২১৩ বার পড়া হয়েছে
রিমির বাড়ি ফেরা
( শিক্ষণীয় কিশোর গল্প)
পারভীন আকতার
সকালবেলা তড়িগড়ি রেডি হয়ে স্কুলে যাবে রিমি আজ।পাশের বাড়ীর কেয়া তার ক্লাসমেট।অষ্টম শ্রেণির গন্ডি পেরুবে বছর শেষে।ওরা খুব খুশি।নতুন বইয়ের মুহুমুহু ঘ্রাণ পাবে আর কিছুদিন পর।রিমি ও কেয়া পাতানো সই।সবকিছুই যেন তারা একসাথে করতে ভালোবাসে।রোজ দুইজনে স্কুল বাসের জন্য দাঁড়ায় চৌরাস্তার মোড়ে।প্রতিদিনকার মতো আজও চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে দু’জন।সামনের গলি দিয়ে আসছে একটি রিকশা।রিকশায় বসা যুবক তাদের দেখে শিস দেয়, ঈশারায় ডাকছেও যেন।কিছুক্ষণ পর তারা দেখে পেছন থেকে ঐ রিকশাটা এসে দাঁড়িয়েছে।
রিকশাওয়ালা বলল,”নাও খুকীরা চকলেট।খেতে খুব মজা।তোমরা একা দাঁড়িয়ে আছো দেখে ঐ যে দেখছো লোকটার মায়া হয়েছে।নাও,খাও।”
রিমি বলে উঠল,”কী যা তা বলেন।আমরা কি চকলেট খাবো বলেছি?নিয়ে যান তো।”
কেয়া ভয়ে আঁতকে উঠে বলল,”রিমি চল বাড়ী চলে যাই।লোকটা আমাদের এইদিকে আসছে।আমার খুব ভয় করছে।”
রিমি রাগে টগবগিয়ে লাফাতে থাকে।”আরে আজ স্কুলে অ্যাসান্টমেন্ট জমা দেয়ার তারিখ।তুই চলে যা,আমি স্কুলে যাবো।”
কেয়া এদিক সেদিক না তাকিয়ে দিলো বাড়ীর দিকে দৌঁড়। রিমি দাঁড়িয়ে রইল বাসের জন্য একা।
“এই মেয়ে তোমার নাম কী?”যুবক মুখে ভিলেন হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করে।সকালবেলা অনেকটা নির্জন থাকে এই রাস্তাটা।আজ একটিও মানুষ দেখা যাচ্ছে না।রিমি তবুও বুকে সাহস নিয়ে বলল,”নাম দিয়ে কাজ কী?কী চান আপনি?আপনাকে তো চিনি না।”
“আমারে কিছুক্ষণ পরই চিনবা”, এই বলেই রিমির মুখে একটি রুমাল লাগিয়ে দিল যুবক।মুহুর্তেই রিমি বেহুশ হয়ে গেল।তারপর কী হয়েছে সে জানে না।
কেয়া তার বাড়ীতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়ে ওর মাকে ঘটনাটা বলল।রেনুকা আর দেরী না করে রিমির মাকে খবরটি দিতে গেল।
“আপা,রিমির কান্ড দেখেছেন।একটি বখাটে ছেলে ওদের উত্যক্ত করছিল চৌরাস্তার মোড়ে।কেয়া রিমিকে এত করে বুঝালো বাড়ী চলে আসতে, সে এলো না।কেয়া ভয়ে চলে এসেছে।দেখেন আমার মেয়েটা এখনো হাঁপাচ্ছে। “
রত্মার কথাটা শুনে পিলে চমকে উঠে।মাত্র তেরো বছরের মেয়ের এত সাহস দেখানো কী দরকার?
“কোথায় সে কেয়া?”
রত্মা রান্না ঘর থেকে দৌঁড়ে আসে।
রিমির বাবা ড্রয়িং রুমে পেপার পড়ছিল।চেঁচামেচি শুনে তিনিও বাইরে এলেন।
“কী হয়েছে এত হড্ডগোল কীসের?”রিমির বাবা বাশার সাহেব পুলিশে চাকরী করেন।কিছুক্ষণ আগেই বাসা এসেছেন ডিউটি থেকে।বেচারা একটু রেষ্টও নিতে পারেনি।
“শোনছো,তোমার মেয়ে বখাটেদের সাথে বাগবিতণ্ডা করছে চৌরাস্তার মোড়ে।একটু যাও আমার মেয়েটাকে নিয়ে এসো।কেয়া এসেছে এইমাত্র।সে স্কুলে যাবেই।দেখে আসো আমার মেয়েটা স্কুলে ঠিকমতো গেছে কি না।”
“এখনই যাচ্ছি।তাড়াহুড়োয় সিভিল ড্রেসেই বের হলেন বাশার সাহেব।”
চৌরাস্তার মোড়তো ফাঁকা।কোথাও কেউ নেই।গাড়ি চলছে মাঝে মাঝে দুই একটা আসছে যাচ্ছে। স্কুল গাড়ি এসেছে কি?বাশার সাহেব মেয়েকে এদিকে সেদিক খুঁজে।না, কোথাও নেই মেয়ে।অগত্যা তিনি রিমির স্কুলের দিকে ছুটলেন।
দারোয়ানকে গেইটেই পেলেন।
“রিমি কি স্কুলে এসেছে?”বাশার সাহেব খুবই টেনশন করছেন।
“না,সে তো আজ স্কুলে আসেনি ভাই।আমি তো সবাইকে রিসিভ করে ভিতরে হ্যান্ড স্যানিটাইজার করে ঢুকাই।রিমিকেতো দেখলাম না।”
দারোয়ানের কথায় যেন বাশার সাহেবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
“কী বলেন,আমার মেয়েতো স্কুলেই আসার কথা।
আজ কি স্কুল বাস যায়নি?”
“হ্যাঁ,গিয়েছে তো।সব শিশুকে আমিই তো নামালাম বাস থেকে।সেখানেতো রিমি ছিল না।”
“ইয়া আল্লাহ,আমার মেয়েটা কোথায় গেল?এখন কোথায় খুঁজবো মাবুদ।”বাশার সাহেব কেঁদে কেটে অস্থির।তিনি যে ডিফেন্সের লোক এসব এখন একজন বাবার কাছে তুচ্ছ বিষয়।কলিজার টুকরো মেয়েটাকে কে নিয়ে গেল?হঠাৎ কেয়ার কথা মনে পড়ে বাশার সাহেবের।দ্রুত তিনি বাড়ী আসেন কেয়ার কাছে।
“কোন বখাটে ছেলের কথা বলছিস বলতো?কোনদিক থেকে এসেছে?আমাদের এখানকার নাকি?”
“আমাদের এলাকার হলে চিনতাম আঙ্কেল।মিষ্টিভান্ডার দোকানের সামনের।গলি থেকে রিকশাটা বের হয়েছিল।সে আমাদের রিকশাওয়ালাকে দিয়ে চকলেট পাঠালো।আমরা খাইনি।ছেলেটা আমাদের দিকে আসছে দেখে রিমিকে বললাম,আজ স্কুলে গিয়ে কাজ নেই।চল,বাড়ী চলে যাই।ছেলেটা এইদিকে আসছে।রিমি আমার কথা শুনলো না। উল্টো আমি ভীতু বলে বকে দিল।উপায়ন্তর না দেখে ভয়ে আমি বাড়ীর দিকে দৌঁড় দিয়েছি।রিমি ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল গাড়ির জন্য।”,কেয়া সবিস্তারে সব বলল।
মেয়েটার এত সাহস দেখানো উচিত হয়নি।আজকালকার ছেলেদের মন মানসিকতা খারাপের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে।ইন্টারনেটে আজেবাজে ভিডিও দেখে নিজের জীবন নষ্ট করছে।”ইয়া খোদা,আমার মেয়েটাকে রক্ষা করো।”বাশার সাহেব দেরী না করে ইউনিফর্ম কোনরকম গায়ে দিয়ে গাড়ী নিয়ে বের হলেন।রিমির মা রত্মা কান্নাকাটি করে বুক ভাসাচ্ছে।কোথায় গেল তার একমাত্র মেয়েটা!মুহুর্তেই এলাকার লোকেদের মধ্যে খবরটি ছড়িয়ে গেল।সবাই যে যার মতো রিমিকে খুঁজতে বের হলো।
প্রায় কয়েক ঘন্টা ব্যবধানে রিমিকে বড় একটা বাড়ীর চিলেকোঠাই পাওয়া গেল।বিরাট বাড়ী,বিরাট গাছপালা ঘেরা রহস্যময় জায়গাটি খু্ঁজ পেতে দারোগা মহসিন সাহেবের টিমের বেশ বেগ পেতে হল।রিমির বাঁচাও,বাঁচাও শব্দ করছিল অনর্গল যাতে আশে পাশের কেউ শুনতে পায়।
সর্বনাশ!ওখানে রিমি শুধু একা নয় আরো বেশ কিছু শিশু আছে যাদের বয়স আট থেকে দশ হবে।সবার চেহারায় কালো ছায়া।বুঝতে অসুবিধে হয়নি কারো,ওদের সাথে কী আচরণ করা হয়েছে।কারো মুখ ফোলা,কারো পায়ে হাতে পিঠে নখের আঘাত।
কেমন হায়েনা এরা! এই শিশুদের সাথে এমন যৌনাচার করল কেমনে?দারোগা মহসিন সবগুলো বাচ্চাকে গাড়ি তুলতে তার টিমকে নির্দেশ দিলেন।
ঘরের আশেপাশে চেক করার জন্য পুলিশ ফোর্সকে তাগাদা দেয়া হল যদি কোন ক্লু পাওয়া যায়।যেই সময়টাই পুলিশ বাড়ীটি ঘিরে ফেলেছিল তখন দুষ্ট শিশু পাচারচক্র বেরিয়ে পড়েছিল।ঘরের ভিতরে কেউ আছে কিনা খুঁজাখু্ঁজি চলমান ছিল।
সব শিশুরা গাড়িতে উঠল কিন্তু রিমি
কোনভাবেই উঠে না।সে ভয়ে গোঙাতে থাকে।পাশে তার বাবা মা।দৌঁড়ে সে পালানোর চেষ্টা করে।
“আমায় ছেড়ে দাও,আমার ভয় করছে।”কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা পাগলের প্রলাপ বকছিল।
রিমির অথচ সকালেও স্বাভাবিক জীবন ছিল।
“কী হয়েছে মা?আমরা আছিতো।কোন ভয় নেই তোমার। “
“ওরা আসছে আবার এসে…..”
রিমির কান্নায় দারোগা মহসিনসহ সবার বুঝতে বাকী নেই রিমির সাথে খুব খারাপ কিছু হয়েছে।
মাত্র দশ বছর বয়স।কতটুকুই বা বাস্তবতা বুঝেছে সে?
যে ছেলেটা ওকে এখানে নিয়ে এসেছিল
সে ছিল একজন দালাল।রিমিকে ওদের হাতে তুলে দিয়েই কেটে পড়েছে।
তবে ওকে ধরতে সময় লাগবে না।রিমি একটু সুস্থ হলেই জানা যাবে কীভাবে, কী হয়েছে।
রাত তিনটে।হঠাৎ রিমির চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ।আমাকে ধরিও না প্লীজ।হাত সরাও দয়া করে।হাউমাউ করে কান্নাকাটি। লোকটার সেই বিকট শব্দের হাসিটা যেন কান ফেটে দিচ্ছে রিমির।
“রিমি কী হয়েছে মা?এমন করে না মা।সব ঠিক হয়ে যাবে।”মেয়ের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে কোনরকম মেয়ে বালিশের এক পাশে মাথা রাখে।
এমন করে কত কিশোরী মেয়ের জীবন ধ্বংস হচ্ছে তা কে রাখে কার খবর।কেবল ভুক্তভোগীরা বুঝে এই জ্বালার মাত্রা কত তীব্র লেলিহান শিখার মত।
পরদিন সকালে রিমিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল তার মা।শরীরের কয়েকটা জায়গায় ক্ষত চিহ্ন। হয়তো মেয়েটা আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছে।
ভিসেরা টেস্ট রেজাল্ট পেলেই ডাক্তার একটি সিদ্ধান্ত দেবেন।এখন আপাততঃ ঘুম দরকার রিমির।রিল্যাক্সের দরকার।প্রয়োজনে তাকে সমুদ্র পাড়ে ঘুরিয়ে আনতে কয়েকদিনের জন্য ডাক্তার পরামর্শ দিলেন।
বাশার সাহেব খুবই চিন্তায় পড়লেন।সেই ছেলেটাকে বিশেষ অভিযানে পুলিশ অ্যারেষ্ট করেছে।ওর সামনে দাঁড় করালে রিমি চিনবে কি না এখন দুশ্চিন্তা পড়েছে সবাই।রিমি খুব অসুস্থ।
দারোগা মহসিন ঐ দালাদ ছোকরাকে জেলে ভরে রামধোলাই দিয়ে হাতে পায়ের ভালই ব্যায়াম করলেন।এতটুকু বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কতই না ছিনিমিনি খেলা খেলছে এরা!
“এবার বল,তুই কেন এত অল্প বয়সে এসব অপরাধমূলক কাজে জড়ালি?কীসের অভাবে?কাউকে কিছু বলেছিলি যে তোর অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়েছে?”
ছোকরা এত মাইর খাওয়ার পরও মুখ খুলে না।দারোগা সাহেব ওকে আগে থেকেই মনে হয় চেনেন।যেসব কথা জিজ্ঞেস করছেন উনি;এগুলো ঘরের মানুষদের জানার কথা।
বারবার জেলে আসা আসামী সম্পর্কে পুলিশের ভাল অভিজ্ঞতা থাকা স্বাভাবিক।
রিমিকে ছোকরার সামনে আনার পর যে দৃশ্য দেখল সবাই রীতিমত ভীমরতিতে পড়ে গেল।
রিমি ছেলেটাকে এলোপাতাড়ি মারতে মারতে এক সময় নিজেই ক্লান্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।ওর রাগ নিবারণের সুযোগও দিয়েছেন পুলিশ।হয়তো ট্রমাটাইসড হয়ে যাওয়া রিমিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে এই ঘটনাটি সহায়তা করবে।
রিমিকে ধরাধরি করে সোজা বাসায় নিয়ে যাওয়া হল।বিকেলে ভিসেরা রিপোর্ট আসবে।কী হয় আল্লাহ জানেন।রিমির মা রত্মা একাই ডাক্তারের কাছে গেলেন যাতে কেউ টের না পায়।হাজার হোক মেয়েটা নিজের।
ভিসেরা রিপোর্টে রিমিকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।রত্মার টেনশন আরো বেড়ে গেল।কী হবে মেয়ে তার খুবই অাপসেট।সমাজটা কবে সুস্থ হবে কে জানে।একটা বাচ্চা মেয়ের এমন নাজুক হাল কেউ করে!বেচারী কাঁদতে কাঁদতে পাগল হওয়ার জোগাড়।রিমি চুপচাপ।কখনো কথা বলে আবার কখনো খুব ক্ষেপে যায়।অল্প বয়সে এত বড় শকট সে নিতে পারছে না।ডাক্তার বলেছে ধীরে ধীরে সে সুস্থ হয়ে উঠবে।
আসামীদের দ্রুতবিচার ট্রাইবুনালে বিচারের রায়ে ফাঁসির আদেশ হয়।র্যাপিষ্টরা একেক করে ধরা পড়ে সিআইডি পুলিশের অক্লান্ত পরিশ্রমে।রিমির দেয়া তথ্য আর আস্তানা দু’টোতেই অনেক তথ্য,প্রমাণাদি যথেষ্ট ছিল।
রিমি এখন অনেকটা সুস্থ জীবনে ফিরেছে।মেয়েটা ভাগ্যগুণে বিরাট ক্ষতি থেকে বেঁচে গেছে।হয়তো গুম করে ফেলতো।না হয় পাচার করত অন্য দেশে।অথবা কিডনী নিয়ে মেরে ফেলতো।তার কিছু ঘটার আগেই রিমির চাতুর্যতায় নিজেও বেঁচে গেল আর তার সাথে থাকা অন্যান্য শিশুরাও তাদের মা বাবার আশ্রয়স্থল ফিরে পেল।বিপদে মানসিক শক্তি হারাতে নেই।তবে শংকা থাকে রিমি এখনো ঘরের পুরুষ মানুষ ছাড়া বাইরের কাউকে দেখলে চরম ভয় পায়।ডরে গিড়গিড় করে।হয়তো এ থেকে রিমিদের মত মেয়েদের কখনোই মুক্তি হবে না।কী বীভৎস অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে সেই শিশু সন্তান!রত্মা মেয়েকে দেখে কাঁদে আর মনে মনে বলে,
“এই পৃথিবী শিশুদের তরে নিরাপদ হোক,
আসুক অবারিত শান্তির বারতার সুখ।”
————-
পারভীন আকতার
শিক্ষক,কবি ও শিশু সাহিত্যিক।
রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম।