রাণী ক্লিওপেট্রা তার জীবন ও রাজ্য শাসন
[তসলিমা হাসান]
ফারাও রাজবংশের সর্বশেষ রাণী ক্লিওপেট্রা। তাকে ঘিরে ইতিহাসে বিতর্ক আর রহস্যের কোনো শেষ নেই। যেমন রহস্যময তার জীবন ও রাজ্য শাসন তেমনি রহস্যময় তার প্রেম। ক্লিওপেট্রার প্রেম নিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক গল্প-অনেক কাহিনীর অবতারণা হয়েছে। এমনকি মহান সাহিত্যিক শেকসপিয়র পর্যন্ত তার নাটকে অমর করে রেখেছেন রানী ক্লিওপেট্রার প্রেমকাহিনীকে। তিনি লিখেছেন অ্যান্টনি-ক্লিওপেট্রা। অন্যদিকে জর্জ বানার্ড শ লিখেছেন সিজার-ক্লিওপেট্রা। এ ছাড়াও ক্লিওপেট্রার চরিত্র নিয়ে লিখেছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক ড্রাইডেন প্লুটার্ক, ড্যানিয়েল প্রমুখ। ফলে হাজার হাজার বছর পরও ক্লিওপেট্রার প্রেম নিয়ে আলোচনা চলছে আজও। লেখালেখিও থেমে নেই। তবে তার এই প্রেম কাহিনীর মধ্যে ছিল নৃশংসতা ও বর্বরতা। নিচে সেই সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

ক্লিওপেট্রার জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৬৯ সালে প্রাচীন মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায়। অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৫১ অব্দে রোম সম্রাট টলেমি অলেতিস মারা গেলেন। মারা যাওয়ার আগে তার বিশাল সাম্রাজ্য ১৮ বছর বয়সী কন্যা ক্লিওপেট্রা পুত্র টলেমি-১৩-কে উইল করে দিয়ে যান। তখনকার মিসরীয় আইন অনুসারে দ্বৈত শাসনের নিয়মে রানী ক্লিওপেট্রার একজন নিজস্ব সঙ্গী থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। কাজেই ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করতে হয় তারই ছোটভাই টলেমি-কে, যখন টলেমির বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। ফলে আইনগতভাবে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পিত হলো ক্লিওপেট্রা এবং তার স্বামী ১২ বছর বয়সী ছোট ভাই ত্রয়োদশ টলেমি এর উপর। ক্ষমতায় আরোহণের পর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও ক্লিওপেট্রা তার শাসন চালিয়ে গেলেন। এরই মধ্যে ৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ফারসালুসের যুদ্ধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাপতি পম্পে পরাজিত হলেন। সে বছরই আলেকজান্দ্রিয়ায় ফেরার পথে ফারসালুসের হাতে নিহত হন। যুদ্ধ থেকে পালাতে গিয়ে ক্লিওপেট্রার স্বামী ও ভাই টলেমি-১৩ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর ক্লিওপেট্রা হয়ে ওঠেন মিসরের একচ্ছত্র রানী।
তিনি যখন একচ্ছত্র রানীর অধিকারিণী হন তখনই তিনি প্রতি রাতে একটা করে স্বামী গ্রহন করতে শুরু করে। এখন আপনার মনে একটা প্রশ্ন আসছে এটি আবার কিভাবে সম্ভব তাই তো? হ্যাঁ সত্যিই তাই কেননা সে অতি সুন্দরী নারী ছিলেন তাই যে কাউকে প্রস্তাব দিলে সাথে সাথে রাজি হয়ে যেতেন। কিন্তু আপনার মনে আরেকটি প্রশ্ন আসছে তাহলে তিনি তাদেরকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি প্রতি রাতে একজন করে সুন্দর পুরুষ রাজ প্রাসাদে নিয়ে আসতেন এবং সারা রাত ঐ পুরুষের সাথে ফুর্তি করতেন। যখন ঐ পুরুষ ঘুমিয়ে পড়ত তখন ছুরি দিয়ে তার বুকটা ঝাঁজরা করে দিতেন এবং সেই রক্ত দিয়ে গোসল করতেন।
মিশরীয়দের কাছে ক্লিওপেট্রা ছিল সৌন্দর্যের রানী। ক্লিওপেট্রাকে শুধু মিশরের সুন্দরী না বলে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর নারী বলে মনে করা হত। বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড মিশরের প্রাচীন মিথের উপর নির্ভর করে ক্লিওপেট্রার কাহিনী লিখেছেন। ক্লিওপেট্রা নামে কোন এক শাসক নিশ্চয়ই ছিল। ইতিহাস ঘাটলে তা পাওয়া যায়। সেসময় ইতিহাসকে সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করার উপায় ছিল না তাই সেগুলো লোকমুখে ঘুরতে ঘুরতে মিথেই পরিনত হতো। প্রাচীন মিশরের মিথগুলোর সাথে কিছু বাস্তবতাও থাকত। ক্লিওপেট্রা নামের রহস্যময় চরিত্রটি নিয়ে প্রায় দুহাজার বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। হ্যাগার্ড তার উপন্যাস ক্লিওপেট্রাতে অসাধারণ ভাবে তুলে ধরেছেন ক্লিওপেট্রার রুপ, ব্যাক্তিত্ব এবং উচ্চাভিলাসি মনোভাব। পৃথিবীর রহস্যময় চরিত্রগুলোর একটি।তাই সেক্সপিয়ার, জর্জ বার্নড শ মত লেখকও লিখেছেন ক্লিওপেট্রা নিয়ে। মূল উপন্যাসটি পড়া হয়নি। সেবা প্রকাশনীর অনুবাদ পড়ে ছিলাম। বইটির অনুবাদক সায়েম সোলায়মান। খুব চমৎকার লেগেছে। মনেই হয়নি বইটি অন্য ভাষায় লেখা।
মিশরের প্রাচীন এক রাজবংশে জন্ম নিল একটি ছেলে সন্তান হারমাচিস। তার মা স্বপ্ন দেখলেন একদিন তার ছেলে মিশরের রাজা হবে,যেমন তার পূর্বপুরুষরা ছিল। যেদিন হারমাচিসের জন্ম হলো সেদিনই, রাজার ঘরে জন্ম নিলো এক শিশুকন্যা ক্লিওপেট্রা। ক্লিওপেট্রা পরে মিশরের রাণী হয়ে সিংহাসনে বসে। মিশরের বিভিন্ন পুরোহিত ও প্রধান প্রধান ব্যক্তিবর্গ হারমাচিসকে মিশরের ফারাও বা রাজা হিসেবেও মনোনীত করে এবং ক্লিওপেট্রাকে হত্যা করার দায়িত্ব দেয়। যা ছিল পবিত্র একটি দায়িত্ব। মিশরবাসিকে মুক্ত করার। কিন্তু হারমাচিস ক্লিওপেট্রার রুপ দেখে তার প্রেমে প্রায় উম্মাদ হয়ে যায়। নিজের কর্তব্যের কথা ভুলে যায়। তারপরের কাহিনীতেআছে প্রেম, ভালবাসা, বিশ্বাস আবিশ্বাস আর বিশ্বাসঘাতকতার কথা। ক্লিওপেট্রা চরিত্রটির প্রতি শুধু ইতিহাসবিদ না সাধারণ মানুষেরও প্রচন্ড আগ্রহ আছে। কেন আছে বইটি না পড়লে বুঝতে পারতাম না। ক্লিওপেট্রার মৃত্যু নিয়ে কিছু সন্দেহ আছে। হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড দেখিয়েছেন ক্লিওপেট্রার প্রেমে পাগল হারমেসিসই তাকে হত্যা করে।
তসলিমা হাসান
কানাডা, ২৯-০১-২০২২
১ Comment
congratulations