১৮৪ বার পড়া হয়েছে
মুখোশধারী
(আমেনা খানম)
আজ বছর দু’এক হতে চলছে কিছুতেই রিয়া ও ঔশীর বাবা জহুরুল হক সুস্থই হচ্ছেন না। এর মধ্যে একবার স্ট্রোকও করেছেন।ইদানিং কিডনির সমস্যা জনিত রোগেও ভুগছেন।তাছাড়া ডায়াবেটিসও আছে।তার আর সুস্থ হবার কোন রাস্তাই যেন খোলা নেই।বিভিন্ন চিন্তায় শারমিন জাহান যিনি রিয়া ও ঐশীর মা তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।তাই বিভিন্ন সময়ে রিয়া ও ঐশীর মায়েরও শরীরটা ভালো থাকছে না।রিয়া অর্নাস থার্ড ইয়ারে, ইংরেজি নিয়ে অনার্স করছে আর ঐশী এস.এস.সি দিবে।
প্রায়ই রিয়ার মা শারমিন জাহান আফসোস করছেন কাছের দু এক আত্মীয় স্বজনের কাছে যদি রিয়ার বাবা জহুরুল হক বেঁচে থাকতে থাকতে রিয়ার বিয়েটা দিতে পারতেন!এদিকে মন মতো পাত্রও পাওয়া যাচ্ছে না।অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।এরই মধ্যে দু একটি ভালো সম্বন্ধো আসলেও তাদের ডিমান্ড এত বেশি যে রিয়ার মা শারমিন জাহানকে বিভিন্ন ভাবনা তাড়া দিচ্ছে।সারাটি জীবন যত্ন করে মেয়ে পরের ঘরে দেয়াটা যে কত কষ্টের তা বলার না!
আবার আনমনেই ভাবছেন আজকাল পাত্রপক্ষের ডিমান্ড পূরণ করেওতো সুখী হতে পারছে না মেয়েপক্ষ।কী এর সমাধান?
কী যুগ আসলো সব কিছু গুছিয়ে দিলেও মেয়ের সুখী হবার নিশ্চিত নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।এদিকে দিনে দিনে জমানো টাকা পয়সাও শেষ হয়ে আসছে।হাজার চিন্তায় শারমিন জাহান চোখে যেন সরষের ফুল দেখছেন।
বিভিন্ন চিন্তায় শারমিন জাহানের চোখের তলায় যে কালি পড়েছে তা কিন্তু জহুরুল হকের চোখ এড়ায় নি।আজ দীর্ঘ চব্বিশ বছরের সংসার জীবন তাদের। সুখে দুঃখে এ দুটি প্রাণ যেনো এক সুতোয় বাঁধা।অনেক ভেবে চিন্তে মনে মনে জহুরুল হক একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তবে তার স্ত্রী শারমিনকে এ ব্যাপারে কিছুই জানান নি।
একদিন সাহস করে কথাটা শারমিনকে বলেই ফেললেন,চলো সবাই মিলে শেষ বারের মত গ্রামের বাড়ির থেকে বেড়িয়ে আসি।আর কবে যাওয়া হয় কী না হয়!শারমিন এরকম বিষন্ন হতে কখনোই তার স্বামী জহুরুল হককে আগে দেখেননি।তাই তিনি আর অমত করলেন না।একটু গুছিয়ে নিয়ে মেয়েদের সাথে করে তার শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিলেন। ওখানে জহুরুল হকের ছেলেবেলার কত স্মরণীয় স্মৃতি।বেশ দিন দশেক ওখানেই সবাই কাটালেন। জহুরুল হক যেন অসুস্থতার মাঝেও প্রাণ ফিরে পেলেন!
এরই মধ্যে তার দুঃসম্পর্কের এক চাচাতো ভাইয়ের ছেলে বেশ ঐ দশদিন বিভিন্ন ছুঁতোয় তার চাচা জহুরুল হকের আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছেন।বেশ অর্থসম্পদের মালিক সে।তার নাম আরিফুল ইসলাম।বাইরে দেখে বোঝার উপায়ই নেই দিবানিশি তার মনের মধ্যে ট্রেনের হুইছেল বাজতেই থাকে।
এদিকে কদিনে সেই যেন জহুরুল হক ও শারমিনের প্রানের ছেলে হয়ে উঠেছে।রিয়া আর ঐশীর আপন বড় ভাই।চাচা কী খাবে,চাচীর কী লাগবে,বোনেদের কী দিয়ে খুশি রাখা যায় সব কিছু!সত্যিই জগতে এমন মানুষের দেখাও কী এই যুগে এসে পাওয়া যাবে এটি আশা করা ঠিক? নাকি পুরোটাই ভেলকি?
এমন মুখোশধারী ভালো মানুষ আরিফুল,কাক পক্ষীরও ওর স্বভাব সম্পর্কে সত্যতা উপলব্দি করার উপায় নেই।পরতে পরতে ওর শয়তানির গিট্টু।প্রতিটি রক্ত কণিকায় বাসা বেঁধেছে সম্পত্তির লোভ আর সুন্দরী নারীর প্রতি দুর্নিবার লোলুপ আসক্তি!কে বলবে এই সাদা পোশাক পড়া সুফিয়ান চেহারাটি শুধুমাত্র একটি মুখোশ আর কিছু না।দুই সন্তানের জনক এই কেতাদুরস্ত শয়তানটি।স্ত্রীর কাছে স্বামী হিসেবে ফেরেশতা।স্ত্রীর কপালে চুম্বন না করে দিন শুরু করেন না।দান খয়রাত করেন দুহাতে অবলিলায়।তবুও মনের ঘরে লুকানো মুখোশ পড়া মানুষ টির কথা সবার অজানা।এমন কায়দা করেন এমনিই ওর পাতা ফাঁদে মানুষ আটকে যায়।
এই ফাঁদে জহুরুল হকও পড়েছিলো।কখন যে নিজ স্বার্থে অনেক টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্যের নামে জহুরুল হককে আটকে ফেলেছিলেন তা ও দুটি মানুষ ছাড়া আর সবার ছিলো অজানা।গ্রাম থেকে ফিরে আসার প্রায় সাত মাসের মাথায় আবার হঠাৎ করেই জহুরুল হক স্ট্রোক করেন।এবার তিনি তার বাকশক্তি হারান।কাউকে চিনতেও পারেন না।সবসময় বিছানাতেই আশ্রয় খুঁজতে হয়।শারমিনও আর পেরে উঠছেন না।কী করবেন সামনের দিনগুলিতে এসব নিয়ে বিভিন্ন ভাবনা তাকে দিনরাত কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছে!
এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন আরিফুলের আগমন।একথা সেকথা বিভিন্ন আফসোস শেষে ব্যাগের থেকে মোটা আঙ্কের কয়েকটি পঞ্চাশ হাজার টাকার বান্ডিল ধরিয়ে দিয়ে প্রায় ছোটখাট একটা বয়ান দিয়ে অতি ভদ্রতা দেখিয়ে আবার নতুন করে মনের ঘরে প্রবেশের প্ল্যান আটছে।সে নিজেই মনে মনে ভাবছে তার চাচা বাকশক্তি হারিয়ে একদিকে তার কাজগুলো অনেকটা সহজ করে দিয়েছে।এই সুযোগেই অনেক অনেক কিছু হাতিয়ে নিতে হবে।এই মোক্ষম সুযোগ।
দিনে দিনে ঋণের দায়ে নিজেকে অতি তুচ্ছ মনে করছে শারমিন জাহান।অথচ সে নিজেই জানছে না কৈ এর তেলেই কৈ ভাচ্ছে ঐ মুখোশধারী শয়তানটি।এরকম দুর্দান্ত অমানুষগুলির অমানবিক চিন্তাগুলি সাধারণের চিন্তার থেকে অনেক দূরে বসবাস করে।সে পযর্ন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে অনেক কিছু হারিয়ে যায়।একটু অসাবধানতাবশত সারাজীবনের মতো জীবনটা জিম্মি হয়ে যায় এদের মতো ভন্ডদের হাতে।
দিনে দিনে অন্ধের মত আরিফুলকে শারমিন জাহানের পরিবারের সদস্যরা আস্থা ও বিশ্বাস করতে লাগলো। না করেই কী উপায় আছে?হঠাৎ হঠাৎ এমন ধামাকা সে দেখাতে লাগলো যে কোনো মানুষই তাকে দাতা হাতেম তাঈ ভেবে বসবেন এ আর এমন আশ্চর্যের কী?
নিজ দায়িত্বে রিয়ার বিয়ের আয়োজন করে চাচা চাচীকে স্বর্গীয় সুখ দিলেন। একটা হাফ ছেড়ে যেন শারমিন জাহান বাঁচলো!
দিন যতই যাচ্ছে ততই জহুরুল হকের শরীরটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।এত বেশি শরীরটা খারাপ হয়ে পড়লো যে সব আত্মীয়রা শেষ দেখা দেখতে আসছে জনেজনে।বলা কী যায় যদি আর দেখা না হয়!এছাড়া জহুরুল হক সারাটিজীবনই মাটির মানুষ ছিলেন।তাই অনেকেই তাকে হারানোর দুঃচিন্তায় চোখের পানিতে এসে এসে বুক ভাসিয়ে যাচ্ছেন।
এরই মধ্যে ঘটলো সেই ঘটনা।আসলেইতো মিথ্যা কখনোই সত্যকে চেপে রাখতে পারে না।আরিফুলের স্ত্রী এই প্রথম চাচা শ্বশুরকে দেখার উদ্দেশ্য রিয়াদের বাসায় আসলো।আর গল্পে গল্পে আরিফুল যে তাদের গ্রামের সব জায়গা জমি বাড়ি ঘর তার চাচা শ্বশুরের কাছ কিনে নিয়েছে সেই গল্পই এনিয়ে বিনিয়ে জানালো।আরো বলল তার স্বামী এত ভালো মানুষ ঐসব সম্পত্তি সব তার নামেই দিয়েছে।মনেমনে শারমিন জাহান এখন সব পানির মতো পরিষ্কার বুঝতে পারছে।আর এই কারণেই আরিফুলের এত ভালোমানুষি।হায়রে পৃথিবী!তাইতো ভাবছি মানুষ আবার ফেরেশতা হয় কিভাবে?
এখনোতো কিছুই হয় নি।কেবল ধামাকা দেবার পালা শুরু।সামনে আরো ধামাকা আসছে।কিছুদিনের মাথায় পরিবারটি পুরোপুরি আরিফুল নির্ভর হয়ে গেলো।রিয়ার বাবা মারা গেছেন মাস তিনেক হয়েছে।রিয়া বিয়ের পরে ইতালি চলে গেছে।আরিফুল শয়তানি বুদ্ধি কিন্তু ভালোই এটেছে।একেবারে জটিল শয়তানি বুদ্ধি যাকে বলে।রিয়াকে বুঝেশুনে প্রবাসী ছেলে যে কিনা তারই আপন চাচাতো ভাই তার সাথে বিয়ে দিয়েছে।যেন হাজার চেষ্টা ও ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও মা বোনের পাশে দাঁড়াতে না পারে।ধীরে ধীরে যা হচ্ছে সব কিছুই যেন আরিফুলের আগে থেকে আাঁকা নীল নকশারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
ছোট্ট ঐশীও যেন নজরে পড়ার মতই সুন্দরী হয়ে উঠেছে।ছোট বেলা থেকে তুলনামূলকভাবে একটু স্বাস্থ্যবতীও।রিয়ার স্বাস্থ্যটা খারাপ থাকায় একটু বড় হবার পর থেকে সবাই যেন ঐশীকেই ভুলে বড় ভাবতো।লেখাপড়ার মাথাও ঐশীরই ভালো।দেখতে দেখতে ঐশী এইচ.এস.সি পরীক্ষায়ও খুব ভালো রেজাল্ট করলো।এবার মায়ের কাছে বায়না ধরলো ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করবে।মায়ের মনের অজ্ঞাত অজানা ভয়ের কথা মেয়ের সাথে বলতেও পারছে না আবার মেয়েটা এত ভালো লেখাপড়ায় তবুও তাকে একা এই অচেনা শহরে পরের সাথে ছাড়তেও পাড়ছে না!অসহায়,নিরুপায় মায়ের মনটা শুধু ছটফট করছে জানা অজানা সব হারানোর ভয়ে!
মায়ের দোয়া নিয়ে রাতের গাড়ি ধরে রওনা দিল ঐশী নামধারী ভালোমানুষ আরিফুলের হাত ধরে।চাচী কোনো চিন্তা করবেন না আমি আপনার বড় ছেলে আর ঐশীতো আমার ছোট বোন হলেও সন্তানের বয়সী।হায়রে শয়তান!তোদের মুখেই জন্মের সময় বেশি মধু বোধহয় পরে নাহলে কী খেয়ে এত রসের কথা মুখে আসে!
বেলা সাড়ে সাতটার মধ্যে তারা ঢাকা পৌঁছে গেল।আরিফুল তারই ভাড়াকরা কুকর্মের জন্য বরাদ্দকৃত দুই রুমের বাসায় ঐশীকে নিয়ে উঠলো।মনেহচ্ছে সব সাজানো গোছানো অথচ কোন লোক নেই।খাবারেরও ব্যবস্থা আগে থেকেই করা ছিলো।ঐদিনই ঐশীর বেলা দশটায় ভর্তি পরীক্ষা।তাই কল্পনার জগতেই সে আচ্ছন্ন ছিলো।কারো লোলুপ দৃষ্টি কিংবা মনের দুর্মতি বোঝার প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিলো না।কথা ছিলো পরীক্ষা শেষ হবা মাত্রই তারা যথারীতি রওনা দিবে।কিন্তু বিধি হয়েছে বাম।
ভাইজান কখন যাবো আমরা?গাড়ী কয়টায়।বোন এত অস্থির হলে চলবে।ঢাকায় পড়তে হলে তোমাকে সব চিনতে হবে তাইনা?তাই চলো তোমাকে সব চিনায় জানায় থুয়ে যাই।আমি কী বারবার কাজ ফেলায় আসতে পারবো?পারবো নাতো।ঐশীও ভাবলো সত্যিইতো ভাইজান একদম সঠিক কথায় বলছে।ঠিকআছে চলেন ভাইজান।ঐশীর সাথে করে বিভিন্ন বিপনীতে ঢুকে ঐশীর অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ওয়েস্টার্ন ড্রেসে তার শপিং ব্যাগ লোড হয়ে যাচ্ছ।কসমেটিকস্ থেকে শুরু করে কিছু যেন বাদ যাচ্ছে না।ঐশী হাঁপিয়ে উঠেছে।জীবনে এত শপিং কোনদিনও সে চোখেও দেখেনি।
সে কিভাবে জানবে সে যে চড়া দামে বিক্রি হয়ে গেছে।আরিফুলের চেয়েও বড় বড় লোলুপ দৃষ্টিগুলি ঐশীদের মতো মেয়েদের যৌবন নিয়ে সারাটি জীবন ছিনিমিনি খেলে।এও যেন এক খেলা!যতই রাত বাড়ছে ততই ঐশীর ভেতরটা মা মা করছে।মনের ভেতর কুডাক দিচ্ছে।কে যেন বলছে ঐশী মায়ের অবাধ্য হলি?রাত্রিটুকুন পাড় হলে আয়নায় নিজেকে দেখলে অপবিত্র মনে হবে না তো?
ঐশী তুই কী আর কোনোদিন মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখতে পারবি???
যেখানে পূর্নিমার আলোয় তোর সারাদেহ জ্যোস্নায় ঝলমল করতো?আজ তাকিয়ে দেখ ঐশী,তোর আকাশটা তারাহীন!জ্যোস্নাশূন্য!চারিপাশটায় শুধু অন্ধকার!শুধুই অন্ধকার!
১ Comment
congratulations