১৭৮ বার পড়া হয়েছে
জলি ভাবী ও জাহিদের চোখ ভিজে এলো।
ভরা বর্ষায় বুড়িগঙ্গাও পোয়াতি নববধু। প্রায় চারশ বছর আগে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা ঢাকা শহরের এক কন্যার বধু বেশ দেখে বুড়িগঙ্গাও যেন অশ্রুসিক্ত হলো। হঠাৎ আসা একটি ঢেউ জলিল মাঝির নৌকায় আছাড় খেয়ে জল লাফিয়ে ওঠল এবং একটু শীতল জল ঢুকে গেল ছৈয়ার ভেতর। ভিজে গেল নববধুর লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ির আঁচল, জলি ভাবীর বাঁ-হাতের মধ্যমা আঙুল। জলের কঞ্জুস একটি ফোঁটা এসে শ্রাবন্তির চোখের ভেতর লুকালো। ঠান্ডা জলের ছিটেফোটায় একাকার হয়ে গেল শ্রাবন্তির কষ্টের গরম লোনাজল। সে সময় ছৈয়ার ভেতর ঢুকল অপু চৌধুরী। শ্রাবন্তির বর। জলি ভাবীর ভাষায় কোনহানকার কোন বাঙাল পোলা।
বরকে কাছে পেয়ে বাস্তবিক অর্থেই শ্রাবন্তির কষ্টের নহর গতিহীন হতে শুরু করল। শ্রাবন্তি কান্না লুকাতে চেষ্টা করল। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছল। কিন্তু বেশিক্ষণ কান্নার গতি থামিয়ে রাখতে পারল না। অপুকে পেয়ে মুহূর্তেই শ্রাবন্তির কান্নার গতি বেড়ে গেল। বউর কান্না দেখে বরেরও অশ্রুসিক্ত হলো।
যেমনটি ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার পানি এক স্রোতে মিশে বুড়িগঙ্গা নদীর সৃষ্টি হয়েছিল। অপু ও শ্রাবন্তির লোনাজলের ধারা একত্র হয়ে কী সৃষ্টি হবে ভবিতব্যই জানে। তবে এই মুহূর্তে অপু নিজের ডান হাত বাড়িয়ে দিলো শ্রাবন্তির বাঁ-হাতের দিকে। নতুন বউকে সান্ত্বনা দিতে কী বলবে মনে মনে শব্দ খুঁজতে চেষ্টা করল। কিন্তু তার আগেই হঠাৎ ধেয়ে আসা ঝড় সবকিছু ওলট-পালট করে দিলো। ভালোবাসার উপকূলে জলি ভাবীর তীব্র আঘাত। শ্রাবন্তির হাত থেকে অপু চৌধুরীর হাত বিচ্ছিন্ন করতে তুমুল যুদ্ধ এবং যুদ্ধে জলি ভাবী জয়যুক্ত হলেন। অপুর হাত ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে জলি ভাবী বললেন, বাঙালের কাণ্ড দেখছতনি! মাগার কথা নাই বার্তা নাই, অনুমতি নিবার অনুরোধ নাই, হালা বাঙাল ক্যামতে আমার ননদের হাতখান ধইরা ফালাইল! ওই মিয়া, আমি যে একখান মুরব্বী বইসা রইছি দেখ না? চোক্ষে কি বুড়িগঙ্গার কচুরিপানা ঢুকাইছ নিহি?
অপু চৌধুরী বোকার স্বর্গে ঢুকে গেল। কী বলবে কিছুই বুঝতে পারল না। বুঝতে পারল না জলি ভাবীর এই কর্মকাণ্ড কি নিছক মজা করার জন্য, নাকি অন্যকিছু। জলি ভাবীর পরিচয় তার কাছে নতুন নয়। যখন থেকে শ্রাবন্তির বিয়ের কথা হচ্ছিল, তখন থেকেই জলি ভাবী কাঁঠালের আঠার মতো শ্রাবন্তির সাথে লেগে থাকছেন। জলি ভাবী শ্রাবন্তির বড় ভাই ইমতিয়াজ শেখের স্ত্রী। নিজের আগ্রহে ননদির যাত্রা সঙ্গী হয়েছেন। উদ্দেশ্য ননদিনী কোথায়, কেমন পরিবেশে গিয়ে জীবনযাপন করবেন, বাকি জীবনটা কাটাবেন। গত কয়েকদিনে জলি ভাবীর সম্পর্কে অনেকটাই জানা হয়ে গেছে তার। জলি ভাবী যখন ঢাকার অভিজাত এলাকা গেণ্ডারিয়াবাসী শেখ সামসুদ্দিন সাহেবের বড়পুত্র ইমতিয়াজ শেখের বউ হয়ে আসেন শ্রাবন্তির তখন কিশোরিকাল। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। চঞ্চল শ্রাবন্তি জলি ভাবীকে পেয়ে জীবনের সেরা সঙ্গীটিকে খুঁজে পেল। সুখদুঃখের অনন্ত সাথী হয়ে উপস্থিত হলো জলি ভাবী। জলি ভাবীও কিশোরী শ্রাবন্তিকে নিজ সন্তানের মতো বুকে টেনে নিলেন। শাশুড়ি সাহিদা বেগমও হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। চঞ্চল শ্রাবন্তিকে নিয়ে তিনি যেন পেরে উঠছিলেন না। স্কুল শেষে শ্রাবন্তির সারাদিন ছুটোছুটি, গাছে চড়া, টারজান টারজান খেলা, ছাদ গাছের ডাল, ডাল থেকে ছাদ বেয়ে ওঠা-নামা। পাশের বাড়ির বন্ধুদের নিয়ে কুতকুত-বউচি খেলা।
এসবকিছুর দেখভাল করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে জলি ভাবী যেদিন শাশুড়িকে বললেন, মা, এখন থেকে শ্রাবন্তিকে নিয়ে পেরেসানি হওয়ার দরকার নাইক্কা। ওর সব দায়িত্ব আমার। আদরযত্ন ও পিটুনি সব।
সেই থেকে শ্রাবন্তি জলি ভাবীর সার্বক্ষণিক সঙ্গী। খেলার সাথী, পড়াশোনার ওস্তাদ, চাওয়া-পাওয়ার গার্জিয়ান। শুধু শ্রাবন্তির বিয়ের ব্যাপারে পুরোপুরি ক্ষমতা দেখাতে পারেননি। স্বামীর গোঁ ধরার কাছে হেরে গেছেন। ইমতিয়াজ শেখ বোনকে বিয়ে দেবেন অপু চৌধুরীর কাছেই। জলি ভাবী প্রথমে বাঙালের কাছে ননদিনীকে পাত্রস্থ করতে সম্মত না হলেও ছেলের যোগ্যতার ফিরিস্তি শুনে নমনীয় হলেন। রাজি হলেন অপুর কাছে ননদিনীকে বিয়ে দিতে।
সেই ননদিনীর হাত ধরবে তাঁর অনুমতি ছাড়া, এটা কী করে হয়! অপু চৌধুরী বিদ্যুৎস্পর্শের ন্যায় নিথর হয়ে গেলেন। জলি ভাবী আগের কথার সাথে যোগ করলেন, এতক্ষণ কই আছিলা চদু? আমার ননদি যে একলা একলা নাওয়ের মধ্যে ওঠল, ওঠতে গিয়া বি পইড়া যাইতেছিল, তখন কই আছিলা? কই আছিল তোমার প্রেমপিরিতি? এহন বিনা অনুমতিতে হাত ধরবার আইছ!
জাহিদ জলি ভাবীর কথা শুনছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায়। জলি ভাবী তা খেয়াল করলেন। বললেন, এই হারামি তুই আবার ভেটকি মাছেন মতন চাইয়া চাইয়া কী দেখতাছস? যা বাইরে যা। সবুর আর মাজেদ কই আছে দেখ।
জাহিদ কিছু না বলে ছৈয়ার ভেতর থেকে গলুইয়ের দিকে পা বাড়াল। ভেতর থেকে জলি ভাবী জাহিদকে সতর্ক করলেন, এই ছেমরা দেখিস কিন্তুক, আবার পইড়া যাইস না। মাজেদ ও সবুরকেও সতর্ক করল, এই তোরা দুই ভাই কিন্তুক নড়াচড়া করিস না। এক জায়গায় চুপচাপ বইসা থাকিস। অপু চৌধুরীকে বললেন, কী জামাই, আমার কথায় মাইন্ড খাইছ নাকি? বউরে ধরতে মন চাইতাছে? সারাজীবনই তো ধইরা রাখবা, কী কও? নাকি ছাইড়া-ছুইড়া বাদাইম্মাগিরি করবা? দেইখ কিন্তুক, এমনিতেই বাঙালগ কাছে ননদিনীরে দিতে রাজি ছিলাম না, হুনছি তুমি পোলাডা ভালাই, তাই রাজি হইছি। বুঝছ?
হুম, বুঝছি ওস্তাদ।
ঠিক আছে এইবার ননদিনীর হাতটা বি ধরবার অনুমতি দিলাম।
চার।
দ্বিতীয় অধ্যায়
নূরিখালার দোতলা বাড়ি। এই বাড়ির একটি রূম মেস হিসেবে ভাড়া নিয়েছে সেলিম ও বিকাশ। তৃতীয় সদস্য হিসেবে অপুকেও ভর্তি করতে চাচ্ছে।
অপু রাজি। রাজি না হয়ে উপায় নেই। বর্তমানে যে বাড়িটাতে থাকছে অপু, তা ওর পছন্দ নয়। গিঞ্জি টাইপের। চিপাচাপা। আলো-বাতাস নেই। বাড়িতে সদস্য অনেক। হাউকাউ বেশি। ঠিক মতো পানি থাকে না। দিনের বেলায়ও লোডসেডিং হলে পুরোপুরি অন্ধকার থাকে ঘর-বারান্দা। এই পরিবেশ থেকে পরিত্রাণ পেতে তলে তলে ঘর খুঁজছিল অপু। এই কথা শেয়ার করেছিল বন্ধু সেলিম ও বিকাশের সাথে। ওরা দুইবন্ধু প্রস্তাব দিয়েছে নতুন ঘর পেলে তিনজনে একটা ঘর নেবে। নিয়েছেও। সেলিমের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী সে ঘর দেখতে এসেছে আজ। সেলিম ঘরের যা বর্ণনা দিয়েছে, বড় রাস্তা থেকে গ্লাস ফ্যাক্টরির দিকে যে রাস্তাটা ঢুকেছে, তার চারটা বাড়ির পরের বাড়িটাই একচল্লিশ বাই দুই। নূরিখালার বাড়ি। নাম্বার গুণে গুণে বাড়িটা পেয়ে গেল অপু। রাস্তার সাথে লাগোয়া বাড়ি। বাড়িতে ঢুকতে পুরনো লোহার গেট। গেট থেলে ভেতরে ঢুকল অপু। সুনসান। দুই আড়াই ফুটের চওড়া বারান্দা কাম রাস্তা। ইট বিছানো। অনেকদিনের পুরনো ইট। ক্ষয়িষ্ণু। দুয়েকটা ইট আবার মাথা তোলে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। এরকম একটা ইটে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো অপুর। বাড়ির দেয়ালে হাত বাড়িয়ে দিয়ে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে সমর্থ হলো। ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে কিছুটা আঘাত পেল। তবে খুব তীব্র নয়। পায়ে কেডস থাকায় রক্ষা।
ভেতরে ঢুকে অপু দেখতে পেল বিল্ডিংয়ের নিচতলায় সারিবদ্ধ চারটা ঘর। সেলিম বলেছে মাঝের ঘরটা ভাড়া নিয়েছে ওরা। প্রথম ঘরটার দরজা বন্ধ। দ্বিতীয় ঘরটাকে মাঝের ভেবে উঁকি দেয় অপু। আবছা অন্ধকার ঘরে অল্পবয়সী এক মহিলা কাঠের উদোম চৌকিতে দরজার দিকে পা দিয়ে শুয়ে আছে। মহিলার ডান হাতের উপর একটি উলঙ্গ শিশু। নিঃশঙ্কচিত্তে স্তন বের করে শিশুসন্তানটিকে দুধ খাওয়াচ্ছে সে। অপু রুমের পরিবেশ দেখে বুঝতে পারল নিম্নবিত্ত পরিবার। ঘরের ভেতর বিচ্ছিন্নভাবে এটা-ওটা, হাড়িপাতিল পড়ে আছে। মহিলা হয়ত অপুকে দেখতে পায়নি। কিংবা দেখলেও গুরুত্ব দেয়নি। অপু সরি বলে সরে এলো। বাড়ির পরিবেশ অপুর খুব একটা পছন্দ হলো না। তবে বর্তমানে যে মেসবাড়িতে থাকছে, তার থেকে অনেকটাই ভালো।
তৃতীয় ঘরের দিকে এগিয়ে গেল অপু। তৃতীয় ঘরের আগে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সিঁড়ির আগে বাথরুম। বাথরুমের কাঠের দরজার নিচের অংশ ক্ষয় হয়ে ভেতরে দেখা যাচ্ছে। সাত-আট বছরের এক ছেলেশিশু গোসল করছে গান গাইতে গাইতে। শিশুরা গোসল করতে ঢুকতে চায় না বটে, একবার ঢুকে গেলে এরকম গান বেরিয়ে আসে। শিশুটা সম্ভবত অপুর আগমন বুঝতে পেরেছে। সে কাঠের দরজা খুলে নিজের আদিম কাঠামো নির্দ্বিধায় উন্মুক্ত করে অপুকে জিজ্ঞেস করল, আপনে কেডা? কোন ঘরে আইছেন?
সেলিম সাহেব কোন ঘরে থাকে জানো?
সামনে যান, তাইলেই পাইবেন। শিশুটির সোজাসাপটা জবাব।
অপু সামনে গেল। সিঁড়ির পরের ঘরটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কাঠের বন্ধ দরজা। সেলিমের নাম ধরে ডাক দিলো অপু।
বার কয়েক ডাক দেওয়ার পর চোখ ঢলতে ঢলতে দরজা খুলল সেলিম। বলল, চলে এসেছিস? একটু ঘুমোচ্ছিলাম। তোর লাগেজ-টাগেজ কই?
লাগেজ-টাগেজ মানে? আমার আজ আসার কথা? অপু জবাব দিলো।
ঠিক আছে ঘরে আয়।
অপু ঘরের ভেতর ঢুকলো। সেলিম বলল, আসবি যখন আজকেই চলে আয়। দেরি করার দরকার কী?
আজ একটু ঝামেলা আছে। আগামীকাল আসব। আজ বাড়িটা চিনে গেলাম। কিন্তু তোরা যে গপ্পো মারলি হেভি হাইফাই বাড়ি। এই তোদের হাইফাই? বাড়িতে ঢুকেই হোচট। প্রথমে ইটে। পরে… যাক, কথা যখন দিয়েছি, আসতে তো হবেই। কাল সকালে আসব। আমাদের রুম ছাড়া নিচের সবগুলো রুমেই কি ভাড়াটে আছে?
হুম, নিচে তিন রুম ফ্যামিলি, উপরে এক রুম। বাড়িওয়ালি, মানে নূরিখালা থাকেন উপরে। নূরিখালা নূরিখালা বলছিস যে, খালু নাই? খালার পোলামাইয়া?
সবই আছে। আসছিস যখন, সবই জানতে পারবি।
চলবে…