২৭৫ বার পড়া হয়েছে
সদ্য প্রয়াত প্রখ্যাত ছড়াকার রফিকুল হক দাদুভাইকে নিয়ে রহীম শাহ’র স্মৃতিচারণ:
প্রখ্যাত ছড়াকার রফিকুল হক না ফেরার দেশে চলে গেলেন ১০ই অক্টোবর ২০২১।
সত্তরের দশকে গড়া শিশুকিশোরদের সংগঠন ‘চাঁদের হাটে’র প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। এর আগে তার পরিকল্পনায় এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে দৈনিক পূর্বদেশে ‘চাঁদের হাট’ নামে ছোটোদের একটি পাতা বের হতো। তখন থেকে তিনি ‘দাদুভাই’ নামে পরিচিতি পান। ১৯৭৪ সালে ‘চাঁদের হাট’ নামেই শিশু সংগঠন গড়ে তোলেন।
তিনি জন্ম হয়েছিল ১৯৩৭ সালের ৮ জানুয়ারি। রফিকুল হকের পৈত্রিক বাড়ি রংপুর শহরের কামালকাচনায়। আদিনিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে। তাঁর শৈশব কেটেছে কুচবিহার শহরে, সেখানেই স্কুলজীবনের শুরু, তারপর রংপুরের কৈলাশ রঞ্চন উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা, সেখান থেকে মেট্রিকুলেশন শেষ করে কারমাইকেল কলেজে লেখাপড়া।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রফিকুল হক সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর আগে তিনি বাংলা সংবাদপত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষতান সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাংবাদিক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬১ সালে দৈনিক সংবাদে সহ-সম্পাদক হিসাবে। এরপর দৈনিক জেহাদ, সোনার বাংলা, দৈনিক পয়গাম, পূর্বদেশ, সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা ও দৈনিক জনতা, আজাদ, লালসবুজে কাজ করেছেন। ১৯৬৯ সালে সাপ্তাহিক পূর্বদেশ ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলে সেখানে তিনি ফিচার এডিটরের দায়িত্ব নেন এবং ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে সরকারি পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা’ বের হলে সেখানে তিনি কার্যনির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পান এবং ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। দৈনিক রূপালী পত্রিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। ২০০৪ সালে তিনি দৈনিক যুগান্তরে যোগ দেন। যুগান্তরের ফিচার এডিটর হিসাবে দায়িত্বপালনকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সুদীর্ঘ ৫৯ বছর তিনি সাংবাদিকতার পেশায় সম্পৃক্ত ছিলেন।

আপাদমস্তক পেশাদার সাংবাদিক রফিকুল হক দীর্ঘদিন সংবাদ সম্পাদনা করেছেন। তার হাতের স্পর্শে একটি সংবাদের শিরোনাম এক মুহূর্তে হয়ে উঠত আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ। সবসময় বাক্যকে সহজ-সরল করে লিখতেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনো অংশ নিচ থেকে তুলে নিয়ে উপযুক্ত স্থানে বসাতেন। আবার কখনও পুরো একটি অনুচ্ছেদই বদলে দিতেন।
দাদুভাইয়ের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় অনেক জটিল, দুর্বোধ্য ও অপাঠ্যযোগ্য ফিচারও সুপাঠ্য হয়ে উঠত। ফিচারে তিনি কখনও বিষয়বস্তু সম্পর্কিত কোনো বিখ্যাত কোনো কবিতার দু-একটি লাইন অথবা বিখ্যাত কোনো ব্যক্তির যথার্থ ও মানানসই উক্তি যুক্ত করেন। সম্পাদনা করতে গিয়ে কখনও বিরক্ত হতেন না। বরং সব সময় সস্নেহে লেখককে লেখার ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিয়ে তিনি পুরো লেখাটাই সংশোধন করে দিতেন।
রফিকুল হক ছড়াসাহিত্যে শক্ত ও দৃঢ় অবস্থান নিয়ে আছেন। আমাদের দেশে যাঁরা এ ক্ষেত্রে অগ্রণী, তাঁদের মধ্যে তিনি শুধু অন্যতম নন, নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। শব্দ, ছন্দ ও আঙ্গিকের কারণে তাঁর ছড়া আলাদাভাবে চেনা যায়। সমাজজীবন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ছড়া লিখেছেন, তবে শিশুতোষ ছড়া লেখা থেকে তিনি কখনও দূরে সরে যাননি।
গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময় নিয়ে ‘বর্গী এলো দেশে’ নামের বইটি ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয়, এটি তাঁর প্রকাশিত প্রথম বই। রফিকুল হকের প্রথম বই যেমন দেরিতে বের হয়েছে, তেমনি বইয়ের সংখ্যা লেখার তুলনায় এখন পর্যন্ত কম। তাঁর অন্যান্য উল্লেখ্যযোগ্য ছড়ার বই হলো-পান্তা ভাতে ঘি, ঢামেরিক ও আমপাতা জোড়া জোড়া। সব শেষে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে অ্যাডর্ন পাবলিকেশন থেকে ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’ গ্রন্থটি।
রফিকুল হক ছড়া লেখেন না, ছড়া বানান। কথা বলতে বলতে বোনেন শব্দের জাল। হাঁটতে হাঁটতে তৈরি করেন ছন্দ-মাত্রা-তাল। তাঁর মতে যদি পড়তে পড়তে ছড়া মনে আর শরীরে দোলা সৃষ্টি না করে, তবে কীসের ছড়া। তাঁর ‘হাঁটতে হাঁটতে’ ‘ফুর্তি’ এবং ‘ধুত্তর’ ছড়া পড়লেই তার এইসব বৈশিষ্ট্যের ছাপ পাওয়া যায়।
‘বর্গী এলো দেশে’ নামক বইয়ে লিখেছেন এমন ছড়া-

‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা ফুল তুলিতে যাই
সিসের বুলেট বুকে বিঁধলো মরতে কি ভয় পাই?
বাপ মরেছে মা মরেছে রক্ত ভরা নদী
ভেসে গেছে সেই নদীতে র¶পুরের গদী।’
সমকালীন বাংলা ছড়া জগতের প্রতিভূ রফিকুল হক ছড়ার রাজ্যে মহানন্দে ঘুরে বেড়ান। প্রায় ছয় দশক ধরে ছোটো ও বড়োদের জন্য তিনি ছড়া লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে অকাতরে যুক্ত হচ্ছে তার বিভিন্ন মাত্রার অসংখ্য ছড়া। বাংলাদেশের শিশু সাহিত্যে তিনি একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। শিশুতোষ বিষয়ের পাশাপাশি তার ছড়ায় সমাজের নানা অসঙ্গতি, বিভিন্ন ক্রান্তিকালের উত্তপ্ত রাজনৈতিক প্রসঙ্গও স্থান পায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উজ্জ্বীবিত দাদুভাই স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে সক্রিয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
ছেলে ঘুমাল বুড়ো ঘুমাল ভোলা দ্বীপের চরে
জেগে থাকা মানুষগুলো মাতম শুধু করে।
ঘুমো বাছা ঘুমোরে
সাগর দিল চুমোরে।

খিদে ফুরাল জ্বালা জুড়াল কান্না কেন ছিঃ
বাংলাদেশের মানুষ বুকে পাথর বেঁধেছি।
গণআন্দোলনের পটভূমিকায় উল্লিখিত ছড়া লিখেছেন তিনি সাহস আর শোষকের বিরুদ্ধ চেতনায়, সেইসাথে শ্রেণিসচেতন ছড়াও লিখেছেন ‘বর্গী এলো দেশে’ বইয়ে, যেমন-
‘তাঁতি পাড়ায় বাতি নেইকো
সুয্যি বসে পাটে,
সুতো কিনব মুরোদ কোথা
বাতি নেইকো হাটে।’
সেই সময়ের পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ, তাদের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষের ঘৃণা ও পুঞ্জিভূত ক্ষোভ উল্লিখিত ছড়ায় তিনি টেনে এনেছেন। বাংলাদেশের সেই সময়ের মূলধারার সকল ছড়াকার স্বদেশভূমির ওপর শোষণ ও বৈষম্যের প্রতি সোচ্চার শুধু নয়, বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার বোধকে বিকশিত করতে ভূমিকা রেখেছেন। সাহিত্যের এটা এক প্রধান কাজ, যা থেকে লেখকরা দূরবর্তী অবস্থানে থাকতে পারেন না। বাংলাদেশের লেখকরা সেই ঐতিহ্যের পথ ধরে সবসময়ে চলেছেন।
বাংলা সাহিত্যে যে ছড়ার ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তারই ধারাবাহিকতার সাজুয্যে তিনি তাঁর ছড়ার জগৎ নির্মাণ করলেও সৃজনশীলতার নিজস্ব ছাপ রেখেছেন জোরালোভাবে।
তিনি ছোটো ছোটো চরণে ছড়া লিখেছেন, তাঁর ছড়ায় তিনি শব্দকে বেশ মেপে মেপে ব্যবহার করেছেন, এই বৈশিষ্ট্য তাঁর এক সচেতন সৃজনশীলতার শক্তি আমরা বিবেচনা করতে পারি।
স্বভাব ছড়াকার দাদুভাইয়ের ছড়া ছবির মতো। পড়তে পড়তে মন কখনও আনন্দে ভরে যায় ও আশায় উজ্জীবিত হয়। আবার কখনও মন বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে। তার ছন্দজ্ঞান ও বিষয় বৈচিত্র্য তুলনাহীন এবং শব্দের ব্যবহার অভিনব। তার ছড়ায় পাওয়া যায় বর্ণের অনুপ্রাস শব্দের গাঁথুনি, অন্ত্যমিল ও ছন্দের কারিগরি। সব মিলিয়ে তাকে বলা যায় ছড়ার জাদুকর।

অসাধারণ ছড়াকার দাদুভাইয়ের হাতে ছড়ার ছন্দ ফুটে উঠে নিপুণতায়। তার ছড়ার আড়ালে দেশ, সমাজ তথা রাজনীতির চরম ও পরম সত্যের প্রকাশ ঘটে। যেমন–
‘ঘুড়ি বলল, উড়ি?
দূর আকাশে,
দেখাই কারিকুরি?
সূতা বলল, ওড়ো,
হাওয়ায় ভেসে
মনের সুখে ঘোরো!
লাটাই বলে, দাঁড়া,
সূতা ছিঁড়লে
ঘুড়ির কম্ম সারা!
নামল হঠাৎ
বৃষ্টি গুঁড়ি গুঁড়ি
অমনি খতম
ঘুড়ির বাহাদুরি।’
ছড়ার আঙ্গিক নিয়ে বহু রকমের ভাঙা-গড়া ও বৈচিত্র্য রয়েছে তাঁর। মিল ও শব্দের কারিগরি দিয়ে তিনি পাঠককে সবসময় আন্দোলিত করেন। যেমন–
ধঞ্চে কি তা জিগায় জানো
মাঞ্চুরিয়ার পঞ্চু
ইঞ্চি এনে হাড়গিলে ছা
মাপতে বলে চঞ্চু
চীনে ভাষায় চনমনিয়ে
বললে, বাপু ডোঞ্চু ?
খাইকে নাকি খ্ধসঢ়ঞ্চু বলে
যাইকে নাকি যাঞ্চু
খাঞ্চাভরা খাস্তা খাজা

এনেই বলে আঞ্চু
চানখাঁ পুলে চেঁচিয়ে বেচে
‘চাই চানাচুর চাঞ্চু !’
আমীরুল ইসলামের ভাষায়–লৌকিক ঐতিহ্যের সুরে রং মিশিয়ে তিনি আধুনিক ছড়া রূপায়িত করেন। মূল ধারার প্রকৃত ছড়াকবি তিনি। তিনি আজীবন সৎ ছড়া লিখেছেন। কখনও ভেজাল ছড়া লেখেননি। বিপুল বিস্তারিত তার ছড়ার পৃথিবী। অজস্র লিখেছেন। লিখেছেন বলা ঠিক হবে না। তিনি ছড়া বানিয়ে তোলেন। মায়ের হৃদয়ের আকুতি তার ছড়ার ছত্রে ছত্রে। ভালোবাসার গন্ধ পাওয়া যায় রফিকুল হক দাদুভাইয়ের ছড়ায়। আশ্চর্য রকমের মৌলিক তার ছড়া। কখনও মনে হয় না যে এসব ছড়ার কোনো লেখক আছে। যেন শত শত বছর ধরে মায়েদের মুখে মুখে তৈরি হওয়া ছড়া। রফিকুল হক তাই প্রকৃত ছড়াকার। বাঘের ছাল পরিধান করে তিনি বাঘের দলে প্রবেশ করেন না। বাঘের মতোই তিনি ছড়ায় গর্জন করেন।’
চ্যাংদোলা করে চেঙ্গিস খান
দেন ছুড়ে চাওপাও-কে,

রংপুরে গিয়ে হয়রান বাপ
পান খুঁজে তার ছাও কে।
তানপুরা কোলে ওস্তাদ গান
মাঝরাতে রাগ ভায়রো।
কান ঝালাপালা চেঙ্গিস খান
রাগ করে যান কায়রো।
রফিকুল হক বাংলা ছড়া সাহিত্যের মূলধারার বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করে বিভিন্ন নিরী¶া করেছেন, তাঁর ছড়ার আঙ্গিক বেশ বৈচিত্র্যময়। বিষয় বৈচিত্র্যও বিভিন্ন স্বাদের। শিশুতোষ ছড়া থেকে রাজনৈতিক-সমাজ সচেতনমূলক ছড়ায় তার প্রমাণ মেলে। বাংলাদেশের ছড়ার মূলভূমি আজ বিকশিত হয়ে যে উজ্জ্বল হয়ে দেদীপ্যমান, সেখানে রফিকুল হকের শ্রম-সাধনা ও ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কিত, তা ছিন্ন করা যায না, যাবে না।
তাঁর ছড়া পড়তে খুব বেশি বুদ্ধি প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। আবার তাঁর চানাচুরের মতো মুখরোচক ছড়ায় থাকে কাব্যিক বৈশিষ্ট্য। সব মিলিয়ে রফিকুল হক বাংলা ছড়া সাহিত্যে একটি আলাদা জগতের জমিদারÑযার ছড়া পড়তে খাজনা লাগে না। মানে সহজবোধ্য, সুখপাঠ্য আর পড়তে পড়তে দোল খেতে হয় ছন্দে আনন্দে। রফিকুল হকের ছড়ায় থাকে নাটকীয়তা, দর্শন, নীতি নির্দেশনা, নীতিকথা, প্রশ্নবোধক সমাপ্তি, শেষ হয়েও হয়না শেষ ধারার রেষ, ছোটোদের মতো চঞ্চল, অনুকরণ নেই মোটেও, একেবারে স্বকীয় ও স্বতন্ত্র ধর্মের শব্দ বুনন।
রফিকুল হক উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন ভবিষ্যতের সকল প্রজন্মের কাছে। সময়ের চিত্র এইভাবে বয়ে নেওয়া যায় ইতিহাসের পাতায় ছড়ার মাধ্যমে, রফিকুল হক তার একজন সফল কারিগর। তাঁর ছড়ায় আমরা পেয়েছি, স্বাধীনতা সংগ্রাম, অধিকারের কথা, প্রতিবাদের শব্দমালা, ইতিহাসে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা–কোনো কিছুই বাদ যায়নি তাঁর মিষ্টি হাতের স্পর্শ থেকে।
১৪০৫ বঙ্গাব্দে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ দেশে ও বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৯ সালে শিশুসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তাঁকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান করে।