229 বার পড়া হয়েছে
বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি শিশু ও খাদ্যপণ্যের মান: দেশের প্রতি ধারণা গড়ে ওঠার এক নীরব প্রক্রিয়া
— আফসানা ইয়াসমিন অর্থী
বিশ্বের নানা দেশে আজ বহু বাংলাদেশি পরিবার বসবাস করছে। তাদের অনেক সন্তান বিদেশেই জন্মেছে বা সেখানেই বেড়ে উঠছে। এই শিশুদের কাছে বাংলাদেশ কখনো শুধু একটি মানচিত্রের নাম, কখনো দাদা-দাদি, নানা-নানির গল্প, কখনো মায়ের রান্নার ঘ্রাণ। দেশের সঙ্গে তাদের সবচেয়ে সহজ ও আবেগী সংযোগ তৈরি হয় খাবারের মাধ্যমে। তাই বিদেশে পাঠানো খাদ্যপণ্যের মান কেবল রপ্তানির বিষয় নয়, একটি শিশু নিজের শেকড় সম্পর্কে কী ধারণা নিয়ে বড় হবে, তারও একটি অংশ।

শিশুর পরিচয়বোধ কীভাবে গড়ে ওঠে
গবেষণা অনুযায়ী জাতিগত পরিচয় গড়ে ওঠার দুটি পরস্পর যুক্ত ধারা আছে: নিজের পরিচয় সম্পর্কে অনুসন্ধান এবং সেই পরিচয়ের প্রতি আত্মীয়তা বা সম্পৃক্ততার অনুভূতি [৪]। আর যেসব কিশোরের জাতিগত পটভূমি সমাজের মূল ধারা থেকে আলাদা, তাদের ক্ষেত্রে এই পরিচয় নিজের সত্তা গড়ার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান [৩]। অর্থাৎ বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি শিশুর কাছে “আমি কোথা থেকে এসেছি” প্রশ্নের উত্তর কেবল তথ্য নয়, আত্মবিশ্বাসেরও উৎস। সেই উত্তরের সঙ্গে যখন লজ্জাজনক কিছু জড়িয়ে যায়, তখন তার মনে সংকোচ ও দ্বিধা তৈরি হতে পারে। সংখ্যালঘু কিশোরদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, বৈষম্যের অনুভূতি বাড়লে নিজ গোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্মবোধের ধরনও বদলে যায় [৩]।
খাবার নিয়ে লজ্জার অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশি শিশুদের নিয়ে সরাসরি গবেষণা কম হলেও অন্য অভিবাসী সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। কানাডার টরন্টোতে ভারতীয় ও চীনা অভিবাসী পরিবারের ৭ থেকে ১৩ বছর বয়সী ১৯ জন শিশু ও ১৭ জন অভিভাবকের সঙ্গে একটি গবেষণা হয়েছে [৫]। এতে দেখা গেছে, সহপাঠীদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ লজ্জা পাওয়ার অভিজ্ঞতা অভিভাবকদের স্কুল লাঞ্চে নিজের সংস্কৃতির খাবার দিতে নিরুৎসাহিত করে। একই প্রকল্পের আরেকটি গবেষণায় ১৭ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, অনেকে সহপাঠীদের ঠাট্টার শিকার হয়েছে, বাড়ির খাবার ফেলে দিয়েছে বা বাবা-মাকে “স্বাভাবিক” খাবার দিতে বলেছে [৬]। তবে কয়েকজন নিজেদের রান্নার ঐতিহ্য নিয়ে গর্বও অনুভব করেছে। অর্থাৎ খাবার শিশুর আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, এবং সেই খাবার নিয়ে সমাজের মনোভাব তার অনুভূতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
এখান থেকে অনুমান করা যায়, বাংলাদেশি পণ্যে পোকামাকড়, ভেজাল বা পণ্য ফেরত নেওয়ার খবর শিশুর কাছে ব্যক্তিগত আঘাত হয়ে উঠতে পারে। সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াগুলো হলো:
•টিফিনে বাংলাদেশি খাবার নিতে সংকোচ
•নিজের পরিচয় বলতে অনীহা
•দেশের প্রতি টান কমে যাওয়া
•”আমার দেশের সবকিছুই নিম্নমানের” ধরনের সাধারণীকরণ
প্রতিটি শিশু একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না, তবে ঘটনা বারবার ঘটলে এবং কথা বলার সুযোগ না থাকলে একটি একক ঘটনা স্থায়ী নেতিবাচক ধারণায় রূপ নিতে পারে।
অভিভাবকদের ভূমিকা
একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, অভিভাবকের নিজের জাতিগত পরিচয়ের অনুভূতি সময়ের সঙ্গে কিশোরের পরিচয়বোধকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে [৭]। তাই হতাশা থেকে “দেশে তো কিছুই ঠিক হয় না” ধরনের মন্তব্য শিশুর মনে গভীর ছাপ ফেলতে পারে। অভিভাবকরা যা করতে পারেন:
১. শিশুর কথা মন দিয়ে শুনুন, স্কুলে কী শুনেছে ও কেমন লেগেছে জিজ্ঞেস করুন।
২. ঘটনাটিকে একটি নির্দিষ্ট পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করুন, পুরো দেশের পরিচয় হিসেবে নয়।
৩. ভাষা, সাহিত্য, উৎসব ও আতিথেয়তার মতো ইতিবাচক দিকগুলো নিয়মিত তুলে ধরুন।
৪. শিশুকে শেখান যে ভুল শোধরানোর চেষ্টাও শক্তির পরিচয়।
৫. আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখলে শিশু কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন।
রপ্তানিকারকদের দায়িত্ব
যাঁরা বিদেশে খাদ্যপণ্য পাঠান, তাঁদের বুঝতে হবে প্রতিটি প্যাকেটের ক্রেতা কেবল একজন ভোক্তা নন। সেই বাড়িতে হয়তো এমন একটি শিশু আছে, যে ওই প্যাকেটের মধ্য দিয়েই নিজের দেশকে চিনছে। তাই উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে মানা জরুরি। ত্রুটি ধরা পড়লে দ্রুত স্বীকার করে পণ্য ফেরত নেওয়া এবং স্বচ্ছভাবে ব্যবস্থা নেওয়াও আস্থা ফেরানোর বড় উপায়।
উপসংহার
বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রদূত। তারা দেশকে নিয়ে গর্ব নিয়ে বড় হলে দেশের সংস্কৃতি ও ভাবমূর্তি বহন করবে, আর লজ্জা বা অনাস্থা নিয়ে বড় হলে সেই দূরত্ব ফেরানো কঠিন হবে। তাই একটি খাদ্যপণ্যের মান নিশ্চিত করা শুধু স্বাস্থ্যের প্রশ্ন নয়, একটি প্রজন্মের মনে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাস ধরে রাখারও প্রশ্ন। এ বিষয়ে আমাদের সবার সচেতন হওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র
১. Paat, Y.-F., & Pellebon, D. (2012). Ethnic Identity Formation of Immigrant Children and Implications for Practice. Child and Youth Services, 33(2), 127–145।
২. Marks, A. K., Godoy, C., & García Coll, C. (2013). An Ecological Approach to Understanding Immigrant Child and Adolescent Developmental Competencies. In E. T. Crosby (Ed.), Societal Contexts of Child Development. Oxford University Press।
৩. Ethnic Identity among Immigrant and Minority Youth. In A. Rutland, D. Nesdale & C. S. Brown (Eds.), The Wiley Handbook of Group Processes in Children and Adolescents (pp. 23–46). Wiley।
৪. Ethnic Identity Development and Acculturation: A Longitudinal Analysis of Mexican-Heritage Youth in the Southwest United States. NIH Public Access, PMC2926983।
৫. Feeding children while Asian: Immigrant families’ experiences with school lunches in Canada. Canadian Food Studies, 12(2). https://doi.org/10.15353/cfs-rcea.v12i2.728
৬. Lunchbox Shaming Project, Phase 1, Toronto Metropolitan University। Food, Culture & Society।
৭. লাতিনো অভিবাসী পরিবারে অভিভাবক ও কিশোরের জাতিগত পরিচয়বোধ বিষয়ক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, Journal of Youth and Adolescence। DOI: 10.1007/s10964-021-01406-2

