২২৫ বার পড়া হয়েছে
ডোমিনো
(জাহানারা বুলা)
পর্ব- ৫
(শেষ পর্ব)
আনোয়ার ভেবেছিলো মাস খানেক ঢাকায় থাকবে। গ্রামের বিষয় সম্পত্তিগুলো গোছাবে। এর পরের বার এসে সেখানে একটা স্কুল করবে। বিষয় সম্পত্তি বিক্রি করার গরজ নেই তার। কারণ, লন্ডনের বাড়িটা তার বেশ বড়। নিজের রোজগারও কম নয়। তাই, গ্রামের মানুষের কল্যানের জন্য কিছু একটা করবে সে। কিন্তু, এই যাত্রায় কিছুই আর করা হলো না।
স্মৃতির বিষয়টাও ভেবে এসেছিলো আনোয়ার। স্মৃতি রাজি হলে নিজের জীবনটাও গুছিয়ে নেবে সে। স্মৃতি জানে, আনোয়ারের জীবনের ধারা। স্মৃতি অনেকটাই সহানুভূতিশীল হয়েছিলো। কিন্তু, বারবার বলছিলো- এমন হওয়াটা ঠিক না। তবে আনোয়ারের সাথে ঘর বাঁধা তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব তাও সে বলেনি। মোট কথা স্মৃতিও চেয়েছিলো আনোয়ার তাকে চূড়ান্ত ভাবে বিয়ের প্রস্তাবটা দিক। কিন্তু, স্পষ্ট কিছুই বলেনি স্মৃতি।
বরং, আনোয়ারই একদিন বলেছিলো- তুমি না হলেও অন্য কেউ আমার জীবনে আসবেই। আসবে যে তা নিশ্চিত। আমি আর পারছি না এই ভাবে জীবন কাটাতে। এতো সন্দেহ, এত অমর্যাদা আর সহ্য হয় না। এমন প্রেম শূন্য প্রেতপুরীতে থাকা যাচ্ছে না। জীবনে অনেক স্ট্রাগল গেছে। এখন একটু ভালোবাসা পাওনা হয়ে গেছে আমার।
তুমি জানো না স্মৃতি, মনে হয় যেন লন্ডনেই আমার স্ত্রীর জন্ম, বেড়ে ওঠা, বাবা-মা ওর বিলেতী। পার্টি, হইচই আর ভালো লাগে না। ছেলেটার পড়াশোনা নিয়েও কোনো মাথা ব্যথা নেই। এখানে সবাই রোজগার করে আমাদের ছেলেও করবে এটাই তার একমাত্র চিন্তাধারা। হোয়াইট জব, অড জব এসব নিয়ে মাথাই ঘামায় না। বাসায় কে খেলাম কে না খেলাম কিছুরই তোয়াক্কা নেই। অন্তত ছেলেটার কথাও যদি ভাবতো তবুও খুশি হতাম। ওর তো বাইরেও কাজ করতে হয় না।
আমার ছেলের জন্য আমার জীবনটা আমি বিলিয়ে দিতে পারি। কিন্তু, রোজগারটা তো জরুরী। ভালো স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি মানুষ গড়ার তীর্থ স্থান। মন, মনন সব কিছুর শুদ্ধ গঠনের জন্য একটা শুদ্ধ পাদপীঠ ভীষণ প্রয়োজন।
স্মৃতি খুব নরম মনের মানুষ। তবুও সংসার হলো না ওর। স্মৃতির বাবা ছিলো ইঞ্জিনিয়ার। বহু আগের থেকেই গুলশানের বাসিন্দা ওরা। এই যে এপার্টমেন্টে থাকছে এটা স্মৃতিদের। ওর বাবার জায়গার উপরেই এপার্টমেন্টটি গড়ে উঠেছে। এখানে ওদের তিনটা ফ্ল্যাট। দু’টো ভাড়া দেয়া আর একটাতে ওরা থাকছে। স্মৃতি যখন হাই স্কুলে পড়ে তখন একটা প্রেম হয়েছিলো ওর। যাকে বলে অবুঝ প্রেম, মানে না বুঝেসুঝে আগুনে ঝাপ দেয়া। একেবারে নেচারাল লাভ। কোনো লাভ ক্ষতির হিসেব ছাড়া প্রেম। একেবারে নিখাদ। কিন্তু, খাদ ছাড়া সোনা দিয়ে গয়না গড়া যে যায় না তা তো স্মৃতি জানতো না!

স্মৃতির সেই প্রেমটা অনার্স সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত টিকেছিলো। কারণ, এর পরে সেই প্রেমিক ছেলেটার স্মৃতিকে আর প্রয়োজন হয়নি। প্রেম যে প্রয়োজনের দাবি তাও তো স্মৃতি বুঝতে পারেনি! তবে অনেক পরে, বোধোদয় হওয়ার পর আর সে কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনি। তাই, দ্বিতীয়বার আর প্রেম বা বিয়ে কিছুই করেনি সে। স্মৃতির যুক্তি ছিলো, অর্থনৈতিক মুক্তিই নারী মুক্তি। বাবার রেখে যাওয়া টাকা সম্পদের অভাব তো নেই। তাহলে আবার অবিশ্বাসী পুরুষের অভিভাবকত্বের নিচে মাথা দেওয়া কেন? কিন্তু, আনোয়ারের সাথে পরিচয়ের পর আবার সে প্রেমে জড়ালো। মূলত প্রেম হচ্ছে বেড়ালের মত, বস্তায় পুরে ফেলে দিয়ে আসলেও ঘর চিনে আবার সে ফিরে আসে। তা ছাড়া নারী-পুরুষ যে পরিপূরক এবং পরিপূর্ণতাও জীবনের একটি দূর্ঘটনায় স্মৃতি তা বিশ্লেষণ করতে ভুলেই গিয়েছিলো।
স্মৃতির সাথে আনোয়ারের ওই একবারই দেখা, একবারই ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়া। ঘটনাটা এমন নয় যে দু’জনই খুব রক্ষণশীল। মূলত সুযোগ আর সময় দুটোই ছিলো না। আনোয়ার সারাক্ষণ ব্যস্ত থেকেছে জমি সংক্রান্ত জটিলতায়। রাতে সময় পেয়েছে, তখন বেশ রাত অব্দি গল্প করেছে, ক্ষমা চেয়েছে, স্মৃতির মান ভাঙিয়েছে। এর পর ছেলের অকস্মাৎ ফোন। ছেলে তার বাবাকে খুব মিস করছে শুনেই দ্রুত ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিয়েছিল আনোয়ার। বাবাকে ছেড়ে কখনোই থাকেনি সে। ছেলের কথার সাথে কান্না আনোয়ারকে বিচলিত করেছিলো। আনোর তৎক্ষনাৎই উপলব্ধি করতে পেরেছিলো স্ত্রী’র নির্বুদ্ধিতার জন্য সন্তানদের একটা ব্রোকেন ফ্যামিলি তৈরী করে দেয়া সমীচীন হবে না। তাই, উদবিগ্ন হয়ে হন্তদন্ত করে ফিরে গেছে। পিছু ফিরে স্মৃতির কথা ভাবেনি আনোয়ার আর।
লন্ডন যাওয়ার সাত আটদিন পর আনোয়ার ফোন করেছিলো। আরো আগেই করতে পারতো। কিন্তু, তার মধ্যে অপরাধ বোধ কাজ করছিল। তাছাড়া সে ভেবেছিলো- স্মৃতির রাগ কিছুটা স্তিমিত হোক তারপর ফোন করবো। ফোন করার পর আনোয়ারের এক্সকিউজটা স্মৃতির কাছে খুব একটা যুক্তি যুক্ত মনে হয়নি। তাই সম্পর্কটা আর এগোতে দেয়নি স্মৃতি। কমিটমেন্ট ছাড়া প্রেমে স্মৃতি বিশ্বাসী নয়। তবে তার মধ্যে যে পূনরায় অনুভূতির সঞ্চার হয়েছে, রক্ত কণিকারা ছোটাছুটি করছে সেই কৃতিত্বটা সে আনোয়ারকেই দেয়।
স্মৃতি আর বিয়ে করেনি। তবে, একের পর এক প্রেম করে চলেছে। যে প্রত্যাখ্যানগুলো প্রেমিক পক্ষ থেকে এসেছে দু’বার ঠিক সেই প্রত্যাখ্যান এখন স্মৃতির দিক থেকে হয়। স্মৃতিও এখন শিখে গেছে মাঝ নদীতে নৌকো ডুবিয়ে দিতে।
প্রেমের খেলাটা অত্যন্ত স্মার্টলী খেলে এখন স্মৃতি। ডোমিনো খেলার মত। ভাগ্যও সুপ্রসন্ন এখন। প্রতিটি চালে টাইলসগুলো যেমন সুসজ্জিত, যুক্তিনিষ্ঠ। প্রেমগুলোও তেমন।
মাঝে মধ্যেই আনোয়ার ম্যাসেজ দেয়, হাহুতাশ করে। বিয়ে করতে চায়। কিন্তু, আনোয়ারের জন্য স্মৃতির একটিই উত্তর- তোমার পয়েন্ট কম। আমার কাছে তুমি হেরে গেছো। আবার আসলে আবার হারবে। এসো না।
আনোয়ারের সংসার এখনো তেমন। পার্টিবাজ বউ তার প্রতি সপ্তাহ শেষেই পার্টি করে চলেছে। কখনো কখনো কর্মদিবসেও। তার মত আরো কিছু বেকার গৃহিনী তার তালে তাল মিলিয়ে চলছে। এখন তো ছেলেও কাছে নেই, অন্য শহরে ডর্মে থেকে পড়ছে। কেননা বাড়িতে পড়ার পরিবেশ সে পায় না। মেয়ে’র বিয়ে হয়ে গেছে। সেও চলে গেছে স্বামীর ঘরে।
অফিসে আসতে যেতে স্মৃতিকে ফোন করে আনোয়ার। স্মৃতি কখনো কথা বলে, কখনো ইগনোর করে। আনোয়ার এখন বুঝতে পারে- স্মৃতি ঠিক বলেছে, টাইলস এর গায়ে গায়ে ম্যাচিং পয়েন্টের পর পয়েন্ট না সাজাতে পারলে যেমন করে হেরে যায় কেউ তেমনিই আনোয়ারও হেরে গেছে। পরবর্তী চালের জন্য ম্যাচিং টাইলস হাতে নেই, নেই রিজার্ভ টাইলসও। অথচ, আনোয়ার পারতো স্মৃতিকে অপেক্ষা করার কথা বলতে। একটু গুছিয়ে নিয়ে ছেলে সহ স্মৃতির প্রীতি ছায়ে থাকতে।
(সমাপ্ত)।
১১ জুন, ২০২২
ঢাকা।
১ Comment
congratulations