাকি দেশে বিরলে বসে বসে তার শৈশবের এ নদের কথা ভাবতেন। তারপর তিনি ঠিক করেন দেশে ফিরে আসবেন। এসে পুরোপুরি বাংলা সাহিত্য নিয়ে কাজ শুরু করবেন। আর তাই করেছিলেনও তিনি। বাংলাদেশে ফিরে এসে প্রথমেই তিনি লিখেছিলেন :
“হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন
তা সবে অবোধ আমি অবহেলা করি,
পর ধন লোভে মত্ত করিনু ভ্রমণ,
পরদেশে ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।”
এই দুটি কবিতাই তার “চতুর্দশপদী কবিতাবলী” কাব্যগ্রন্থে সংরক্ষিত আছে।
তার সৃষ্টি সাহিত্য: কবি “মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ ধীরে ধীরে বাংলা সাহিত্যে হয়ে উঠেন দেশের সেরা কবিদের একজন। দেরিতে হলেও তিনি বুঝেছিলেন যে, নিজ দেশকে অবহেলা করে কোথাও গিয়ে শান্তি কিংবা সম্মান পাওয়া যাবে না। অন্য ভাষায় যতোই ভালো সাহিত্য রচনা করুন তাতে কোন মূল্যায়ন পাবেন না। তাই তিনিও তখন মনপ্রাণ ঢেলে দেন বাংলা সাহিত্যে। আর দেশের স্কুল কলেজের বইতেও তার লেখাগুলো লিপিবদ্ধ হতে থাকে। তিনি “অমিত্রাক্ষর” ছন্দের প্রতিষ্ঠাতা। সেই ছন্দে রচিত তার অমর কীর্তি হলো “মেঘনাদবধ কাব্য” যা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহাকাব্য। এছাড়াও আরো রয়েছে “তিলোত্তমা-সম্ভাষণ”, “বীরাঙ্গনা”, ব্রজাঙ্গনা কাব্য ও সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতাবলী। বাংলা ভাষায় এই সনেটও প্রথম তিনিই প্রবর্তন করেছিলেন। আর সেজন্যই তাকে বলা হয় প্রথম আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনক।
মৃত্যু : কবি দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও মানসিক কষ্টে থেকে অবশেষে ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুন ৪৯ বছর বয়সে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তিনি তার অমর সাহিত্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে স্থান করে নিলেন “মহাকবি” হিসেবে। তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন এই দেশের সাহিত্যজগতের প্রতিটি সাহিত্যপ্রেমিদের মাঝে।

