১৯৫ বার পড়া হয়েছে
স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার
লেখক: দেবাশীষ দাস
তারিখ: ২০/০১/২২ ইং
তৃতীয় শ্রেণীতে ওঠার পর কুলদীপ ছাত্রজীবন উপভোগ করতে শুরু করেছিল। পাড়ার এক ঝাঁক ছাত্র-ছাত্রীর সাথে খুব মজা করে স্কুলে যাওয়া-আসা করত। পিসতুত ভাই পঙ্কজ, পিসতুত বোন শ্রাবন্তী, প্রতিবেশী বিকাশ কামিনী অদ্রিকা অরুনিতা তুলকা কবীর ওরা সবাই কুলদীপের সহপাঠী ছিল। ওদের সবার সাথে কুলদীপের বন্ধুত্ব ছিল। ক্লাসে কুলদীপের সবচেয়ে ভাল বন্ধু ছিল অরিন্দম। অরিন্দম সঞ্জয়ের পিসতুত ভাই। সে দূর গ্রাম থেকে পড়াশোনা করার জন্য সঞ্জয়ের বাড়িতে এসেছিল। সঞ্জয়ের সাথে বন্ধুত্বের সূত্রেই অরিন্দমের সাথে কুলদীপের বন্ধুত্ব হয়েছিল। কুলদীপ ক্লাসে অরিন্দমের সাথে এক বেঞ্চে বসত। দুই বন্ধু মিলে একটু আধটু দুষ্টুমি করত। কুলদীপ যদিও স্কুলে গিয়ে অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের মত বেশি দুষ্টুমি করত না। তবে স্কুল সম্পর্কে তার মনের মধ্যে যে অদ্ভুত একটা ভয় ছিল সেটা বেশ খানিকটা দূর হয়েছিল। সে ক্লাসের অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কথা বলত। বিকেল বেলা বন্ধুদের সাথে অরুনিতার বাড়ির পাশে মনু নদীর তীরের মাঠে খেলাধুলা করত। তখন পাড়ার শিশুদের সাথে খেলাধুলা ও মেলামেশা করতে কুলদীপের কোনও প্রতিবন্ধকতা ছিল না। কুলদীপের পরিবার পরিজনেরা উপলব্ধি করেছিলেন যে ওকে সবার সাথে খেলাধুলা করতে দেওয়া উচিত। এতে করে সে হয়তো মাঝে মধ্যে শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বে, কিন্তু মানসিক সুস্থতার জন্য সবার সাথে কুলদীপের মেলামেশা করা উচিত।
তৃতীয় শ্রেণীতে কুলদীপের ছাত্রজীবন আগের দুই বছরের তুলনায় বেশ ভাল ছিল। কিন্তু বছরের শেষে কুলদীপ আবার একটা মানসিক আঘাত পেয়েছিল। কুলদীপ বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল, কিন্তু বন্ধু অরিন্দম অকৃতকার্য হয়েছিল। তবে বন্ধু বিচ্ছেদের বিরহ কুলদীপকে বেশিদিন সইতে হয়নি। কুলদীপ যখন চতুর্থ শ্রেণীতে ওঠেছিল সেই বছরই দাস পাড়ায় নতুন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু হয়েছিল। দাস পাড়ার সকল ছাত্র-ছাত্রীকে বাধ্যতামূলক ভাবে নতুন স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। নতুন স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা কম ছিল। তাই সব ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা একসাথে খেলাধুলা করত। সবাই একই পাড়ার ছাত্র-ছাত্রী ছিল। এর ফলে স্কুল সম্পর্কে কুলদীপের মনে আর কোনও ভয় ছিল না। সে সবার সাথে মেলামেশা খেলাধুলা করত। সে পুরানো ছন্দের বাইরে গিয়ে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেছিল। সে স্কুলের প্রার্থনা সভায়, শারীরিক ব্যায়াম ও খেলাধুলায় সকল ছাত্র-ছাত্রীকে নেতৃত্ব দিত। কিন্তু সে অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের মত অতিরিক্ত দুষ্টুমি করত না। সে ছিল নম্র ভদ্র ও শিক্ষকদের একান্ত অনুগত ছাত্র। স্কুলের মধ্যে কুলদীপের পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। কুলদীপের আলাদা একটা ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছিল। কুলদীপ সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে আদর্শ ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেছিল।
কিন্তু চতুর্থ শ্রেণির ষান্মাসিক পরীক্ষায় কুলদীপের পারফরম্যান্স ছিল খুব খারাপ। পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে সে একশত নম্বরও অর্জন করতে পারেনি। এতে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকদের কাছে কুলদীপের ভাবমূর্তি খানিকটা ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুভাষ বণিক কুলদীপকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি পরীক্ষায় কুলদীপের খারাপ রেজাল্ট সম্পর্কে কুলদীপের পিতা মথুর বাবুকে অবগত করেন এবং কুলদীপের পড়াশোনার প্রতি আরেকটু যত্নবান হতে বললেন। মথুর বাবু প্রধান শিক্ষকের কথা শুনে স্থির করলেন এবার কুলদীপের জন্য একজন গৃহশিক্ষক দরকার। সংসারের অভাব অনটনের কারণে এতদিন কুলদীপের কোনও গৃহশিক্ষক ছিল না। বাড়িতে বড় দিদিদের কাছেই কুলদীপ পড়াশোনা করত। কিন্তু এবার যে গৃহশিক্ষক না রেখে আর কোনও উপায় নেই। কিন্তু বছরের মাঝখানে এসে গৃহশিক্ষক পাওয়া খুব কঠিন কাজ ছিল। মথুর বাবুর অনুরোধে কুলদীপকে পড়াতে রাজি হয়েছিলেন গৃহশিক্ষক নরেন ভট্টাচার্য।
নরেন্দ্র ভট্টাচার্য পাগলা মাস্টার নামে পরিচিত ছিলেন। তার আসা যাওয়ার নির্দিষ্ট কোনও সময় ছিল না। কখনো তিনি সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই ছাত্রদের বাড়িতে পৌঁছে যেতেন। আবার কখনো দুপুরে বিকেলে সন্ধ্যায় কিংবা রাত নয়টায়। কোনও দিন আধা ঘন্টা পড়াতেন আবার কোনও দিন দুই ঘন্টা। কোনও দিন একবার চলে যাবার পর আবার আসতেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র-ছাত্রীরা যেন সব সময় পড়াশোনা করে। তিনি শারীরিক ভাবে কাউকে আঘাত করতেন না, কিন্তু তার ধমকেই ছাত্র-ছাত্রীরা থত-মত হয়ে যেত। পাগলা মাস্টারের একটা বিশেষ গুণ ছিল। তার কাছে প্রাইভেট পড়ে কেউ ফেল করেনি। বহুসংখ্যক দুর্বল শিক্ষার্থী পাগলা মাস্টারের কাছে প্রাইভেট পড়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করেছিল। এই পাগলা মাস্টারের কবলে পড়ে কুলদীপের বিকেলের খেলাধুলার পাঠ উঠে গিয়েছিল। পাগলা মাস্টার কখন আসবে এই ভয়ে কুলদীপের দিন কাটত। তখন কুলদীপের জীবনে পাগলা মাস্টার এক নতুন বিপদ ছিল। পাগলা মাস্টারকে কুলদীপের একেবারেই পছন্দ ছিল না। কিন্তু স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার পর কুলদীপ পাগলা মাস্টারের গুরুত্ব অনুভব করেছিল। সে উপলব্ধি করেছিল তার প্রত্যেকটা পরীক্ষা খুব ভাল হয়েছে। বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সবাই অবাক হয়েছিলেন। ক্লাসের সবার থেকে বেশি নম্বর অর্জন করেছিল কুলদীপ। ষান্মাসিক পরীক্ষার নম্বরের সাথে গড় করার ফলে সে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল। বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কুলদীপ আবার হারানো সন্মান ফিরে পেয়েছিল। সব দিক মূল্যায়নে কুলদীপ হয়েছিল স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার।
Tripura/India