১৬৭ বার পড়া হয়েছে
শামসুর রাহমান ও আমাদের সাহিত্য-সমাজ
আহমাদ মাযহার
আমাদের তরুণ বয়সে, সাহিত্য-যাত্রা শুরুর কালে, যখন শামসুর রাহমানের নাম শুনতাম, কিংবা কোনো আসরে উল্লিখিত হতো তাঁর প্রসঙ্গ, এমনকি তা যদি নেতিবাচকও হতো, তাহলেও অনুভব করতাম, তিনি আমাদের সাহিত্য-সমাজের সর্বাগ্রে গণনীয়দের মধ্যেই থাকেন। এমনকি তাঁর তুলনায় প্রবীণতরদের মনোভঙ্গিতেও তাঁর ব্যাপারে এমনই গুরুত্ব প্রকাশ পেত! তবে এ কথা সত্যি, এখন আর তেমন মনে হয় না! কারো কারো কাছ থেকে এমন মন্তব্যও শোনা যায়, শারীরিক অনুপস্থিতির স্বল্প ব্যবধানেই অনেকটা ধূসর হয়ে উঠেছেন তিনি!
শামসুর রাহমানের এখনই ধূসর হয়ে পড়ার কারণ হয়তো এই যে, আমাদের সাহিত্য-সমাজ আগের মতো আর একটি দুটি মাত্র ধারাতেই ঘনবদ্ধ নেই। কালের বাস্তবতা এমন, এই সাহিত্য-সমাজ আর নেই দু-একটি সমাজিক ভাবধারায় সীমিত। আমাদের সাহিত্য-সমাজ এখন অনেকগুলো ছোট ছোট সমাজ-সমাহারে রূপান্তরিত হয়ে পড়েছে! তা ছাড়াও সাহিত্যিকতার বাইরের নানা অনুষঙ্গ এখন সাহিত্যিক শনাক্তির বা দলবদ্ধ হওয়ার উপকরণ হিসেবেও হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সমাজ এমনভাবে রূপান্তরিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের এখনকার সমাজে আর শামসুর রাহমানের মতো প্রধান কবি পাওয়া যাবে না! এমনকি মাত্র স্বল্প কাল আগের প্রধানতম কবি শামসুর রাহমানও অপঠিত থেকে যেতে পারেন এখনকার প্রতিশ্রুতিশীল একজন তরুণ কবি যশোপ্রার্থীর কাছে!
শামসুর রাহমান যে বাংলাদেশের প্রধান কবি হয়ে উঠেছিলেন তার কারণ তিনি কেবল কবিতার রূপসৌষ্ঠবে পরিশীলিত ছিলেন বলে নয়, নয় কেবল রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতায় স্মরণীয় ছিলেন বলেও; তিনি প্রধান হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষি সংস্লিষ্ট মুসলিম, নিম্নবর্ণের নানা পেশা ভিত্তিক জনসমাজ ও অন্যান্য স্থানীয় নৃতাত্ত্বিক তথা পূর্ববঙ্গীয় গঠমান মধ্যবিত্তীয় মানসচৈতন্যের ধারক ব্যঞ্জনাময় একটি ভাষাকল্প সৃষ্টির কারণে।
আধুনিক কবিতা দুর্বোধ্য–এ রকম অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে আসার পটভূমিতে কবিতায় শামসুর রাহমানের ভাষাসামর্থ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ভূমিকা রয়েছে! কবিতা রচনায় তাঁর ভাষিক চেতনাপ্রবাহ এতটাই প্রভাবসৃষ্টিকারী যে, এক সময় এর থেকে মুক্ত হয়ে তরুণ কবিদের স্বাতন্ত্র্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রীতিমতো ইশতেহার জারি করতে হয়েছিল!
স্বধীনতা-উত্তর কালে নানা অসঙ্গতি, রাষ্ট্রীয় অনাচার, গণতন্ত্রের সংকট ও শিক্ষা খাতের বিচিত্র অপরিণামদর্শিতার সঞ্চার সত্ত্বেও দেশে উচ্চশক্ষিতের হার বাড়ার ফলে সাহিত্য-সমাজের সামগ্রিক পরিধি বেড়েছে। স্বাধীনতা-পূর্ব কালে বা এর অব্যবহিত-উত্তর কালের শিক্ষিত জনসমাজে যে মাত্রায় সাহিত্যের নিবিড় প্রভাব ছিল তা ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে। তা ছাড়াও বৈশ্বিক নানা অনুষঙ্গ ও সাহিত্যিকতার চেয়ে অর্থকরী বিচিত্র কাজের গুরুত্ব এত বেড়ে গেছে যে বাংলাদেশের সাহিত্য যশোপ্রার্থীরাও আর সাহিত্যের অনেক অঞ্চলে দৃষ্টিপাত করার অবকাশ পান না! এমনকি শামসুর রাহমানকে গভীরভাবে পাঠ না করেও এক জনের পক্ষে বাংলাদেশে কবিতা-উৎপাদনশীল থাকা সম্ভব!
কথা উঠতে পারে শামসুর রাহমানের কবিতা ভালোভাবে পাঠ না করেও বাংলাদেশের কবিতার ভুবনে যিনি বিচরণশীল থাকবেন তিনি কী করে ধারণ করবেন বাংলা কবিতার বহমান ধারাকে? এই প্রশ্নের যাথার্থ্যও হয়তো অস্বীকার করা যাবে না! কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরে কি পাল্টা এই প্রশ্ন করা যায় না যে, বাংলাদেশের আধুনিক মধ্যবিত্তের কবিতাভাষা যে মনোসাংস্কৃতিকতায় বিকাশমান তাতে শামসুর রাহমানের চেতনানুষঙ্গের চূর্ণিত বিস্তার এতটাই বিশাল যে, সরাসরি শামসুর রাহমানের কবিতার অভিনিবিষ্ট পাঠক না-হয়েও তাঁর মনোসংস্কৃতিসায়রে অবগাহন না করে উপায় নেই!
উপর্যুক্ত সূত্রেই শামসুর রাহমান বিভিন্ন সময়ানুষঙ্গে কিছু কালের জন্য উপেক্ষিত থাকলেও বারবার ফিরে আসবেন! সেজন্যই অদূর ভবিষ্যতে তাঁর প্রাধান্যকে বিস্মৃত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম!
_______________________________
২৯ অক্টোবর ২০২১
শামসুর রাহমানকে নিয়ে লিখেছিলাম ইত্তেফাকে, ২০২১ সালে। ছবিটা আনুমানিক ২০০৪ সালে। শ্রেষ্ঠ রচনার একটা সংকলনের প্রকাশনা অনুষ্ঠানের। সেগুন বাগিচায় অবস্থিত তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে। কবি ফরিদা আখতার খানের তোলা।