একদিন মানুষের বিশ্বাসী হাত আসমান ছুঁয়ে দিবে’
গণমানুষের কবি মতিন বৈরাগী-এর ৮০তম জন্মদিন উদ্যাপন, কবিতাপাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠান–
জাতীয় কবিতা পরিষদের নিয়মিত কবিতাপাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠানের ৫৫তম আয়োজন ১৮ই নভেম্বর, মঙ্গলবার, বিকাল ৫ টায়, ২৬ ইস্কাটন গার্ডেন রোডের ‘কাজল মিলনায়তনে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত চিন্তক, শিক্ষাবিদ ড. সলিমুল্লাহ খান। গত ১৬ নভেম্বর ছিল জাতীয় কবিতা পরিষদের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য গণমানুষের কবি মতিন বৈরাগী-এর ৮০তম জন্মদিন। কবি মতিন বৈরাগীকে নিবেদন করা হয় কবিতা পরিষদের ৫৫তম কবিতাপাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠানটি।
স্বাগত বক্তব্যে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি দ্রোহ, প্রেম ও প্রতিবাদের কবি মোহন রায়হান বলেন, আমরা আজ যাঁর জন্মদিন উদ্যাপন করছি তাঁর নাম মতিন বৈরাগী। মতিন বৈরাগী নামটি উচ্চারণ মাত্র বিনম্র শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে, মতিন বৈরাগী নামটি উচ্চারণ মাত্র সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উত্তাল ভালোবাসায় আমার হৃদয় ভরে ওঠে, মতিন বৈরাগী নামটি উচ্চারণ মাত্র আমার রক্তের ধমনী ও শিরায়-উপশিরায় প্রচন্ড তরঙ্গের মতো উল্লফিত হয়ে ওঠে দ্রোহ, প্রেম, প্রতিবাদে। সমাজ বদলানোর স্বপ্ন দেখা কবি মতিন বৈরাগীকে মূল্যায়ন করার যোগ্যতা আমার নেই। মতিন বৈরাগীকে মূল্যায়ন করেছেন, আমার শিক্ষক, বাঙালি জাতির বাতিঘর আহমদ শরীফ। মতিন বৈরাগীর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘আশা অনন্ত হে’-এর ভূমিকায় লিখেছিলেন,“ কবি মতিন বৈরাগী নিজের গুণের ও গানের জন্য বাংলাদেশের কবিতাঙ্গনে সুখ্যাত, সুপ্রতিষ্ঠিত। কাজেই তিনি তার নতুন কাব্য প্রকাশনা মুহূর্তে কারোর মতের মন্তব্যে কিম্বা তদবীরের তোয়াক্কা লাগে না। তবে আমি যে মলাট মন্তব্য লিখছি সে কেবল কবি ও কবিতা সম্মন্ধে আমার মুগ্ধতার অভিব্যক্তি দানের জন্যই। এ কবি গণমানুষের দাসত্ব, শোষণ, বঞ্চনাযাতক বেদনার কথা বলে। বলে পৃথিবীর হালচাল বদলানোর কথা। বদলায় মুক্তির পন্থা, দিশা দেয় বিপ্লবের ও বিদ্রোহের; সন্ধান করে সহসী-সংগ্রামের; আশা দেখায় মুক্তির, আনন্দের ও সুন্দরের। কবি মতিন বৈরাগী ও তাঁর কাব্য সংবেদনশীল মানবতাবাদী মাতৃপ্রিয় আমি এবং অগন্য অনেকেই তাই বৈরাগী ও তার কাব্যের প্রসংশায় মুখর।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রখ্যাত চিন্তক ও শিক্ষাবিদ ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, মতিন বৈরাগীর সঙ্গে আমার অনেক পরে পরিচয় হয়েছে। তাঁর একটি কবিতা নিয়ে দৈনিক পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। কবিরা যে নাম বদলায় সেটা আমার মনঃপূত হতো না। তবে, নাম কেন বদলায়? কারণ, দীর্ঘ নামটিকে সংক্ষিপ্ত করা বা আরও সুন্দর করে উপস্থাপনের জন্য। লেনিন তার নাম বদলেছে যুদ্ধের প্রয়োজনে। কবিরা ভাষা নির্মাণ করে বলে অহংকার করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভাষাই আমাদেরকে নির্মাণ করে। মতিন ভাইকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করি। তার অনেক গুণাবলী রয়েছে তবে, এসব গুণাবলীর মধ্যে সর্বেসর্বাবাদ বিষয়টি আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। কবি মতিন বৈরাগীর সম্মানার্থে একটি কবিতা অনুবাদ করেছি। আজ তার জন্মদিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সেটাই পাঠ করছি।”
কবি মতিন বৈরাগী তাঁর বক্তব্যে বলেন, জাতীয় কবিতা পরিষদের ৫৫তম অনুষ্ঠানটি আমাকে নিবেদন করেছেন, এজন্য আমি কবিতা পরিষদের সভাপতিসহ নির্বাহী কমিটির সকল সদস্যকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। আপনারা আজ যে সম্মান জানালেন তাতে আমি গর্বিত ও আনন্দিত বোধ করছি। আমাদের কবি মন না থাকলে, কবি চিন্তা না থাকলে, কবি অনুভূতি না থাকলে কবিতা লেখা বা অনুবাদ কোন কিছুই করা যায় না। আমরা তা অস্বীকার করতে চাইলেও তা অস্বীকার করতে পারি না। কারণ, সেটা আমাদের মনের ভিতরে বসবাস করে। কবিতা পরিষদ যে আমাকে এতো ভালোবাসেন তা আজকের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হল। আজকের অনুষ্ঠানটি এতো শৃঙ্খল ও পরিপাটি হয়েছে যা বিগত সময়ে অন্য কোথাও কখনও আমি দেখিনি। আমার একটি কবিতা আছে ‘একদিন মানুষের বিশ্বাসী হাত আসমান ছুঁয়ে দিবে’ আমি বিশ্বাস করি মানুষ একদিন নিজেই নিজেকে মুক্ত করবে।”
কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ শিল্পকলার ডিজি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, আমার কবি নাম নির্ধারণ করে দেন কবি মতিন বৈরাগী। তাঁর কাছে আমার অনেক ঋণ যা কোনদিন শোধ করতে পারব না। তিনি তাঁর গোটা জীবন উৎসর্গ করেছেন, কবিতার জন্য আর এদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রামে।”
কবি মতিন বৈরাগীকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা ও নিবেদিত কবিতাপাঠ করেন– কবি এবিএম সোহেল রশিদ, কবি শ্যামল জাকারিয়া, কবি মঞ্জুরুর রহমান, কবি আমিনুল ইসলাম, কবি মুস্তাফা মজিদ, কবি আসাদ কাজল, কবি নুরুন্নবী সোহেল, কবি ইউসুফ রেজা, কবি ক্যামেলিয়া আহমেদ, কবি মনিরুজ্জামান রোহন, কবি আফিয়া রুবি, কবি নীপা চৌধুরী, কবি বাপ্পি সাহা, কবি তাসকিনা ইয়াসমিন।
সংগীত পরিবেশন করেন, সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক মনির হোসেন, কবি শিমুল পারভীন, পুষ্টিবিদ ও সংগীতশিল্পী মিশু দাস, কবি মতিন বৈরাগীর দৌহিত্রী সংগীতশিল্পী মিথিলা নেফারতিতি, সংগীতশিল্পী ফারহান উদ্দিন। তবলায় ছিলেন কবি উত্তম কুমার চক্রবর্তী।
আলোচনা শেষে কবি রোকন জহুর, কবি শিমুল পারভীন, কবি টিমুনী খান রিনো, কবি সবুজ মনির, কবি কাব্য রাসেল, কবি রাসেল আহমেদ, কবি কৌমুদী নার্গিস, কবি মিলি হক, কবি জামিল জাহাঙ্গীর, কবি মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান, কবি শোভা চৌধুরী, কবি ফরিদ ভূঁইয়া, কবি দেলোয়ারা ইয়াসমিন, কবি আশরাফ ফারুক, কবি এম এ করিম, কবি বাবু হাবিবুল, কবি জয়নুল আবেদীন জয়, কবি আবু সাঈদ শাহীন, কবি নিথর মাহবুব, কবি শরিফ খান দীপ, কবি হিমেল ইসহাক, কবি আবুল খায়ের, কবি রোকসানা খাতুন, কবি ফারহান উদ্দিন, কবি কামরুজ্জামান, কবি তাওহিদ জনি, কবি মুসতাক মুকুল, কবি রবিউল আলম রবি, কবি আতিকুজ্জামান খান, কবি প্রভাবতী চক্রবর্তী, কবি জহুরুল ইসলাম মঞ্জু, কবি ইমরুল কায়েস, কবি ইসরাত হোসেন বাবলু, কবি শিশির বিন্দু বিশ্বাস, কবি উত্তম কুমার চক্রবর্তী, কবি মরিয়ম আক্তার, কবি চৌধুরী মোহাম্মদ মনির উদ্দিনসহ পঞ্চশাধিক কবি স্বরচিত কবিতাপাঠ করেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন কবি মনিরুজ্জামান রোহান, কবি আফিয়া রুবি, উপমা রহমান ও কবি নাহিদ হাসান।
কানায় কানায় পূর্ণ ‘কাজল মিলনায়তন’ যেন কবি প্রতি ফুলেল শুভেচ্ছা আর হৃদয় উৎসাহিত ভালবাসায় উপচে পড়েছিল। জাতীয় কবিতা পরিষদের পক্ষ থেকে কবিকে ফুল দিয়ে বরণ করে কেক কাটা হয় এবং বিশেষ উপহার প্রদান করা হয়। জনে জনে তাকে বিভিন্ন উপহার ও উষ্ণ ভালবাসায় সিক্ত করেন।
___________________________
মনিরুজ্জামান রোহান
প্রচার সম্পাদক
জাতীয় কবিতা পরিষদ

