হে ক্ষণজন্মা হাদি
জাহাঙ্গীর বাবু
মৃত্যুর আগে
তোমার কি লক্ষ কোটি ভক্ত ছিল,
অনুরাগী, সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষী?
ছিল—সংখ্যায় নির্দিষ্ট।
কিন্তু তারা কি তখন এখনকার মত
বিপ্লবী, তুখোড়, ছিল।
তোমার কোন ভাষণ বক্তব্যে
জ্বালাও পোড়াও এর কথা নেই?
যারা আগুন দিলো,তারা কারা?
তোমার খুনে কার লাভ, কার ক্ষতি?
লাভ—হয়তো কারো হবে,
কিন্তু দেশের ক্ষতি হলো—
সে ক্ষতি কোনো হিসাবের খাতায় ধরে না।
যেভাবে তুমি বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলে,
যেভাবে শানিত হচ্ছিলে—
দুর্বার, নির্ভীক—
তাতে কেঁপে উঠেছিল তারা।
এক, দুই, তিন, চার—ওদের
গায়ে গায়ে জ্বালা ধরেছিল,
তোমার প্রতিটি উচ্চারণে।
ক্ষতি হলো তোমার মায়ের—
একটি বুক আজীবন খালি।
ক্ষতি হলো তোমার সন্তানের—
সে আজ এতিম।
যে আশঙ্কা তুমি করেছিলে,
ঠিক সেটাই হলো।
মনে হয়, তুমি জানতেই—
তোমার যাওয়ার সময় এসেছে,
শুধু নির্দিষ্ট ক্ষণটা জানা ছিল না।
হে ক্ষণজন্মা হাদি,
তুমি কি জানো—
এখন তুমি আরও পপুলার?
এখন বেরিয়ে আসছে
তোমার না-জানা আত্মীয়রা,
নতুন নতুন পরিচয়,
তাদের সন্তান,উত্তরসুরীদের নাম হবে— হাদি।
ফেসবুকে তুমি,ইউটিউবে তুমি,
তোমার কথা ভাসছে—
যাদের সমালোচনায় তুমি আহত হতে,
তারাই আজ কাঁদছে ক্যামেরার সামনে।
তুমি মরে গিয়ে যেন অমর।
তোমার কোনো দল ছিল না—
সদস্য ক’জন ছিল,তা তোমরাই জানো।
আজ দেখি—
লক্ষ কোটি হাদি পথে-ঘাটে,
চিৎকারে, পোস্টারে, শ্লোগানে।
এই দৃশ্য
তুমি জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারোনি।
কিন্তু শোনো হাদি—
ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর,
সে মানুষকে বাঁচতে দেয় না,
কিন্তু নামকে বাঁচিয়ে রাখে -কর্মে।
২০-১২ ২০২৫
হাদি : বজ্রকণ্ঠ থামে না — বিচার হোক, ইনসাফ হোক
জাহাঙ্গীর বাবু
হাদি খুন—
একটা বজ্রকণ্ঠের ইতি।
পড়শী পরাশক্তির ভীত কাঁপানো দু:সাহসী,
সত্য বলা বীর— ওসমান হাদি।
মরিয়াও মরে না যে বীর, সেই শহীদ হাদি।
কথায়, ভাষায়, টকশোর মাইক্রোফোনে
হাঁটুর বয়সী কটাক্ষ শুনেও
নগ্ন করে দেখিয়েছিল—তথাকথিত বুদ্ধিবেশ্যাদের
বুঝিয়েছিল মেধা কী,বুদ্ধি কী,মেরুদণ্ড কী।
কার বিরুদ্ধে বলেনি সে?
চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়নি পদস্খলন ?
জানিয়ে দিয়েছিল সে—হত্যার হুমকি পাচ্ছি,
৩০টি বিদেশি নম্বর থেকে…
“ঘরের লোকদের পর্যন্ত আগুন দিয়ে দেবে।”
এটুকু স্পষ্ট বলে ছিল—তাকে হত্যা করা হলে
তার বিচার যেন হয়।
ইনসাফের বাংলাদেশ যেন হয়।
সে বলেছিল—
“…যদি আমার মৃত্যু হয়,তার বিচার যেন হয়”
বিচার না হলে আমার মৃত্যুর মূল্য নেই।”
—এরকমই দৃঢ় আশা ও দাবির ধারা তার পোস্টে স্পষ্ট ছিল।
আগামী একশো বছরে আর আসবে না এমন কণ্ঠ—
আসবে তার পদাঙ্ক অনুসরণে
নতুন কেউ,
কিন্তু হাদি—আসবে না শহীদ হাদি।
সে জানত খুন হবে,মরন ঠিকানায় দাঁড়াবে,
তবু থামেনি সে—
কারণ হাদি বলেছিল—
“ভয় পেলে সত্য বলা যায় না।”
এভাবেই সে নিজের বিশ্বাসের কথা খুলে বলত—
বিচার ও ইনসাফের পথে দাড়িয়ে।
খুনীরা সামনে দাঁড়িয়ে
বুকে গুলি করতে পারেনি তার,
করেছে পেছন থেকে—মস্তিষ্কে।
ভীরুরা সবসময় পেছনেই মারে।
হাদি বলেছিল—
“হাতে মারো, গায়ে মারো,মারতে পারো
মস্তিষ্ক থাকলেই জন্ম নেবে নতুন হাদি।”
পেছন থেকে মস্তিস্কেই গুলি করেছে!
তার বিশ্বাস ছিল—
আদর্শ ও মানবাধিকারের প্রতি আস্থা থাকলেই
মৃত্যুও সৃষ্টি করবে নতুন আশা।
শত্রুর বুলেট ক্ষমা করেনি,কিন্তু ইতিহাস থামেনি।
মরে গিয়ে নতুন শপথে নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত করেছে-
যদিও সফল হয়েছে খুনীরা,করছে নতুন ষড়যন্ত!
অবুঝ শিশুর পিতা হাদি,সন্তান রেখেই চলে গেলেন।
শিশুটি জানে না—
তার বাবা কোনো সাধারণ মানুষ নয়,
তার বাবা একটা বিবেক,একটা অনড় প্রশ্নচিহ্ন।
আজ সে বাবার হাত খোঁজে,কাল সে জিজ্ঞেস করবে—
“আমার বাবাকে কেন মারলে?”
আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে,শত বুলেটও যথেষ্ট হবে না।
কথায় বলি—এক হাদি লোকান্তরে,
লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে।
তবে সত্যটা এটুকুই—হাদিরা জন্মায়কালে ভদ্রে,
আন্দোলনের ভিতর দিয়ে।
হাদি বলেছিল—
“আমাকে একা ভাবলে ভুল করবে;
আমি একটা ধারনা,আমি একটা শুরু।”
এমনই তার বিশ্বাস—
যে বিশ্বাসকে কেউ হত্যা করতে পারে না।
তাই আজও বজ্র থামে না।
মাইক্রোফোন ভাঙলেও,কণ্ঠ ভাঙে না।
হাদি চলে গেছে—কিন্তু সে বলে গিয়েছে—
“বিচার হোক, ইনসাফ হোক—
এটাই আমার শেষ আকাঙ্ক্ষা।”
হাদি মরে নাই। হাদি কেবল বীজ বুনে গেছে—
যেখানে বিচার ও ইনসাফের পথে –
স্যালুট হাদি,শহীদ হাদি
হাদিরা জন্মে কালে ভদ্রে –
১৯-১২-২০২৫
নীরবতার হিসাব
জাহাঙ্গীর বাবু
কে পোড়ায়—
কে শুধু পুড়ে যাওয়ার শব্দ হয়?
কে মারে—
কে পরে থাকে পোস্টারে, ফুলে, স্ট্যাটাসে?
বেঁচে থাকতে দুশমন মৃত্যুর পরে লাশ হলে
কিংবা জেলে গেলে নেতা কিংবা খুন হলে কিংবদন্তি!
কার লাভে হাততালি,কার ক্ষতিতে নীরবতা?
কে ক্ষমতায় ওঠে,কে রাস্তায় শুয়ে পড়ে?
কার পকেট গরম,কার চেয়ারে আগুন—
আর কার বুক ঠান্ডা হয়ে যায়,মর্গের ফ্রিজে?
কে পোড়ায়,কে পুড়ে?কে মারে, কে মরে?
কার লাভ কার ক্ষতি?
কে যায় ক্ষমতায়
কে থাকে রাস্তায়,কার পকেট গরম,কার চেয়ার গরম!
বুক পাতা আবু সাইদ,নাকি চাঁচা ছোলা ডাইরেক্ট শহীদ ওসমান হাদি—
নাম কি আলাদা?
নাকি একই খেলার ভিন্ন নম্বরের ঘুঁটি?
কাল যারা টক শোতে হাদিকেই
উলঙ্গ করতে চেয়েছে,
শিখিয়েছে কথা বলা
আজ তারাই হাদির খুনের পরে
শপথের বুলি আউড়ায়।
রাজনীতি—আমি ঘৃণা করি
সবচেয়ে মারাত্মক দুর্নীতি,
কারণ এখানে খুনও যুক্তি খোঁজে।
ভালো থেকো হাদি,ওপারের দুনিয়ায়—
এপারে তোমাকে নিয়ে কত জনের দোকান খুলেছে!
তোমার রক্তে ভিজে কারা লাভের হিসাব লেখে,
আমি নির্বাক হয়ে দেখি।
গায়েবের মালিক আল্লাহ,
নাকি গায়েবই এখন মালিক?
কে খেলছে আসল খেলা—আমি জানি না।
আমি শুধু দেখি—সব দেখি,চুপ থাকি।
আর মাঝে মাঝে টুকটাক কিছু লিখে রাখি—
যেন এই নীরবতাই আমার অপরাধ,
আমার স্বীকারোক্তি,আমার শেষ প্রতিবাদ।
১৯-১২-২০২৫

