২৫৭ বার পড়া হয়েছে
একজন আরাধ্যার জন্ম
রেশমা আক্তার
পর্ব-১
হাইওয়েতে শাঁ শাঁ করে ঘন্টা দুয়েক ছুটে শহরের কাছাকাছি এসে মন্থর হলো অরুদের গাড়িটা। বিভাগীয় শহরের বাইরে, একটা নিরিবিলি জায়গায়, গতকাল অরু তার বন্ধু তোহার আয়োজিত এক জমকালো বার্থডে পার্টিতে এটেন্ড করতে গিয়েছিলো। জায়গাটা একটা খামারবাড়ির মতো। তোহার বাবার শখের বানানো বাংলো।
সারারাত তুমুল হৈ চৈ, আনন্দ উৎসব শেষে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলো তারা। অতিথিদের রাতে থাকার ব্যবস্থা ছিলো, এমনকি আজকেও সারাদিনব্যাপী তাদের নানান আয়োজন, পরিকল্পনা। কিন্তু সকাল ন’টা নাগাদ অরুদের ড্রাইভার মমিন, গিয়ে উপস্থিত। কে কখন ফিরবে জানতো না অরু, তবে তাকে যে তখনই ফিরতে হবে সেটা জানতো সে।
অরু স্বনামধন্য ব্যারিস্টার তানভীর চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে। সে এ লেভেল শেষ করেছে।
বিদেশে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া চলছে তার। দু’এক মাসের মধ্যেই চলে যাবে সে, গোছগাছ চলছে। দেশ ছেড়ে যাবার আগে বন্ধুদের সাথে একটা রাত থাকার অনুরোধ জানিয়েছিলো অরু তার বাবার কাছে। শুধুমাত্র এ কারণেই এই বার্থডে পার্টিতে যাবার অনুমতি মিলেছিলো তার। তাও গতকাল সন্ধ্যা থেকে মেয়েকে এ পর্যন্ত কয়েক দফা ফোন দেয়া হয়ে গেছে তানভীর চৌধুরীর। অরু জানে, গতকাল তার বাবা মা নির্ঘাত তার চিন্তায় নির্ঘুম রাত্রিযাপন করেছে।
ড্রাইভার মমিন গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো বাইরে। অরু, তোহা আর তার পরিবারের কাছ থেকে যখন বিদায় নিচ্ছিলো, বেশীরভাগ বন্ধুরা তখনও ঘুমিয়ে। গাড়িতে ওঠার সময় দেখলো, সারা আর জিমি, তার গাড়িতে লিফট নেয়ার জন্য তার আগেই তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অরু ভাবলো, এ ভালোই হলো, এতটা পথ একা একা যেতে হবে না তাকে।
ওয়েস্টার্ন পোশাকে, তাদের তিনজনের পিঠেই ব্যাগ। মমিন ব্যাগগুলো নিয়ে গাড়ির ডিকিতে রাখছিলো। অরুর ইচ্ছে ছিলো সামনে বসবে, কিন্তু দুই বন্ধুকে পেছনে রেখে সেটা করতে পারলো না । অগত্যা তিনজনই পেছনে বসলো।
গাড়িতে উঠে পেছনের সিটে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়লো তারা । অরু মাঝখানে, দু’পাশের দু’জন ঢুলতে ঢুলতে একসময় অরুর কাঁধেই মাথা হেলিয়ে ঢলে পড়লো। ঘন্টা দুই পর তারা শহরের কাছাকাছি চলে এলো। পথঘাট এখনও ফাঁকা, লোকজন কম। হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে গাড়িটা তীব্র ব্রেক করে থেমে গেলো। তিনজনই চোখ খুলে ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে উঠলো
– কী হয়েছে… কী হয়েছে আঙ্কেল?
মধ্যবয়সী ড্রাইভার মমিনের গলায় খানিকটা বিরক্তি। সে এখন তাকিয়ে আছে সামনে, রাস্তায়। একটা জুবুথুবু পাগলীর পিছু নিয়েছিলো চার পাঁচটা ছোট ছোট ছেলে মেয়ে। কেউ ঢিল মেরে, কেউ লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে উত্তক্ত করছিলো তাকে। পাগলী তাদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতেই হয়তো রাস্তার মাঝখান দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিলো। কিন্তু পথের মাঝখানে ঢালু জায়গায় জমা হওয়া পানিতে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলো সে। গাড়ি ব্রেক না করলে দুর্ঘটনা ঘটতো নির্ঘাত। মমিন সহ সামনের দিকে উঁকি দিয়ে দেখছিলো তারা সবাই। কাঁদা মাখামাখি হয়ে পাগলী আর সহজে উঠতে পারছিলো না তখন।
এমন সময় গাড়ির পেছনের দরজা খুলে গেলো। ড্রাইভার মমিন তটস্থ হলো, বলল
– আপনারা নামলেন কেন? ভেতরে গিয়া বসেন, আমি দেখতেছি।
ড্রাইভারের কথা শুনলো না অরু। তার হাতে ছোট্ট একটা পানির বোতল। ড্রাইভার নামার আগেই সে এগিয়ে গেলো সামনে।
সাথে সারা আর জিমিও।
মমিন, অরুদের পুরোনো ড্রাইভার। গাড়ি থেকে নামতে নামতে সে মহা বিরক্ত। আজকালকার ছেলেমেয়েগুলোর সবকিছুতে অতিরিক্ত কৌতূহল। আরে গাড়ির সামনে একটা পাগল এসে পড়েছে, এটা তোদের দেখার কী আছে? তোরা বসে ছিলি, বসে থাক। সে একটা লাঠি দিয়ে তাড়া দিলেইতো পাগলী বাপ বাপ করে পালাবে।
ততক্ষণে অরু গিয়ে পাগলীটার হাত দুয়েক দূরে থমকে দাঁড়িয়েছে। পাগলীটা নিজের লম্বা, ঢোলা কাপড়চোপড় নিয়ে জুবুথুবু, সে বসে আছে অন্যদিকে মুখ করে । সম্ভবত সে তার পায়ে খুব ব্যাথা পেয়েছে। নিচু হয়ে নিজের পায়ে হাত বোলাচ্ছে আর ক্ষীণ স্বরে কাতরাচ্ছে।
মমিনের হাতের লাঠির তাড়া খেয়ে ইতিমধ্যে ছেলেমেয়েগুলো একটু দূরে সরে গিয়েছে।
অরু এবার একটু ঝুঁকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো
– এক্সকিউজ মি, আর ইউ হার্ট সামহয়্যার?
পেছন থেকে মমিন বলল
– আম্মাজী, পাগলে ইংরেজি বুজবে না, বাংলায় বলেন…
সারা আর জিমি হি হি হি করে হাসছে। অরু নিজের ভুল বুঝতে পেরে গম্ভীর হলো। সে আরেকটু ঝুঁকে পানির বোতলটা এগিয়ে ধরলো…
– এই যে, আপনি কী একটু পানি খাবেন…?
মমিন চরম বিরক্ত। তার ধারণা বড়লোকের বাচ্চাকাচ্চাগুলা চূড়ান্ত নির্বোধ প্রকৃতির। এদের কিছু বুঝিয়েও লাভ নেই। রাস্তার একটা পাগলকে ব্যারিস্টার সাহেবের এ লেভেল পড়া মেয়ে জিজ্ঞাসা করছে “এক্সকিউজ মি, আপনি একটু পানি খাবেন?” এই হইলো ইংরেজি শিক্ষার ফলাফল। আর কী দেখার বাকি আছে মমিনের এই জীবনে?
অরুর ডাকে সামান্য মাথা ঘোরালো পাগলী। কিন্তু তার মুখ দেখা গেলো না। মাথাভর্তি তামাটে কোকড়ানো চুলের গোছা এসে পড়েছে তার মুখের ওপর। তবে এবার তার হলদেটে গায়ের রঙের কিছুটা আভাস পাওয়া গেলো।
কৌতূহলী সারা আর জিমি অরুর ঠিক পেছনেই উঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের পেছনে মমিনও এবার উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলো।
অরু জিজ্ঞেস করলো
– আপনি কী একা উঠতে পারবেন?
পাগলীর এ কথায় কোনো ভাবান্তর হলো না। অরু জানতে চাইলো
– ডু ইউ নিড হেল্প?
পেছনে আবারও খিলখিল হাসি। মমিন মহা বিরক্ত। সে বলল
– অনেক হইছে। আম্মাজীরা, এবার আপনারা গাড়িতে গিয়া বসেন। আমি লাঠি দেখাইলে সে লাফ দিয়া উইঠা দাঁড়াবে। শুধু দাঁড়াবে না, দৌড়ে কূল পাবে না। এইবার দেখন আমার লাঠির তেলেছমাতি…
পাগলীটা এবার পুরোপুরি মুখ ঘোরালো। তার মুখের ওপর থেকে অবিন্যস্ত চুলগুলোও সরে গেলো। ফর্সা গায়ের রঙটা দীর্ঘদিন রোদে পুড়ে যেন জায়গায় জায়গায় বাদামী ছোপ ছোপ পড়েছে। চিকন জোড়া ভ্রু যুগল কপালের মাঝখানে এসে সন্ধি করেছে যেন। ঢলঢলে দুটি চোখের দৃষ্টি কুঞ্চিত, স্বন্দিহান। চিবুকের মাঝ বরাবর একটা গাঢ় তিল।
পাগলীর মুখের দিকে তাকিয়ে সারা আর জিমি এবার বিস্মিত। তারা সমস্বরে ‘ওয়াও’ শব্দ করে নিজেদের মাঝে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো এবং কিছুটা পিছু হটে এলো। বিস্মিত মমিনও। তার কপালও কুচকে আছে কিছুটা। কিন্তু অরু একটুও নড়লো না। গভীর, নিস্পলক চোখে সে তাকিয়ে ছিলো পাগলীর মুখের দিকে।
বিমূঢ় দৃষ্টিতে পাগলিও বুঝি অরুকে দেখলো খানিক, তারপর আড়মোড়া দিয়ে উঠে খপ করে পানির বোতলটা কেড়ে নিয়ে ছুটে চলে গেলো সামনে।
পাগলী দৌড়াচ্ছিলো আলুথালু পায়ে। তার গায়ে একটা ছেড়া, লম্বা, ঢোলা পোশাক। কিন্তু কিছুদূর যেতেই ছেলেমেয়েগুলো আবারও তার পিছু নিলো। আস্তে আস্তে তাদের দলটা দূর থেকে আরও দূরে চলে যেতে যেতে অদৃশ্য হলো।
অরুদের গাড়িটা এখন শহরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আরোহীরা এখন কেউ কোনো কথা বলছে না। অরু এবারও পেছনের সিটে, জিমি আর সারার মাঝখানে বসলো। তার চোখগুলো স্থির, মুখটা থমথম করছে। পাশের দুজনও চুপচাপ। অরু কেমন ঘোরলাগা গলায় বলল
– গাইজ, আর ইউ থিঙ্কিং হোয়াট আ’ম থিঙ্কিং ?
দুপাশের দুজনই গম্ভীর, সমস্বরে বলল
– হুম..
– হোয়াট ইজ ইট..?
একটু নীরবতা। সারা গম্ভীর গলায় বলল
– ইয়ে মানে… তোকে… দেখতে……. একদম ওই পাগলীটার মতো..!
আরও একটু নীরবতা। তারপর দুপাশের দুজনই খিলখিল হাসিতে লুটিয়ে পড়লো।
অরু এই কৌতুকে কেন যেন হাসতে পারলো না। সে তখনও স্থির ও গম্ভীর।
– স্টুপিড। ইউ নো… পৃথিবীতে একই রকম দেখতে দু’জন করে মানুষ আছে, আমার বাবা বলেছে। ইউ বেটার নো, আমার বাবা কখনই মিথ্যে বলে না।
সারা আর জিমি হাসি থামানোর চেষ্টা করছে। সারা বলল
– দ্যাট ওয়াজ ভেরি ইন্টারেস্টিং। বাট, একেবারে তোর মতন দেখতে একটা পাগলী, ব্যাপারটা ফানি, না…? হি হি হি…
জিমি বলল
– ডুড সিরিয়াসলি, তোদের দু’জনার চিবুকের তিলটা কিন্তু একদম পারফেক্টলি পয়েন্টেড। হাউ ইজ ইট পসিবল? আর কার্লি হেয়ার? আই থিঙ্ক, তুই ভ্রু প্লাক না করলে তোর ভ্রু গুলোও অমনই হতো, হাউ স্ট্রেঞ্জ…! একটা রাস্তার পাগলীর সাথে আরাধ্যা চৌধুরীর চেহারার হুবহু মিল…?
গাড়িটা থেমেছিলো সারাদের গেটে। সারা নেমে বিদায় নিয়েছিলো। উঁকি দেয়ে অরুকে বলে গেলো
– ইট ওয়াজ অল বাট ফান ডার্লিং, ডোন্ট মাইন্ড। আই’ল কল ইউ… বাই…
আর একটু এগিয়ে জিমিও কি কি যেন বলে নেমে গেলো।
মিউজিক প্লেয়ারে বেয়া মিলার গাইছে। গাড়িতে হাই ভলিউম মিউজিক শোনা অভ্যেস অরুর, মমিন জানে। বাকিটা পথ একা একা অরুর যেন খারাপ না লাগে, অভিজ্ঞ মমিনের খেয়াল আছে সেদিকে। অরু তখন চোখ বন্ধ করে ভাবছিলো অন্যকিছু। তার বন্ধ চোখের পাতায় অবিকল তার মত দেখতে মধ্যবয়সী এক পাগলীনী। একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকা তাদের দু’ একটা মিনিট।
একটু আগে তার জীবনে এই চরম বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটে গেছে। অবিকল তার মত দেখতে একটা মানুষ এবং তারা দুজনেই মুখোমুখি। একে অপরের চোখে চোখ রেখে কিছুটা সময়। আচ্ছা অরুর কী ওকে একটুখানি ছুঁয়ে দেখা উচিত ছিলো?
কী অদ্ভূত! একই রকম দেখতে তারা দু’টি মানুষ, কেমন হত সে ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি?
গাড়ির হর্ণে চোখ খুলল অরু। বিশাল বাগানের মাঝখান দিয়ে গাড়িটা ঢুকলো। দোতালার খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে তার মা, রুবিনা চৌধুরী। তার মুখ হাসিহাসি। অরু গাড়ি থেকে নেমে হাত নাড়লো মায়ের দিকে। মেয়েকে ধরতেই বুঝি রুবিনা ভেতরে চলে গেলো। অরুও দৌড়ে চলে গেলো বাড়ির ভেতরে।
অরুদের বাড়িটা দুই তরফের। তানভীর চৌধুরর বড় ভাই এনামুল চৌধুরীও তার পরিবার নিয়ে থাকেন এখানে। এনামুলের এক ছেলে এক মেয়ে, তারা অরুর বয়োজৈষ্ঠ। এনামুলের স্ত্রী, তমাকে অরু বড় আম্মু সম্বোধন করে।
অরুর এ বাড়িতে এক রাতের অনুপস্থিতি এবং সকাল বেলার এই প্রত্যাবর্তন পুরো পরিবারের জন্য যেন এক বিশাল ঘটনা। বাড়ির ভেতরে, উঠোনের খোলা চত্বরে অরুকে দেখতে সবাই জটলা করেছে। অরু একে একে সবার প্রশ্নের জবাব ও এক রাতে তাদের জমা হওয়া আদরের ভারে আপাতত দিশেহারা। এক রাতের অনিয়মে, তার শরীরে কী কী ক্ষতি হয়ে গেছে তাই খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে আর বলাবলি করছে সবাই। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে যে কাজটা এখন তাকে করতে হবে তা হলো, বাবাকে ফোন করে তার ফেরার খবরটা জানাতে হবে।
ফোন ইতিমধ্যে চলে এসেছে। তার ডাক পড়লো ভেতর বাড়ি। অরু দৌড়ে ভেতরে চলে গেলো। সেখানে রিসিভার হাতে দাঁড়িয়ে ছিলো মা। অরু প্রায় কেড়ে নিলো রিসিভার। আহ্লাদী গলায় বলল
– হ্যালো পাপা…
– হ্যালো মাই সুইটহার্ট… মাই বেবি…মাই জান…
– পাপা, তুমি কখন ফিরবে?
– আজ অনেক রাত হবে মাম্মা…। গতরাতে তোমার ঘুম হয়েছিলো? খুব হৈচৈ করেছো তাই না?। সো, নাউ ইউ নিড এ লং স্লিপ…।
– ওহ নো পাপা, আ’ম এবসিলিউটলি ফাইন
– নো নো ডিয়ার। আমি যেন শুনি, তুমি এখন ফ্রেশ হয়ে একটা লম্বা ঘুম দিয়েছো। আর কোন কথা শুনতে চাই না। গিভ মি এ হাম্ব এন্ড গো…
অরু অপ্রসন্ন মুখে তার পাপাকে হাম্ব দিলো এবং ফোন রেখে দোতলায় নিজের ঘরে চলে গেলো।
অরু শাওয়ার নিলো। মিউজিক প্লেয়ারে এ্যালেন ওয়াকার চলছে। মোটা টাওয়েল জড়িয়ে নিজের বিলাসবহুল ঘরের আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ নিজেকে দেখলো। মুখটা আয়নার কাছাকাছি এনে হঠাৎ তার চোখদুটো স্থির হয়ে গেলো। নিশ্চল চোখে নিজের আঙুল দিয়ে চিবুকের তিলটা স্পর্শ করলো। বিস্ময়ভরা চোখে নিজেকে দেখলো খুটিয়ে খুটিয়ে। মনে মনে চলল তুলনা, এক উন্মাদিনী মধ্যবয়সীনী, যার চিবুকে ঠিক এমনিই একটা তিল, কার্লি হেয়ার, চিকন জোড়া ভ্রু… এমন কি ঠোঁটগুলোও…
পারদিন সকালে নাশতার টেবিলে অরু বসেছিলো তার বাবা মার সাথে । পাপার সাথে কাল দেখা হয়নি তার। গভীর রাতে ফিরে অরুর ঘরে গিয়েছিলো তানভীর। মেয়ের কপালে আদর দিয়ে , হিম শীতল ঘরের এসিটা খানিক কমিয়ে দিয়ে, অরুর গায়ের চাদরটা ঠিক করে দিয়ে এসেছিলো। এটা সে প্রায় প্রতি রাতেই করে।
খাবার টেবিলে টুকটাক কথা হলো তাদের। তবে অরুকে কেমন অন্যমনষ্ক লাগছিলো। সে খাবারে তেমন মনোযোগী ছিলো না। রুবিনা তাড়া দিলো
– কী হলো, ঠিকমতো খাও….
তানভীর খেয়াল করলো, বলল
– একটা রাতের অনিয়ম তোমাকে এক সপ্তাহ ভোগাবে, দেখো…
অরু বিরক্ত মুখে বলল
– পাপা, আমি একদম ঠিক আছি।
অরু খানিকটা খাবার মুখে দিয়ে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো
– আচ্ছা মম্ , আমি কার মতো দেখতে হয়েছি?
রুবিনা বলল
– মানে…?
– মানে, সবাইতো পরিবারের কোরো না কারো মতো দেখতে হয়…। তুমিইতো বলো, সুহা আপু ওর বাবার মতো দেখতে, সাকি ভাইয়া বড় আম্মুর মত দেখতে…। সো, আমিও নিশ্চই কারো না কারো মতো দেখতে হয়েছি…তাই না?
হো হো করে হেসে উঠলো তানভীর, বলল
– ও এই কথা…? দেখো ব্যাপারটা তো সম্পূর্ণ জেনেটিক। বাচ্চা যে সবসময় তার বাবা বা মায়ের মতই দেখতে হবে এমন কিন্তু নয়।
– আমি ওসব জানি পাপা। কিন্তু আমি তো কারো না কারো মত নিশ্চই হয়েছি…?
রুবিনা বলল
– তুমি যে আমাদের দুজনার মত দেখতে হওনি, আমরা তাতে একপ্রকার খুশিই হয়েছি। তোমার পাপা আর আমি কেমন শ্যামবর্ণ দেখেছো? আর তুমিতো আমাদের মাশাআল্লাহ, একটা পরী বাচ্চা।
অরু তাও প্রসন্ন হলো না। খেয়াল করলো তানভীর। মুখে খাবার দিয়ে সে অনেক ভেবে বলল
– আমার এক ফুপু ছিলো, অসম্ভব সুন্দরী। আমরা ছোটবেলায় তাকে দেখেছি। আমার ধারণা তুমি কিছুটা তার মতো দেখতে হয়েছো।
অরু উৎসাহী গলায় বলল
– কোথায় থাকেন তিনি? ওনার কী আমার মত চিবুকে তিল ছিলো?
তানভীর চিন্তিত গলায় বলল
– না, তোমার মত চিবুকে তিল ছিলো না। আর উনি মারা গেছেন বহু বছর আগে।
অরু হতাশ হলো। তানভীর বলল
– তুমি খাচ্ছো না অরু। প্লেট শেষ করে উঠবে।
তানভীর উঠে গেলো।
অরু কাতর চোখে মায়ের দিকে তাকালো। রুবিনা অরুর প্লেটে আরও খানিকটা খাবার তুলে দিয়ে কড়া চোখে খেতে ইঙ্গিত করলো। অরু বিস্ময়ে, বিরক্ত। সে বলল
– দেশের বাইরে গিয়ে তোমাদের এই অত্যাচারের প্রথম প্রতিশোধ নিবো আমি। না খেয়ে খেয়ে দেখো কী হাল করি নিজের।
রুবিনা অদূরে তানভীরকে খেয়াল করে চাঁপা স্বরে মেয়েকে বলল
– আমার ধারনা তুমি ইংল্যান্ডে চলে যাওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তোমার পাপা স্বপরিবারে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হবেন। তোমাকে বিদেশ বিভূঁইয়ে একা দিয়ে মনে হয় না ছ’মাসও তিনি এদেশে টিকতে পারবেন। অবশ্য তোমার সাথেই রওয়ানা হলে, আমি একদম অবাক হব না।
অরুর নিজেরও তাই ধারণা। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল।
এর দু’দিন পর অরুদের বাড়িতে দু’জন লোক এলো। লোক বলাও হয়তো ঠিক হলো না, ওদের বয়স আর কত হবে, একজনার পঁচিশ, ছাব্বিশ। অন্যজনার ত্রিশের মত। পোশাক আশাক নিন্ম পেশাজীবীদের মত। পরনে পুরানো প্যান্ট শার্ট। মাথার চুল বিবর্ণ, রোদে পোড়া তামাটে গায়ের রং।
বাড়িতে বাবা মা ছিলো না। ওপাশের বড় আম্মু বাইরের লোক এসেছে শুনে তাদের তরফে, নিচে একবার ঘুরে দেখে গেছেন। উপরে উঠে অরুকে দেখে বলে গেলেন
– বাইরের ঘরে দু’টো লোক এসেছে। তুমি যেন হুট করে আবার ওদের সামনে চলে যেও না। মা বাড়িতে নেই, কাজের লোকেরাই দেখাশোনা করবে।
অরু প্রশ্ন করলো
– আমি কেনো যাবো ওদের সামনে…?
– হুম, জানি যাবে না। তাও বলে গেলাম। সাবস্ট্যান্ডারড লোকজন, তুমি মিট না করাই ভালো।
– এসব বলা ঠিক না, বড় আম্মু…
তমা নিজেকে সংশোধন করে বলল
– না, এমনিই বললাম। আসল কথা হলো, তুমি নিচে যাবে না ব্যস, এটাই বলতে চেয়েছি।
বড় আম্মু চলে গেলেন।
কিন্তু কেমন অদ্ভূত কথা বলল বড় আম্মু। কে ওই ছেলেগুলো? অরুর ভীষণ কৌতূহল হলো। বাড়িতে তাদের অংশে দুটো কাজের লোক ছাড়া কেউ নেই এই মুহূর্তে। অরুর ইচ্ছে হলো টুপ করে একবার নিচে গিয়ে ওদের দূর থেকে একটুখানি দেখে আসতে। কিন্তু বড় আম্মুর নিষেধ উপেক্ষা করে কাজটা করা কী ঠিক হবে?
ছেলে দুটি বসেছিলো বাইরের ছাউনিমত জায়গাটায়। এখানে বসার ব্যবস্থা আছে। নিশ্চই বসার ঘরে নিয়ে বসানোর উপযুক্ত ভাবা হয়নি তাদের। ছেলেদুটি বসে আছে খুব কাচুমাচু হয়ে। তাদের মুখগুলো শুকনো। অরু এদেরকে আর যাই হোক কোনো ক্ষতিকর মানুষ ভাবতে পারলো না। হতে পারে অচেনা লোক তাই হয়তো বড় আম্মু তাকে সাবধান করেছে।
অরু ছেলেদু’টির সামনে এলো। অরুকে দেখে ওরা টপ করে উঠে দাঁড়ালো। ছেলেগুলোর শুকনো ঠৌঁটে এখন হাসি, চোখে বিস্ময়। তারা অরুর দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করছে।
কম বয়সী ছেলেটা বড়টির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল
– বইন….আসছে। ভাই, আমাগো বইনে আসছে…। আমি দেইখ্যাই চিনছি…
বড়টি বলল
– চুপ কর, চুপ কর গাধা।
অরু লক্ষ্য করলো ছেলে দুটোর চোখ চিকচিক করছে। তারা সলজ্জ হেসে নিজেদের চোখ মুছছে। অরু কৌতূহলী তাকিয়ে আছে। জিজ্ঞেস না করে পারলো না,
– আপনারা কারা?
বড় ছেলেটা অস্ফুট গলায় বলল
– বইন, আমার নাম আবু, অয় আমার ছুডো ভাই বাবু। আমরা দুই ভাই।
– আপনারা আমাদের কে হন?
দু’ ভাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হলো। তারা বসলো এবং অন্যদিকে তাকিয়ে বলল
– আমরা আফনার কেউ হই না বইন। আমরা আফনার আম্মার সাথে দেখা করতে আসছি। জরুরী প্রয়োজন।
অরু কিছুক্ষণ ছেলে দু’টিকে দেখলো, তারপর চিন্তিত মুখে ভেতরে চলে গেলো। দুপুর গড়িয়ে গেলে রুবিনা বাড়ি এলো। ছেলে দুটিকে দেখে তার কপালে ভাঁজ পড়লো। পরিচয় পেয়ে গলাটাও শুকিয়ে কাঠ।
পর্ব-২
অরু আজ সকাল থেকে প্রায় গৃহবন্দী। কারণটা তার অজানা। সে অনেক ভেবেও বিষয়টা বুঝতে পারছে না। বাড়িতে দুটো বাইরের ছেলে এসেছে এবং তাদের ক্লাস খুব নিচু, এটাতো কোন কারণ হতে পারে না, তাই না?
কাল সন্ধ্যা নাগাদ রুবিনা বাড়ি ফিরেছিলো। নিচে কি সব হয়েছে জানে না অরু। তাকে দ্বিতীয়বারের মত বলা হয়েছে , সে যেন হুটহাট করে নিচে নেমে না যায়। কারণ, সেখানে দুটো বাইরের লোক এসেছে।
অরু যে ইতিমধ্যেই তাদেরকে দেখে এসেছে, জানে না কেউ। কিন্তু সে কিছুতেই এটার হিসেব মেলাতে পারছে না। কারণ, ছেলে দুটোকে তার কোনমতেই ভয়ঙ্কর কিছু মনে হয়নি। বরং কেমন মায়া মায়া ছিলো ওদের চোখগুলো।
তবে একটু বোকা বোকাও। তাকে ‘বইন’ সম্বোধন করছিলো। কি জানি, ওদের ভাষাই হয়তো অমন।
অরু নিচে আসা ছেলে দুটি এবং তার নিচে নামার নিষেধাজ্ঞা দুটোই ভুলে থাকার চেষ্টা করলো। আপাতত সে তার নতুন কালেকশন, বিলি আইলিশের নতুন মিউজিকে মনযোগ দিলো।
সারা বাড়িতে কেমন যেন একটা শুনসান নীরবতা। সবার মুখেই হাসি কিন্তু সে হাসিটাও যেন কোন চাঁপা দুশ্চিন্তার প্রকাশ।
আবু আর বাবুকে গেস্ট হাউজের একটা কামরায় থাকতে দেয়া হয়েছে। বিকেলে বাড়ি ফিরে বড় জায়ের মুখে ছেলে দুটির পরিচয় পেয়ে কেমন গম্ভীর হয়েছিলো রুবিনা। ভেবেছিলো, তানভীরকে ফোন দিয়ে ঘটনাটা জানাবে। কিন্তু আপাতত সে একাই বিষয়টা সামাল দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
আবু আর বাবু এখন বসে আছে একটা বিছানার কিনারে। ধবধবে সাদা বিছানার চাদরে বসতে তাদের অস্বস্তি হচ্ছিলো। এদের ঘরের মেঝে আয়নার মত চকচকে পরিষ্কার। সেই তুলনায় তাদের শরীরের পোশাক অত্যন্ত অপরিষ্কার। নিজেদেরকে এখানে খুব বেমানান লাগছে তাদের।
রুবিনা ঠোঁটে ভদ্রতাসূচক হাসি এনে বলল
– তোমরা দাঁড়িয়ে কেনো, বসো…
আবু আর বাবু সংকুচিত হয়ে আবার বসে পড়লো। তাদের সামনে অদূরে চেয়ার পেতে বসলো রুবিনা।
– তোমরা রাওপুর থেকে এসেছো? তোমরা রাহেলার দুই ছেলে? তোমাদের মা খুব অসুস্থ…?
আবু আর বাবু দুজনেই মাথা নেড়ে সন্মতি জানালো।
রুবিনা একটু চুপ করে থেকে বলল
– অনেকদিন ওদিককার খোঁজ নেয়া হয় না। বড় বুবু যেবার মারা গেলেন, সেবার দেশের বাইরে ছিলাম। তারপর তো ধীরে ধীরে সব যোগাযোগ ঘুচে গেছে। তা, এতদিন পর তোমরা হঠাৎ কী মনে করে?
আবু একবার বাবুর দিকে তাকালো। কী বলে শুরু করবে বুঝতে পারছে না হয়তো। তবু জড়তা কাটিয়ে বলল
– আমাগো আম্মার খুব অসুক খালাম্মা। আম্মাই আমাগো আফনার কাছে পাঠাইছে।
– খুব ভালো করেছো আমাকে জানিয়ে। শোনো, আমি কিছু টাকা পয়সা দিয়ে দিচ্ছি, তোমরা গিয়ে তোমাদের মায়ের খুব ভালো চিকিৎসা করাও, কেমন..?
আবু আর বাবু ইতস্তত নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। আবু বলল
– জে না খালাম্মা, আমরা টাকার জন্য আসি নাই…
রুবিনার কপালে ভাঁজ পড়লো
– তাহলে…?
আবু আর বাবু একটু সময় নিলো। এরপর আবু বলল
– আমার আম্মার কঠিণ অসুক খালাম্মা। সে আর ভালো হইতো না। তার চিকিৎসা শেষ।
– কেনো, কী হয়েছিলো তার?
– ডাক্তারে কইছে, ক্যান্সার…
– বল কী?
আবু ধরা গলায় বলল
– আম্মা আর বাঁচবো না। অবস্থা ভালো না।
রুবিনা কী বলবে বুঝতে পারছে না। রাহেলার ক্যান্সার। সে আর বাঁচবে না। তার চিকিৎসাও দরকার নেই। তারা টাকাও চায় না, তাহলে এরা এখানে কেনো এসেছে?
আবু এবার নিজেকে স্বংবরণ করে বলল
– মায়ের মনে একটা শেষ ইচ্ছা জাগছে, খালাম্মা। সে বইনেরে একটাবার দেকতে চায়…
রুবিনা স্তম্ভিত। তার মাথায় আসমান ভেঙে পড়লেও সে এতটা অবাক হত না। সে কিছুক্ষণ কোন কথাই বলতে পারলো না। আবু ব্যাপারটা বুঝতে পারলো। সে নিজেও কিছুটা নিরুপায় বোধ করছে যেন। বলল
– খালাম্মা, আফনের কাছে আবদার করি, পুতলারে একটাবার আম্মারে দেখানোর ব্যবস্থা করেন।
রুবিনা দিশেহারা বোধ করলো। তার চোখদুটো এখন জ্বালা করছে। কেমন একটা বিশ্রী অনুভূতি হচ্ছে। সে কী খুব রেগে যাচ্ছে? কিন্তু এখানে তার রাগের তো কোনো কারণ থাকতে পারে না। এরা নির্বোধ, পাগলের প্রলাপ বকছে। পাগলের ওপর রাগ দেখিয়ে লাভ নেই। আপাতত তাই সে নিজেকে কিছুটা সংযত করলো। গলার স্বর মোলায়েম রাখার চেষ্টা করে বলল
– যেন তেন একটা আবদার করলেইতো হয় না, তাই না? রাহেলা অসুস্থ, তার জন্য আমি কিছু টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে পারি। তার এমন অবুঝ আবদার তো আমার পক্ষে রাখা সম্ভব না।
আবু আর বাবু বিনয়ে বিগলিত। তারা একটু পর পর তাদের চোখ মুছতে লাগলো। আবু বলল
– আমার আম্মা কোনদিন কারো কাছে কিছু চায় না খালাম্মা। আমরা দুই ভাই তারে জান দিয়া মায়া করি, তাও সে পুরা জীবন দুঃখ পাইছে খালি পুতলার লাইগ্যা। পুতলারে দিয়া, সে একদিনের জন্যও ভালো আছিলো না। আইজ পুতলারে এক নজর না দেইখ্যা মরলে, কব্বরে শান্তি পাইবো না আমগো আম্মা। আফনে একটাবার বইনেরে লইয়া চলেন খালাম্মা, একটা বার আমার আম্মারে তারে দেখান। আপনার পায়ে ধরি খালাম্মা…
আবু আর বাবু উঠে এসে রুবিনার পা ধরতে উদ্যত হলো। রুবিনা তটস্থ হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে, চাঁপা চিৎকারে তাদের থামিয়ে দিলো।
আবু আর বাবু বাঁধা পেয়ে পেছনে সরে গেলো। রুবিনা এখন জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। তার কী শ্বাসকষ্ট হচ্ছে? নাকি ব্লাড প্রেশার বেড়ে গেছে? নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করে সে বলল
– শোনো, তোমাদের মা অসুস্থ, রোগের তাড়নায় সে যা খুশি বায়না করতেই পারে। কিন্তু তোমরা তো বড়, তোমাদের দেখলেতো মনে হয় বুদ্ধি বিবেচনা আছে। দু’ এক কলম লেখাপড়াও জানো। তোমরা কী চাও, এতগুলো বছর পর আরাধ্যা জেনে যাক তার আসল পরিচয়টা কী?
আবু কী যেন বলতে চাইলে তাকে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো রুবিনা। বলল
– আরাধ্যা আগামী মাসে বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য চলে যাবে। সে বাংলাদেশে টপ মেধাবীদের তালিকায় একজন। তার এই লেখাপড়া, সন্মান, তার ভবিষৎ সবই তো এক মুহূর্তে শেষ হয়ে যাবে যদি সে এসব জানতে পারে।
আবুর মুখে তৃপ্তির হাসি, সে দুহাত নেড়ে বলল
– না না খালাম্মা, আমরা তার ভবিষৎ নষ্ট করতে চাই না। আমরা কিছুতেই তার পরিচয় দেব না। সে কোনদিন জানবে না তার পরিচয়।
রুবিনা এবার যেন একটু শক্তি পেলো। সে গলার স্বরে গাম্ভীর্য এনে বলল
– বললেইতো হবে না। তাকে নিয়ে রাহেলার সামনে দাঁড় করালে, সে প্রশ্ন করবে না, কে এই রাহেলা? কেনো তাকে হঠাৎ এতদূরে নিয়ে যাওয়া? আর তাছাড়া আমি বুঝি না, তোমাদের ওর প্রতি এত দরদ আসলো কোত্থেকে? রাহেলাতো তাকে পেটে ধরেনি। সে তো অন্যের মেয়ে, নেহায়েত মাস তিনেক তাকে নিজের কাছে রেখেছিলো। তাতেই তোমরা মায়ার সাগরে ভেসে যাচ্ছো? আর আমরা যে এতগুলো বছর তাকে এত যত্ন, এত কষ্ট করে, আদরে আহ্লাদে বড় করলাম, সেসব কিছুইনা? সবকিছু তোমাদের কাছে ছেলেখেলা?
– না না খালাম্মা, কী যে বলেন। আপনারাইতো তার সব। আমরা কিছুতেই আমাগো বইনের কোনো ক্ষতি করবো না
– আর কী তখন থেকে বইন বইন করে যাচ্ছো? কে তোমাদের বইন? আরাধ্যা চৌধুরী, নামকরা ব্যারিস্টার, তানভীর চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে। তাকে ম্যাডাম বলে সম্বোধন করো। আর শোনো, ভুলেও ওর সামনে যাবে না। তোমাদের কোন আইডিয়াই নেই যে, সে কতটা ট্যালেন্ট। কি বলতে তোমরা কী বলে ফেলবে তার ঠিক নেই। তোমরা এসেছ, ভালোই হয়েছে। আমি তোমাদের মোটা অঙ্কের কিছু টাকা দিব। তোমার মাকে এক সময় দিতে চেয়েছিলাম, সে নেয়নি। আশা করি তোমরা অমন ভুল করবে না। এত টাকা দিব যে তোমাদের দুই ভাইয়ের আর কোনো অভাব থাকবে না। রাহেলার কাছে আমরা ঋণী। সে আমাদেরকে একটা বাচ্চা পাইয়ে দিয়েছিলো, আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ। তার প্রতিদান অবশ্যই আমরা দিতে প্রস্তুত। তোমরা রাতে থাকো, ভালোভাবে খাওয়া দাওয়া কর। সকালে টাকা নিয়ে চুপচাপ চলে যাও।
আবু আর বাবু অসহায় বোধ করলো, তারা কী আরোও একবার অনুরোধ করবে? আর কী অনুরোধে কোনো কাজ হবে? তাদের মত ক্ষুদ্র মানুষের কিইবা জোর আছে, কিসের দাবীতে তারা কথা বলবে আর?
রুবিনা আরও দু’ একটা কথা বলে বেরিয়ে এলো গেস্ট হাউজ থেকে। গেস্ট হাউজটা দু’কামরার একটা আলাদা অংশ। মূল বাড়ির ভেতরের খোলা চত্বর পেরিয়ে একদম পেছনের দিকে। রুবিনা ফেরার পথে দেখতে পেলো চত্বরের একধারে ঝাঁকড়া হাসনাহেনার তলে কেউ দাঁড়িয়ে। স্পষ্ট না হলেও সে নিশ্চিত এটা অরু।
রুবিনা পা চালিয়ে এসে অরুর কাছাকাছি দাঁড়ালো। বলল
– একি! তুমি অন্ধকারে এখানে দাঁড়িয়ে? তোমাকে না নিচে নামতে বারণ করে এলাম?
অরু মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রাণখোলা হসলো। বলল
– হোয়াট আ ওয়ান্ডারফুল ফ্রিগ্র্যান্স দিজ ফ্লাওয়ার স্প্রেড, মম্! আই কুড’ন্ট স্টে ইনসাইড দ্য হাউজ এ মোমেন্ট লংগার।
রুবিনা হাসনাহেনা গাছের দিকে তাকালো। সত্যিই প্রাচীরের ওপর হেলান দিয়ে হাসনাহেনা গাছটা ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। প্রচুর ফুল ফুটেছে এবার এবং অরুর এই ফুল অনেক পছন্দ। কিন্তু তাই বলে নিষেধ অমান্য করে সে নিচে নেমে আসবে? তাও আবার এই অন্ধকারে একা একা? ও কখন নামলো? কতক্ষণ এখানে? ও কী গেস্ট হাউজের কাছাকাছি গিয়েছিলো? তাদের কথাবার্তা কিছু শোনেনিতো?
– তোমাকে নিচে আসতে আজ বারণ করেছিলাম। আর তাছাড়া তোমাকে বলেছিনা, হাসনাহেনার তলায় বর্ষাকালে সাপখোপ থাকতে পারে? এত অবাধ্যতা কেন করো তুমি?
অরু একটু নির্বাক তাকিয়ে থেকে ঘোর লাগা গলায় বলল
– কী হয় এলে, মম্? তুমিতো জানো, ফুল ফোটার এ সময়টা আমার খুব পছন্দ। দেখো, কেমন মেঘের আড়ালে চাঁদ ঢেকে যাচ্ছে, আবার উঁকি দিচ্ছে। উফ্, কী যে ভালো লাগছে দেখতে!
রুবিনা একবার আকাশের দিকে তাকালো, তারপর বিরক্ত মুখে বলল
– চাঁদের কাজ উঁকিঝুঁকি মারার, সে উঁকিঝুঁকি মারুক। তুমি আর এক মুহূর্তও এখানে দাঁড়াবে না। চলো, ঘরে চলো….
অরু মুখ ঘুরিয়ে কেমন স্থির গলায় বলল
– আমি আর দশ মিনিট এখানে থাকবো মম্, তারপর ঘরে যাবো, প্রমিস…
রুবিনা অসহায় বোধ করলো। অরুকে জোরাজুরি করা যাবে না। তাহলে সন্দেহ করবে। সে নিশ্বাস ছেড়ে বলল
– মাত্র দশ মিনিট, মনে থাকে যেন।
অরু মায়ের চলে যাওয়া দেখলো। তারপর গেস্ট হাউজের দিকে তাকালো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে এবার মুখ ঘুরিয়ে নিলো আকাশের দিকে । তার খুব বিষণ্ণ লাগছে।
রাতে তানভীরকে ঘটনাটা খুলে বলল রুবিনা। তানভীর গম্ভীর হলো। তবে রুবিনা যে ওদের টাকাপয়সা দেবার কথা বলে ম্যানেজ করেছে, এটা শুনে স্বস্তিও পেলো।
খাবার টেবিলে অরু চুপচাপ খাচ্ছে। তানভীর আর রুবিনা আড়চোখে দেখছে তাকে। তানভীর একবার গলা পরিষ্কার করে বলল
– বেবি, ইংল্যান্ডে যে ইউনিভার্সিটিতে তোমার এডমিশন হতে যাচ্ছে, সেখানকার কিছু ফিচার ভিডিও সংগ্রহ করেছি আমি। তুমি চাইলে দেখতে পারো
মুখে খাবার নিয়ে অরু বলল
– নিশ্চই দেখতে চাই পাপা…
– তোমার জুবায়ের চাচা ওখানে সমস্ত ফর্মালিটিজ কমপ্লিট করে রাখবেন। বাকিটা আমরা গিয়ে ম্যানেজ করব…
অরু এই পর্যায়ে খাওয়া থেকে মুখ তুলল। জিজ্ঞেস করলো
– আমরা মানে?
রুবিনাও বিস্মিত। তানভীর তাদের দুজনার মুখের দিকেই তাকিয়ে হাসলো। বলল
– আমিও তোমার সাথে যাচ্ছি। ওখানে তোমাকে সব গুছিয়ে দিয়ে আমি ফিরবো।
অরু স্মিত হাসলো। এটা কোনো চমকপ্রদ বিষয় নয়। কারণ, তার মন বলছিলো, এমনই কিছু হবে। পাপা কিছুতেই তাকে একা পাঠিয়ে ভরসা পাবে না। ঠিক যাওয়ার আগের দিন বলবে,- বেবি আমি ভাবলাম, কটা দিন তোমার সাথে আমিও ইংল্যান্ডে ঘুরে আসি…
রুবিনার মুখেও হাসি। তানভীর এমনই। মেয়ের জন্য পাগল। রুবিনার ধারণা, মেয়েকে ওখানে পাঠিয়ে তানভীর বেশীদিন দেশে থাকতে পারবে না। একমাত্র মেয়েকে বিদেশে লেখাপড়া করানোর কোনো ইচ্ছেই ছিলো না তাদের। কিন্তু মেয়েটা এত ভালো রেজাল্ট করতে থাকলো যে, নিজে থেকেই বিদেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়ে গেলো। তানভীরেরও ইচ্ছে হলো, মেয়ে তার মত বড় ব্যারিস্টার হোক। তানভীর নিজেও কিছুকাল ইংল্যান্ডে লেখাপড়া করেছিলো, তাই ওটা তার নিজের বাড়ির মতই লাগে।
– এ ক’দিনে যা কিছু করার করে নাও। স্পেশালি, তোমার কোন নিজস্ব ইচ্ছে থাকে যদি।
অরু একটু ভাবলো, বলল
– আমি দেশের মধ্যেই একটু ঘোরাঘুরি করতে চাই পাপা।
– ভালোতো, কোথায় যেতে চাও বলো, আমি সময় না পেলেও তোমার মম্ নিয়ে যাবে। এক কাজ করো, কক্সবাজার, রাঙামাটি বা সাজেক, ঘুরে আসতে পারো।
– একদম না…। ওসব জায়গায় অনেকবার গেছি।
তানভীর অবাক হয়ে জানতে চাইলো
– তাহলে আর কোথায় যাবে?
অরু ভাবতে ভাবতে বলল
– এলোমেলো ঘোরাঘুরি পাপা। অচেনা কোনো জায়গায়…উদ্দেশ্যহীন।
রুবিনা বিরক্ত গলায় বলল
– এ আবার কেমন কথা…? এলোমেলো ঘোরাঘুরি আবার কি জিনিস? উদ্দেশ্যহীনভাবে কোথাও যাওয়া যায় নাকি?
অরু বলল
– আপাতত আমার এটাই ইচ্ছে করছে মম্। তোমরা জানতে চাইলে, তাই বললাম। যেতেই হবে এমনও না।
তানভীরের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। তবে আপাতত সে হ্যা, না কিছুই বলল না।
অরুর খুব সকালে ঘুম ভাঙলো। কিছুক্ষণ মোড়ামুড়ি করে বিছানায় উঠে বসলো সে। এখন পাঁচটা বাজে, এত সকালে আশা করা যায় চাকর বাকর ছাড়া এবাড়ির কেউই ওঠেনি। রাতের হাসনাহেনার গন্ধটা মনে হলো এখনও তাকে ছেড়ে যায়নি । প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো সে। খুব ঠান্ডা লাগছে। সারারাত এসি চলেছে এবং মনে হচ্ছে ভোররাতে সামান্য বৃষ্টিও হয়েছে। বিছানা ছেড়ে অরু এসে খোলা বারান্দায় দাঁড়ালো। তার গায়ে রাতের পোশাক। এখানে দাঁড়ালে সামনের গাছগুলো থেকে পাখির কিচির মিচির শোনা যায় খুব। অরু সকালে এখানে দাঁড়িয়ে কফি খায়। তার ঘরে একটা ইন্টারকম লাইন আছে। সুইচ টিপে কাউকে বললেই কফি চলে আসবে। আজ অবশ্য একটু বেশীই সকাল। তার খুব ইচ্ছে করছে নিচে গিয়ে উঠোনের বাঁধানো চত্বরে খালি পায়ে হাঁটতে।
হাঁটতে হাঁটতে আবু আর বাবুর সাথে খানিক গল্প করা গেলো। ওরা কেমন ইন্টারেস্টিং ওয়েতে কথা বলে, শুনতে মজা লাগে। আচ্ছা ওরা কী এখনও আছে নাকি চলে গেছে?
কিন্তু মা মেনে নেবে না বিষয়টা। বরং দেখতে পেলে অনেক বকা দেবে। মা অবশ্য ওঠেনি এখনও । অরু দ্বিধান্বিত, নিচে গিয়ে খালি পায়ে হাঁটবে নাকি এখানেই বসে বসে পাখির কিচিরমিচির শুনবে?
হঠাৎ নিচে তাকিয়ে আটকে গেলো অরুর চোখ। কালকের সেই ছেলেদুটি না? ইতস্তত পায়ে দু’জন এগিয়ে যাচ্ছে গেটের দিকে। সামনের সরু বাঁধানো পথে হাঁটতে হাঁটতে তারা হঠাৎ পেছনে ফিরে তাকালো এবং তখনই তারা উপরের ঝুল বারান্দায় অরুকে দেখতে পেলো। অরু দেখলো, ছেলেদুটি থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। তারা কেমন কাতর চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাদের মুখে ম্লান হাসি কিন্তু চোখগুলো চিকচিক করছে।
কী আশ্চর্য, এরা কারা? এরা কী কাঁদছে? ছোটটা বারবার হাত দিয়ে চোখ মুছছে। মমের সাথে গেস্ট হাউজে কাল কি নিয়ে কথা হয়েছে এদের? কী এমন চাইছিলো তারা যে, মম্ এত কড়া গলায় প্রত্যাখ্যান করে দিলো? আর যাই হোক এদের দেখেতো অরুর কিছুতেই খারাপ লোক বলে মনে হয়নি তার। কিন্তু ওদের চোখে পানি কেন? ওরা ওভাবে তার দিকেই বা কেন তাকিয়ে আছে? ওরা কী অরুকে চেনে, বা কিছু বলতে চায়?
ছেলেদুটি এবার উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ওরা চলে যাচ্ছে। গেট পেরিয়ে, আর একটাবারও পেছনে না দেখে ওরা দৃষ্টির আঁড়ালে চলে গেলো ধীরে ধীরে।
এত সকালে এরা চলে গেলো কেন? মম্ কী জানে এদের চলে যাওয়ার কথা? কী জানি, হয়তো জানে….। কিন্তু অরুর এমন অস্বস্তি কেন হচ্ছে? কেমন অহেতুক একটা অস্বস্তি….
( চলবে)
২ Comments
very good story; Congratulations
Thank you so much