২৫৪ বার পড়া হয়েছে
শহর দেখতে গিয়ে
হুমায়ূন কবীর ঢালী
ব্যাঙা আর ব্যাঙি। দুই ব্যাঙ। দুই বন্ধু। ব্যাঙা নাদুস-নুদুস। ব্যাঙি হালকাপাতলা। ওরা বাস করে মিয়াবাড়ির পূবপাশের একটা ডোবার কাছে। ডোবার পশ্চিম পাড়ে বড়ো একটা বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের একটি গর্তে ওদের বাসা। মাঝেমধ্যে দরকার হলে বাসা থেকে বের হয়। ডোবায় নেমে গোসল করে। অন্য ব্যাঙের সাথে পানিতে ডুবসাঁতার খেলে। হইচই, ফূর্তি করে। ফের উঠে আসে নিজেদের বাসায়। একরকম সুখে-শান্তিতেই দিনযাপন করছে ওরা।
একদিন ওদের মনে শহর দেখার শখ জাগল। কী করে শহরে যাওয়া যায়? গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরে শহর। দুই কিলোমিটার পথ একদিনে পেরুনো সম্ভব। তবে কী করে, কোন পথে যাবে, এই নিয়ে দুইব্যাঙ কয়েকদিন ধরেই বুদ্ধি-পরামর্শ করছে। কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না।
দুটো পথে শহরে যাওয়া যায়। হয় পাকা সড়ক ধরে নয় মেঠোপথে।
গ্রাম থেকে দু’শ গজ পার হলেই পাকা সড়ক। তবে সড়ক পথে যাওয়ার ঝক্কি অনেক। বিপদের আশঙ্কা বেশি। গাড়ির নিচে চাপা পরে মরার ভয় আছে।
তাই ওরা মেঠোপথে যাওয়াই উত্তম মনে করল। মেঠোপথে ক্ষেতের আইল ধরে যেতে যেতে দু-একটা পোকামাকড় খেয়ে আহারাদির কাজটাও সেরে ফেলা যাবে। অবশ্য এ পথেও একটা সমস্যা, পথের মাঝামাঝি একটা পুরনো পরিত্যাক্ত বাড়ি আছে। তার পাশ ঘেষে যেতে হবে ওদের। বন্ধুবান্ধব ও লোকমুখে শুনেছে, পুরনো সেই বাড়িটায় গুইসাপ আর বিষধর সাপদের বাস। গুইসাপ কিংবা সাপেরা যদি টের পায় তার বাড়ির পাশ দিয়ে দুটো ব্যাঙ যাচ্ছে, রক্ষা নেই। গপ করে তাদের ধরে খেয়ে ফেলবে।
‘তাহলে কী করা? শহর দেখার চিন্তা কি বাদ দেবে?’ ব্যাঙি জানতে চাইল।
‘তা বাদ দেব কেন? এত ভয় পেলে বাঁচা যাবে না। যা হবার হবে। চলো, মেঠোপথেই রওনা দেই।’ ব্যাঙা সাহসের কথা শোনাল।
‘ঠিক আছে, তুমি যখন সাহস দিচ্ছ, আমার যেতে আপত্তি নেই।’ ভরসা খুঁজে পেল ব্যাঙি।
পরদিন সকালে ব্যাঙা আর ব্যাঙি ডোবায় গোসল সেরে রওনা দিল শহরের উদ্দেশে। ব্যাঙা সামনে, পেছনে পেছনে ব্যাঙি। বৈশাখের খরতাপ চলছে। তাপমাত্রা চল্লিশের কোঠায়। এমন তাপে বিলে কেন, ডোবায়ও টিকে থাকা দায়। এরপরও দমে গেলে চলবে না। এগোতে হবে। কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে। তাদের মিলবে শহর। আহারে শহরে না জানি কী মজা আর আনন্দ অপেক্ষা করছে! কোনওরকমে বিলটা পার হতে পারলেই হয়। এরপর আর কদ্দুর? কয়েকলাফে পার হয়ে যাবে বাকি পথ।
ওরা ক্ষেতের আইল ধরে যে বিলটা পেরোচ্ছে; বিল জুড়ে ইরিধানের পাথার। দুএকটা ধানক্ষেতে পানি জমে আছে। গরম সইতে না পারলে টুপ করে পানিতে নেমে পড়বে।
অনেকক্ষণ চলার পর ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ক্ষুধাও পেল। জিরিয়ে নেয়া দরকার। একটা ধানক্ষেতের কোণায় বসল ওরা। এসময় ব্যাঙার সামনে একটা ঘাসফড়িং কোত্থেকে এসে লাফিয়ে পড়ল। ব্যাঙার জিবে পানি এসে গেল। কী দারুণ! কতদিন হয় এমন শিকার মিলে না! ক্ষুধাটাও পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠেছে। শিকারটাকে হাতছাড়া করা যাবে না। দেরি না করে ব্যাঙা ঘাসফড়িংটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু কাজ হলো না। যথাসময়ে ঘাসফড়িং সটকে পড়ল। শরীরের ভার সামলাতে না পেরে ব্যাঙা ঝপাং করে ধানক্ষেতের পানিতে আছড়ে পড়ল।
ব্যাঙার অবস্থা দেখে ব্যাঙি হেসে উঠল।
‘হাসবে না কিন্তু। মেজাজ খুব খারাপ।’ ধানক্ষেত থেকে বলল ব্যাঙা।
ব্যাঙি বুঝতে পারল ব্যাঙা এখন ঘাসফড়িংয়ের রাগ তার উপর ঝাড়বে।
ব্যাঙি হাসি চেপে রাখল। বলল, Ôতুমি কি পানিতেই বসে থাকবে, নাকি উপরে উঠে আসবে?’
‘ভাবছি, যা গরম পড়েছে, পানিতে একটু শরীরটা ঠাণ্ডা করে নেই।’
তাই তো! আমিও নামছি না কেন তাহলে!’
ঝুপ করে পানিতে নেমে গেল ব্যাঙিও।
‘ঘাসফড়িংটাকে ধন্যবাদ।’ ব্যাঙা বলল।
‘ঘাসফড়িংকে কেন ধন্যবাদ দিচ্ছ? ওর জন্য তুমি এখানে আছড়ে পড়লে।’
‘আছড়ে পড়ে কি খারাপ হলো? পানিতে কি ভালো লাগছে না তোমার?’
‘তা লাগছে।’
‘এই জন্যই ঘাসফড়িংকে ধন্যবাদ দিলাম।’
‘তুমি একা দেবে কেন। ধন্যবাদ আমার পক্ষ থেকেও।’
কিছুসময় ওরা ধানক্ষেতের পানিতে ডুবে রইল। বিকেল হয়ে এল। শরীরটাও ঠাণ্ডা হল। ওরা উঠে এল ক্ষেতের আইলে। ফের সামনের দিকে থপ থপ করে এগোতে শুরু করল। একসময় বিল পেরিয়ে পরিত্যক্ত বাড়িটার কাছে চলে এল ওরা। যাক, ভালোয় ভালোয় বাড়িটা পেরোতে পারলেই হয়!
‘এই ব্যাঙি, একটু জোরে পা চালাও।’ ব্যাঙা তাড়া দিলো।
‘আমার কথা ভাবতে হবে না। তুমি সতর্ক থেক। শত্র“র গন্ধ পাচ্ছি।’
হ্যাঁ, আমার কাছেও তাই মনে হচ্ছে। এগুনো ঠিক হবে না।’
দুই বন্ধু চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে একজায়গায় চুপচাপ বসল।
ওদের আশংকাই সত্যি হল। ওরা দেখতে পেল, ওদের পথের পাশে একটা বিষধর গোখরো ফণা তুলে বসে আছে।
ওরে বাপরে! ব্যাঙা আর ব্যাঙি দে ছুট। বড় বড় লাফ দিয়ে ডানদিকের একটা মরিচ ক্ষেতে ঢুকল ওরা। কিছুদূর এগিয়ে পেছনের দিকে তাকাল। বুঝতে পারল সাপটা ওদের তাড়া করছে না। যাক, বাঁচা গেল।
বা দিকে আর নয়। ওরা ডানদিকের কোনো রাস্তা খুঁজতে শুরু করল। পেয়েও গেল একটা রাস্তা। মরিচ ক্ষেতের আইল ধরে এগোতে শুরু করল। থামল কিছুদূর গিয়ে।
‘তুমি কি এখান থেকে শহরটা দেখতে পাচ্ছ? আমরা সম্ভবত শহরের কাছাকাছি চলে এসেছি।’ ব্যাঙা জানতে চাইল।
ব্যাঙি বলল, ‘মোটেও না। আমি শুধু তোমার পিঠটাই দেখতে পাচ্ছি।’
‘আরে কী বলছ! আমি নাহয় একটু মোটাসোটা হয়ে গেছি। বেশি লাফাতে পারছি না। তুমি তো একটু জোরে লাফিয়ে শহরটা দেখতে পার।’
ব্যাঙি লাফিয়ে শহর দেখার চেষ্টা করল।
‘কী দেখতে পেলে?’
‘হ্যাঁ, দেখেছি। তবে শহর না। আমাদের গ্রামটাই দেখা যাচ্ছে।’
‘তার মানে, আমরা এখনো গ্রামের কাছেই রয়ে গেছি?’
ওরা আবার চলতে শুরু করল। অনেকক্ষণ পর ব্যাঙির কাছে ব্যাঙা জানতে চাইল, ‘এখন শহরটা দেখা যায় কিনা, একটু দেখবে?’
‘কেন নয়, এক্ষুণি দেখছি।’ ব্যাঙি লাফিয়ে শহর দেখার চেষ্টা করল। এবার শহরটাকে দেখল সে।
‘আরে এ যে দেখছি দারুন ব্যাপার-স্যাপার! কত সুন্দর সুন্দর বিল্ডিং!’
‘তাই নাকি? ইস্ মোটা হবার যত জ্বালা। দূর থেকে একটু শহরটা দেখব, তাও কপালে জুটল না। যাক, আর সামান্য পথ। এরপর কাছে থেকেই শহরটা ভালো করে দেখব।’
‘তুমি বুঝি একাই দেখবে। আমি দেখব না বুঝি!’ ব্যাঙি অভিমানভরে বলল।
‘না তা হবে কেন। দু’বন্ধুই দেখব।’
কথা বলতে বলতে ওরা এগিয়ে গেল শহরের খুব কাছাকাছি। এখান থেকে না লাফিয়েই শহর দেখা যায়।
‘কী সুন্দর শহর! ভাগ্যিস শহর দেখার ইচ্ছেটা হয়েছিল। না হলে এমন সুন্দর শহরটা না দেখেই মরতে হতো।’ ব্যাঙা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল।
‘এসব কথা এখন বাদ দাও। চলো, এগিয়ে যাই। এদিকে গাছগাছালি কম। শহরে পৌঁছতে বেশি সময় লাগবে না।’ ব্যাঙি বলল।
ওরা আর এগোতে পারল না। উপর থেকে একটা চিল ওদের ছোঁ মারল। তবে যথাসময়ে লাফিয়ে একটা ধুতরা গাছের আড়ালে আশ্রয় নেয়ায় প্রাণে বেঁচে গেল।
ভয়ে কাঁপছে দুই বন্ধু। সেইসাথে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে চিলটার উপর। শিকার লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় মেজাজ দেখাতে শুরু করেছে চিলটা। শূন্যে পাক খেয়ে একবার মাটির কাছাকাছি নামছে, আবার উড়ে যাচ্ছে দূর উপরে। উপর থেকে ওদের খুঁজছে। ওরা আরও আড়ালে যাওয়ার চেষ্টা করল। পারল না। ব্যাঙা উঁকি দিয়ে দেখল আশেপাশে কোথাও নিরাপদ যায়গা আছে কিনা। না, ওদের গ্রামের মতো এখানে তেমন নিরাপদ জায়গা নেই।
তবে চিলটাকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না। এখনই ওদের এগিয়ে যেতে হবে। দেরি করা ঠিক হবে না।
‘চলো, সামনে যাই।’
ব্যাঙা লাফিয়ে সামনের একটা গাছের আড়ালে লুকাল। সে একাই গেল। ব্যাঙি পড়ে রইল আগের জায়গাতেই। সে চেচিঁয়ে ডাকল ব্যাঙিকে।
‘কী ব্যাপার, তুমি আসছ না কেন?’
‘আমি তো লাফাতে পারছি না। আমার ডান পা কেটে গেছে। রক্ত ঝরছে। সম্ভবত, চিলটা আমাকে নিতে না পারলেও ওর নখের আঁচড়ে আহত করে গেছে।’
‘কী বলছ তুমি?’
‘হ্যাঁ, খুব ব্যথা করছে। আমাকে বাঁচাও বন্ধু।’
ব্যাঙা একমুহূর্ত দেরি না করে ব্যাঙির কাছে ছুটে গেল। ব্যাঙির অবস্থা দেখে মনে মনে খুব আহত হলো। ভাগ্যিস চিলটার ছোঁ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। নয়ত বন্ধুকে আজ হারাতে হতো। কেন যে শহর দেখার স্বাদ হল! সে যাক, এখন বন্ধুকে সেবা দিয়ে ভালো করে তুলতে হবে।
‘বন্ধু, কষ্ট হলেও তুমি একটু ধৈর্য ধরো। আমি দেখছি, কোথাও ওষুধ পাওয়া যায় কি-না?’
গ্রামের মতো এখানে লতাপাতা তেমন নেই। লতাপাতা না থাকলে ওষুধ পাবে কোত্থেকে! তবুও ওষুধের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল ব্যাঙা। একটু পরেই ফিরে এল ওষুধ নিয়ে। ওষুধ বলতে একটা বুনোলতা। এটার রস কাটা ঘায়ে লাগিয়ে দিতে হবে। দেরি না করে তাই করল ব্যাঙা। এরপর ব্যাঙিকে বলল, ‘তুমি সুস্থ্য না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে। জায়গাটাও আমাদের জন্য মোটামুটি নিরাপদ।’
‘না, মোটেও নিরাপদ নয়। তুমি যখন ওষুধ আনতে গিয়েছিলে একটা বেজিকে ছুটে যেতে দেখেছি।’ ব্যাঙি বলল।
‘বলো কী! তাহলে এখানে আর এক মুহূর্তও দেরি করা ঠিক হবে না।’ ব্যাঙা আশঙ্কা প্রকাশ করল।
‘কিন্তু আমি তো লাফাতে পারবো না।’
‘তাই তো! এখন কী করা বন্ধু? একটা উপায় তো বের করতেই হবে।’
‘আমি কোনও উপায় দেখছি না। তুমি নাহয় শহরটা দেখে এসো। আমি এখানেই থাকি।’
‘মোটেও না। আমরা না বন্ধু? মরতে হয় দুজনেই মরবো। তবুও তোমাকে বিপদে ফেলে রেখে শহর দেখা তো দূরে থাক, এক পাও নড়ছি না।’ এরপর ব্যাঙা কী যেন ভাবল। ভেবে বলল, Ôআমি একটা বুদ্ধি পেয়েছি।’
‘বুদ্ধিটা কী বলো।’
‘তুমি আমার পিঠে চড়ে বসবে।’
‘তারপর?’
‘তারপর আমরা শহরে চলে যাবো।’
‘তুমি আমার ভার বইতে পারবে তো?’
‘এমনি এমনি কি শরীরটাকে নাদুস নুদুস বানিয়েছি। তোমার মতো টিঙটিঙে ব্যাঙিকে বয়ে নিতে আমার মোটেও কষ্ট হবে না। তাড়াতাড়ি আমার পিঠে উঠে পড়ো।’
ব্যাঙার পিঠে বসল ব্যাঙি। ব্যাঙা থপথপ করে এগিয়ে গেল শহরের দিকে। ব্যাঙা ভেবেছিল বন্ধুকে পিঠে নিয়ে একটু কষ্ট হবে। কিন্তু তার মোটেও কষ্ট হচ্ছে না। বন্ধুর ভার যে কষ্টকর নয়, আজই প্রথম বুঝতে পারল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা শহরের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেল।
শহরে ঢুকতেই বড়ো একটা ডোবা। ডোবাটা পেরুলেই শহর। এরপর আনন্দ আর আনন্দ! ঘুরে ঘুরে দু’বন্ধু শহর দেখবে। বসবাসের একটা জায়গা পেয়ে গেলে দরকার হয় শহরেই থেকে যাবে। বাকি জীবনটা শহরেই কাটিয়ে দেবে।
ব্যাঙার পিঠ থেকে নেমে এল ব্যাঙি। তার ব্যাথাটা আগের চেয়ে অনেক কম। তবে এখনই পানিতে নামা ঠিক হবে না। ব্যাঙাকেও বলল সে কথা। ব্যাঙার তর সইছে না শহর দেখার জন্য। কিন্তু বন্ধুকে কষ্টে রেখে কোনো আনন্দ আর আনন্দ থাকে না। তারা একটা গাছের আড়াল খুঁজল। পেয়েও গেল। ঝোপাল ধুতরাগাছ। তার নিচে গিয়ে দুজন বসল।
‘যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে না উঠবে, এখান থেকে নড়ছি না।’ ব্যাঙা বলল।
‘আশা করছি খুব শিগগির সেরে ওঠব। এখন আর আগের মতো ব্যথাটা নেই।’
‘তাহলে তো ভালোই হল। তুমি বসো এখানে। আমার প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে। দেখি কোথাও খাবার জোটে কিনা।’
ব্যাঙা বেরিয়ে গেল। ঘুরে ঘুরে পোকামাকড় যা পেল খেয়ে নিল। ফেরার পথে ব্যাঙির জন্যও নিয়ে এল।
‘ধন্যবাদ বন্ধু।’ খেতে খেতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল ব্যাঙি।
খেয়েদেয়ে দুজন বিশ্রাম নিল। বিকেল হলে একসময় ডোবায় ঝাঁপ দিলো দু’বন্ধু। ডোবার পানি খুব নোংরা। কিন্তু শহর দেখার স্বপ্নে ওরা এতোটাই বিভোর যে, চারপাশের সব অস্বাভাবিক ওদের কাছে এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
ওরা সাঁতার কেটে এগোচ্ছে। অল্পসময়ের মধ্যেই ওরা ডোবার অন্যপ্রান্তে পৌঁছে গেল। এখন তীরে ওঠলেই শহর।
কিন্তু তীরে ওঠার আগেই কোত্থেকে এক কোলাব্যাঙ এসে ওদের পথরোধ করল।
‘থামুন। থামুন নতুন অতিথিদ্বয়।’
ভারি গলা শুনে চমকে ওঠল ব্যাঙা ব্যাঙি। ওরা থেমে গেল।
‘আপনারা কোত্থেকে এসেছেন?’
‘গ্রাম থেকে।’
‘কেন এসেছেন?’
‘শহর দেখব।’
‘না, আপনারা শহর দেখবেন না।’
‘কীসব বাজে বকছেন। শহর দেখার আশায় কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে জানেন? ব্যাঙি তো মরেই গিয়েছিল চিলের ছোঁয়ে।’ ব্যাঙা বলল।
‘কিন্তু আপনারা কি জানেন শহরে বিপদ আরো বেশি? আপনাদের মতো আমি আর আমার বন্ধু শহর দেখতে এসেছিলাম।’
‘দেখেছেন?’
‘দেখব কোত্থেকে? দেখছেন না আমি একা!’
‘হ্যাঁ, তাই তো! আপনার বন্ধু কি শহর দেখতে গিয়েছেন?’
‘আমরা দুবন্ধু শহরে উঠেছিলাম। কিন্তু একটা মানুষ আমার বন্ধুটাকে ধরে নিয়ে গেছে। আমি দ্রুত পালিয়ে এসে বেঁচে গেছি। সেই থেকে এই ডোবায়ই আছি। প্রথম প্রথম এমন নোংরা ডোবায় থাকতে খুব কষ্ট হতো। এখন সয়ে গেছে। ভেবেছিলাম গ্রামে ফিরে যাবো। কিন্তু বন্ধুর কথা মনে পড়লে আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না। দু’বন্ধু এসে একা ফিরে যাব?’
‘বলেন কী! কিন্তু আমরা দুবন্ধুও তো শহরে ঢুকতে চাই।’
‘এই ভুল করবেন না। এখানে আমাদের শত্র“ সাপ, গুইসাপ এসব প্রায় নেই, এটা ঠিক। তবে শহরের মানুষরা বেশি বিপজ্জনক। প্লিজ, গ্রামে ফিরে যান।’
কোলাব্যাঙের কথা শুনে ভাবনায় পড়ল ব্যাঙা ব্যাঙি। কী করবে এখন?
ব্যাঙি বলল, ‘দাদা যখন বলছেন চলো গ্রামে ফিরে যাই। আমি তোমাকে হারাতে পারব না। শহর দেখার চেয়ে তুমি আমার কাছে অনেক বড়ো আনন্দের।’
‘ঠিকই বলেছ। আমরা কেউ কাউকে হারাতে চাই না।’ ব্যাঙা বলল।
‘দাদা, তাহলে আপনিও চলুন আমাদের সাথে। এখানে একা একা থেকে আর কী করবেন। বরং মানুষের হাতে ধরা পড়ার ভয় আছে।’
‘না বোন, আমি এখানেই থাকব। হারানো বন্ধুর কথা ভেবে ভেবে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব।’
ব্যাঙা বলল, ‘ঠিক আছে। প্রার্থনা করি আপনি ভালো থাকেন। ব্যাঙি, চলো ফিরে যাই। যে শহরে বেঁচে থাকাই সমস্যা, সেখানে আনন্দ করা যায় না।’
এরপর ব্যাঙা আর ব্যাঙি শহরে না গিয়ে গ্রামের পথে পা বাড়াল। শহর দেখে আর কাজ নেই, বাবা।
তারা ফিরে গেল সেই বাঁশঝাড়ে। নিজেদের বাড়িতে।
১ Comment
very good job; congratulations.