২৫৬ বার পড়া হয়েছে
নিঝুম দ্বীপে একদিন
সুপ্রিয়া বিশ্বাস
জাহাজমারা একটি ছোট ঘাট।ঘাটে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও একটি স্পীডবোট ছাড়া অন্যকিছু দেখলাম না। ঘাট থেকে ওপাড় দেখা যাচ্ছে। সবাই আঙ্গুল তুলে দেখালো ঐ যে নিঝুম দ্বীপ।দূর থেকে সারি সারি সবুজ গাছ সামনে থাকা বিশাল জলরাশি সত্যিই যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে।যার জন্য আমরা আজ দু’দিনব্যাপী সব ভয়ভীতি দুরে ঠেলে এতদুর অতিক্রম করে এসেছি সেই রাজকুমারীকে আর একটি নদী পার হলেই আমরা দেখতে পাবো।
বাহঃ কি আনন্দ!
“হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মত নাচে।”
এতক্ষন কাঁচা রাস্তায় নক্কর ছক্কর জার্নিতে আমাদের যে মন খারাপ ছিলো এখন তা অনেকটাই ভালো হয়ে গেলো।এখানে নদীর জল আর সমূদ্রের জল একাকার হয়ে মিশে আছে।এখানকার পানি লবনাক্ত।বেশ দূরে নদীর এপাশে ওপাশে দু’তিনটি নৌকা ও স্পীডবোট চলছে।ওদের স্পীডবোটে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো।কিন্তু ছেলেমেয়েকে নিয়ে আমার স্পীডবোটে উঠার ইচ্ছে ছিলোনা।তাই নৌকায় উঠলাম।অবশেষে নৌকা ছেড়ে দিলো।
নদীর ভিতরে জেলেরা মাছ ধরার জাল পেতে রেখেছে।বালিহাঁসের মতো একদল সাদাকালো পাখি মাঝে মাঝেই নদীতে একবার বসছে আবার উড়ে যাচ্ছে।আমাদের সাথে সফরসঙ্গী হিসাবে নিজাম সাহেব সকাল থেকেই আছেন।ঊনার কাছে জানতে চাইলাম,পাখিগুলোর নাম কি?
ঊনি বললেন, এগুলোকে খোয়াজ পাখি বলে।আগে কখনো খোয়াজ পাখি দেখেছি বলে মনে হলোনা।তবে হাঁসের মত বলে চেনা চেনা মনে হচ্ছিল পাখিগুলোকে।সকালের সূর্যের আলো ঢেউয়ে ঢেউয়ে রূপালী ঝিলিক দিয়ে দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে।মনে হচ্ছে ঢেউয়ে ঢেউয়ে বুঝি রূপালী মাছেরা খেলা করছে। নদীর এই মোহনীয় রূপ শুধু দু’চোখ ভরে উপভোগ করা যায়,বর্ণনা করার মত অতটা ভাষার দক্ষতা সত্যিই আমার নেই। নদীমাতৃক বাংলাদেশে জালের মত নদীগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।তাইতো আমরা মাছে ভাতে বাঙালি।
মিনিট বিশেকের মধ্যেই আমরা স্বপ্নের নিঝুম দ্বীপে এসে নামলাম।নিঝুম দ্বীপ এমন নামকরণের কারণ কি? স্বাভাবিক কৌতুহলবশতঃ জানতে চাইলাম নিজাম সাহেবের কাছে।অর্ণব গুগল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে যা জানালো তা হলো-
নিঝুম দ্বীপ বাংলাদেশের একটি ছোট্ট দ্বীপ। এটি নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার পুরো দ্বীপটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৩ সালে দ্বীপটি জাহাজমারা ইউনিয়ন হতে পৃথক হয়ে স্বতন্ত্র ইউনিয়নের মর্যাদা লাভ করে। নিঝুম দ্বীপের পূর্ব নাম ছিলো চর-ওসমান, আবার কেউ কেউ একে ইছামতীর চরও বলত। এ চরে প্রচুর ইছা মাছ (চিংড়ীর স্থানীয় নাম) পাওয়া যেত বলে একে ইছামতির চরও বলা হত।
ওসমান নামের একজন বাথানিয়া তার মহিষের বাথান নিয়ে প্রথম নিঝুম দ্বীপে বসত গড়েন। তখন এই নামেই এর নামকরণ হয়েছিলো। পরে হাতিয়ার সাংসদ আমিরুল ইসলাম কালাম এই নাম বদলে নিঝুম দ্বীপ নামকরণ করেন।মূলত বাল্লারচর, চর ওসমান, কামলার চর এবং মৌলভির চর – এই চারটি চর মিলিয়ে নিঝুম দ্বীপ। প্রায় ১৪,০৫০ একরের দ্বীপটি ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জেগে ওঠে। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জন বসতি গড়ে উঠে। ১৯৭০ এর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপটিতে কোন প্রানের অস্তিত্ব ছিলনা। ঘূর্ণিঝড়ের পরে তৎকালীন হাতিয়ার জননন্দিত নেতা আমিরুল ইসলাম কালাম সাহেব দ্বীপটিতে পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন যে কোন প্রানের অস্তিত্ব নাই, তাই তিনি আক্ষেপের সুরে বলে ছিলেন হায় নিঝুম! সেখান থেকে দ্বীপটির নতুন নাম নিঝুম দ্বীপ।
এ দ্বীপের মাটি চিকচিকে বালুকাময়, তাই জেলেরা নিজ থেকে নামকরণ করে বালুর চর। এই দ্বীপটিতে মাঝে মাঝে বালুর ঢিবি বা টিলার মতো ছিল বিধায় স্থানীয় লোকজন এই দ্বীপকে বাইল্যার ডেইল বা বাল্লারচর বলেও ডাকত। বর্তমানে নিঝুমদ্বীপ নাম হলেও স্থানীয় লোকেরা এখনো এই দ্বীপকে বাইল্যার ডেইল বা বাল্লারচর বলেই সম্বোধন করে।
দ্বীপের পাড়েই সিএনজি দাঁড়িয়ে আছে।সরু পাকা রাস্তা চলে গিয়েছে গ্রামের দিকে।রাস্তা সংলগ্ন দু”পাশের ফাঁকা ছোট ছোট ঘাসযুক্ত মাঠ গোবাদিপশুতে ভরপুর।গাড়িটি যখন গ্রামের দিকে এগিয়ে চললো তখন আর মনে হলোনা আমরা কোন দ্বীপে এসেছি।আর দশটা সাধারণ গ্রামের মতই অতি অনুন্নত একটি গ্রামের ভিতর দিয়ে আঁকাবাকা পথ বেয়ে গাড়িটি নিঝুম দ্বীপের একটি বাজারে এসে থামলো।
একেবারেই ধুলা বালিতে পরিপূর্ণ ও শুটকি মাছের গন্ধে ভরপুর ছোট একটি সাধারণ বাজার। ওরা নেমে গেলো গাড়ি থেকে।আমি আর আমার মেয়ে সুপ্তি বসেই রইলাম গাড়িতে।ওরা চা বা কফির দোকান খোঁজাখুজি করলো।না,তেমন কোন ভালো চা বা কফির দোকান নেই।অগত্যা আইসক্রীম ও কোল্ডড্রিংকস খেলাম সবাই।
বেলা এগারোটা।ধুলাবালিতে অস্বস্তি আর গরম লাগছিল বেশ।তেমন ছায়াঘেরা গাছ গাছালিও চোখে পড়লো না।আমরা কিছুক্ষনের মধ্যেই ওখান থেকে রওনা দিলাম।
আঁকাবাঁকা সরু রাস্তা বেয়ে গাড়িটি সামনের দিকে এগিয়ে চললো।দু’পাশে ছোট বড় খেজুর ও নারিকেল গাছ,কিছু কলাবাগান আরো কিছু নাম না জানা গাছের সারি দেখতে পেলাম।বাড়িঘর গুলো বেশ অনুন্নত।বেশির ভাগ ঝুপড়ি ঘর।প্রায় সব বাড়ির উঠান বা আশেপাশে জাল নেড়ে দেওয়া আছে।মানুষজন অন্যান্য গ্রামের মতই বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত।বেশিরভাগ মানুষের জীবন জীবিকা নদী ও সাগরের উপর নির্ভরশীল।ধূ ধূ মাঠ পরে আছে।মাঠে তেমন কোন ফসল দেখলাম না।
কিছুক্ষন গাড়িটি চলার পর আমরা একটি সুন্দর পাকা রাস্তা দিয়ে “নিঝুমদ্বীপ জাতীয় উদ্যানে “এসে পৌঁছালাম। চারিদিকে সুন্দরবনের মতো সুন্দর একটি মানগ্রোভ বন।।বাংলাদেশের বনবিভাগ ৭০-এর দশকে বন বিভাগের কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চার জোড়া হরিণ ছাড়ে। নিঝুম দ্বীপ এখন হরিণের অভয়ারণ্য। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের হরিণশুমারি অনুযায়ী হরিণের সংখ্যা ২২,০০০। বর্তমানে হরিণের সংখ্যা ১৫০০০ বলে জানা গেল।নোনা পানিতে বেষ্টিত নিঝুম দ্বীপ কেওড়া গাছের অভয়ারণ্য। ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে সুন্দরবনের পরে নিঝুম দ্বীপকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বলে অনেকে দাবী করেন।
বনের মধ্যে বনবিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের থাকার জন্য একটি আধুনিক তিনতলা ভবন রয়েছে।নিজাম সাহেব বললেন,এই সেই বন ।এখানে হরিণ আছে।আমরা উৎসুক চোখে হরিণের খোঁজে এদিক ওদিক তাকালাম।কিছুটা বনের গভীরে গেলাম।মনের মধ্যে রবিঠাকুরের গানটি গুনগুনিয়ে বাজছে,
“তোরা যে যা বলিস ভাই,আমার সোনার হরিণ চাই,
মনোহরণ চপল চরণ সোনার হরিণ চাই,
সে যে চমকে বেড়ায়,দৃষ্টি এড়ায়,যায় না তারে বাঁধা।
সে যে নাগাল পেলে পালায় ঠেলে লাগায় চোখে ধাঁধাঁ।আমি ছুটবো তারি পিছে পিছে পাইবা নাহি পাই।মনোহরণ চপল চরণ সোনার হরিণ চাই।”
সোনার হরিণ তো দুরের কথা রক্ত মাংসের চামড়ার একটি হরিণও আমরা দেখলাম না।ব্যর্থ মনোরথে এদিক ওদিক আবারো তাকালাম। শুধু হরিনের পায়ের ছোপ ছোপ দাগ দেখতে পেলাম।না,কোথাও একটি হরিণ নেই।সিএনজি চালক বললেন,এখন দেখা যাবেনা।বিকালের দিকে মাঝে মাঝে দেখা যায়।তবে আগের মত হরিণ এখন নেই।বনখেকোরা বন উজাড় করে দিচ্ছে।ফলে হরিণ মাঝে মাঝে লোকালয়ে চলে আসে।হরিণের মাংস সুস্বাদু হওয়ায় মানুষ শিকার করে খেয়ে ফেলে।ফলে ভয়ে হরিণ পালিয়ে থাকে । কিছু হরিণ নাকি অন্যত্র পাচার ও হয়ে যায়।যেসব হরিণ আছে সেগুলোও ভয়ে সব সময় সামনে আসেনা। এখন আর এটিকে হরিণের অভয়ারণ্য বলা যায় না।কি আর করা!আমরা মনখারাপ করে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইলাম।
ছোট জলাধারের দু’পাশ ম্যানগ্রোভ বৃক্ষে ভরপুর।প্রচুর ছোট ছোট ধারালো শ্বাসমূল দেখতে পেলাম।ছেলেমেয়েকে ওর বাবা বললো,বলোতো এগুলোর গড়ন এমন হওয়ার কারণ কি।ওরা দু’জনেই বললো,
এগুলো হলো শ্বাসমূল।কাকে বলে বলো?বললাম আমি।ছেলেটা বললো,লবণাক্ত ও কর্দমাক্ত মাটির পরিবেশে সুন্দরী, গরান প্রভৃতি উদ্ভিদের প্রধান মূল হতে শাখামূল মাটির উপরে খাড়াভাবে উঠে আসে। এসব মূলে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে, যা শ্বাসকার্যে উদ্ভিদকে সহযোগিতা করে। এ ধরনের রূপান্তরিত মূলকে শ্বাসমূল বলে।লবনাক্ত বালুময় মাটির কারণে মূলগুলো অক্সিজেন নিতে পারেনা ,তাই উপরে ঠেলে ওঠে।
জোয়ারের সময় শ্বাসমূলের সাহায্যে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ শ্বসন কাজ চালায়।
শুনে খুশি হলাম।যাক ছেলেমেয়ে কিছু পড়ালেখা করে তাহলে!!
ওর বাবা হাঁটতে হাঁটতে ওদের সাথে গল্প করতে লাগলো।বললো,জানো সুন্দরবনের জেলেদের মধ্যে কথিত আছে যে ,বাঘে ধরলে ধরুক,কিন্তু বাঘ যেন নিয়ে যাবার সময় এই শ্বাসমূলের উপর দিয়ে টেনে না নিয়ে যায়!কারণ এটি এতটাই শক্ত ও ধারালো যে,বাঘের কামড়ের চেয়েও এর আঁচড় বেশি যন্ত্রনাদায়ক হয়।
আবার আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম।বন পেরিয়ে আধাপাকা রাস্তা দিয়ে অবশেষে আমরা শতফুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে পৌঁছুলাম ।বিদ্যালয়টি দোতলা।নীচতলায় কোন শ্রেনীকক্ষ নেই।নীচতলা হল রুমের মত।বন্যা জলোচ্ছ্বাসের কারণে দ্বীপাঞ্চলের বেশিরভাগ বিদ্যালয়ই এমন। ওখানে বিদ্যালয়ের একপাশে একটি সাইক্লোন সেন্টার ও ছোট একটি বাজারও রয়েছে।নিজাম সাহেবের পরিচিত একটি ওষুধের দোকানে বসলাম আমরা।ওখানে নিজাম সাহেব আমাদের চা আর পুরী খাওয়ালেন।ওষুধের দোকানদারের কাছে জানতে চাইলাম ,এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক কে?ঊনি কোথায় আছেন?লোকটি বেশ তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন,ঊনি আগে পিটিআই করেননি।তাই পানিশমেন্ট স্বরূপ কর্তৃপক্ষ রাজবাড়ি পিটিআইতে পাঠিয়েছেন প্রশিক্ষনের জন্য।আমি শুনে আশ্চর্য্য হলাম।কোথায় নিঝুম দ্বীপ আর কোথায় রাজবাড়ি !এমনটি তো হওয়ার কথা না!!!!
লোকটি নিজাম সাহেবের সাথে তার ওষুধের দোকান,দু’একটি নৌকা ও সিএনজি আছে এসব নিয়ে গল্প করছিলেন।পরে জানতে পারলাম ঊনি শতফুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক।কিন্তু শিক্ষকতার মত মহান পেশার চেয়ে ঊনি অন্যদিকের আলোচনা বেশি করলেন এবং ঊনার বর্তমান প্রধান শিক্ষকের প্রতি এমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য মনোভাব আমাকে ব্যথিত ও বিচলিত করলো বিধায় ঊনার সাথে আলাপচরিতার কোন মানসিকতা আমার রইলো না।আমরা ওখান থেকে বের হয়ে আবার সিএনজিতে উঠে বসলাম।
রাস্তার একপাশে ফসলবিহীন ফাঁকা মাঠ অন্যদিকে ছোট ছোট বাড়ি ছাড়া তেমন কিছু চোখে পড়লো না।পুরো দ্বীপটিতে সৌরবিদ্যুত্যের ব্যবস্হা রয়েছে।সরকারের এটাও একটা বড় অর্জন।
কিছুদুর যাওয়ার পর আমাদের গাড়িটি নষ্ট হয়ে গেল।কয়েকজন লোক ঠেলাঠেলি করেও গাড়িটি আর সচল করতে পারলো না।পরে আরেকটি গাড়ি এসে আমাদের নিঝুম দ্বীপের বঙ্গোপসারের উপকুলে নিয়ে গেলো।
প্রায় এক কিলোমিটার তপ্ত বালুর মধ্য দিয়ে হাঁটার পর আমরা সাগরের পানিতে পা ডুবিয়ে শান্তির পরশ পেলাম।
না,এখানকার সাগরের অতটা গর্জন নেই।ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ সেই মোহনীয় শব্দ আর উত্তাল সাগরের রুপও নেই।তবুও দিগন্ত ছোঁয়া সাগর পাড় সারা দ্বীপে ঘুরে বেড়ানোর ক্লান্তি নিমিষেই কেড়ে নিলো।আমরা কিছুক্ষন হাঁটাহাটি করলাম সাগরের নোনা জলে পা ভিজিয়ে।এখন দুপুর বারোটা ।আরো একটা পরিবারের পাঁচ ছয়জন লোক ছাড়া সাগরপাড়ে এখন কেউ নেই।বিকালে বেশ লোকজন এখানে আসে ঘুরতে তাই জানালেন নিজাম সাহেব।
আবার তপ্ত বালু পাড়ি দিয়ে আমরা চলে এলাম গাড়ির কাছে।না আর ভালো লাগছে না।একটা ছোট দোকান থেকে চিপস কিনে ছেলেমেয়েদের দিলাম। একটু দুরেই জাতীয় উদ্যান।এখানে একটা ছোট বাজার আছে।পর্যটকরা এসে থাকার মত কয়েকটা হোটেল রয়েছে।এখানে একটি সাইক্লোন সেন্টারও রয়েছে। দ্বীপে স্কুল গুলো সাইক্লোন সেন্টার হিসাবে যাতে ব্যবহৃত হতে পারে এভাবেই নির্মিত।মাঝে মাঝেই আলাদা সাইক্লোন সেন্টারো আছে।
এই দ্বীপে ত্রিশ বছর আগে কোন বসতি ছিলোনা।বিভিন্ন নদী ভাঙ্গন এলাকার মানুষকে খাস জমি বন্দোবস্তের মাধ্যমে এখানে বসতি স্হাপনের সুযোগ করে দিয়েছে সরকার এমনটি জানালেন নিজাম সাহেব।
রোদ্র এবং ক্ষুধায় আর ঘুরতে ভালো লাগছিলো না।আমরা অবশেষে আবার ঘাটে ফিরে এলাম।
এবার দেখলাম নদীটা বেশ বড় দেখা যাচ্ছে।আমরা যখন যাই তখন ভাটার সময় ছিলো।এখন জোয়ারের সময়।পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঘাটে নৌকা বা স্পীডবোট কিছুই দেখা গেলো না।অগত্যা অপেক্ষা করা ছাড়া কোন উপায় নেই।বসে থাকার মত তেমন কোন পরিবেশ নেই।একটি ছোট খাবার হোটেল।হোটেলটির পরিবেশ পরিচ্ছন্ন নয়।ওখানেও কিছু মানুষ বসে খাচ্ছে।দোকানের একপাশে ভাত খাওয়ার জায়গা।অন্যদিকে বিস্কুট,চিপস এসবের ব্যবস্হাও রয়েছে।আমরা কিছু শুকনা খাবার ও পানীয় কিনলাম।ক্লান্ত হয়ে সাগরের কিনারায় একটি কাঠের উপরে বসে পড়লাম।তখন রবীন্দ্রনাথে একটি গান খুব মনে পড়ছিলো,
“ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু
পথে যদি পিছিয়ে পড়ি কভু॥
এই-যে হিয়া থরোথরো কাঁপে আজি এমনতরো
এই বেদনা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু॥
এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু,
পিছন-পানে তাকাই যদি কভু।
দিনের তাপে রৌদ্রজ্বালায় শুকায় মালা পূজার থালায়,
সেই ম্লানতা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু॥”
আমার খুব আশ্চর্য লাগে।এই ব্যক্তিটি কি নাওয়া খাওয়া ভুলে সব সময় লিখতেন?জীবনের কোন বিষয়ে তিনি কলম ধরেননি?এমন সৃষ্টিশীল মানুষ সত্যিই বাংলা সাহিত্যের গর্ব।সেই ছোটকাল থেকেই আমার বাবা আমাদেরকে বলতেন,বলতো
“পূর্বে যদি না উঠিতো রবি নজরুল হইতেন বিশ্বকবি”-এর মানে কি?
আমরা তখন থেকেই মনে রেখেছি রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন ১৮৬১ সালের ৭ই মে আর নজরুল জন্মেছিলেন ১৮৯৯ সালের ২৫শে মে।নজরুল থেকে রবীন্দ্রনাথ ২৮ বছর ১৯ দিনের বড়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুবরণ করেছেন ১৯৪১ সালের ৭ ই আগষ্ট।আর নজরুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেছেন ১৯৭৬ সালের ২৭শে আগষ্ট।বাংলা সাহিত্যের এই দুইজন মণীষী একই মাসে ( মে) জন্মগ্রহন করেন আবার একই মাসে(আগষ্ট )মৃতুবরণ করেন।হঠাৎ মেয়ের ডাকে কল্পনা থেকে সম্বিত ফিরে পেলাম।
পাঁচ ছয়টি ছেলেকে একসাথে দাঁড়িয়ে গল্প করতে দেখলাম।ওদের সাথে শেখরবাবুর কথা হলো।ওরা বেশ উৎফুল্ল।ওরা জানালো এই দ্বীপে তেমন মজা লাগেনি তবে গতরাতে ওরা যখন ঢাকা থেকে লঞ্চে আসছিলো তখন মনপুরার কাছে এসে ভোরের দিকে ওদের লঞ্চটি একটি দ্বীপে আটকে ছিলো কিছুক্ষন।তখন ঐ দ্বীপে ওরা নেমেছিলো।ওখানে নাকি মেছোবাঘের পায়ের ঝোপ আর সুন্দরবনের মত ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে কিছু হরিণ দেখেছে ।কোন কোন দ্বীপে নাকি বুনো মহিষও আছে ।ওরা একটি কোম্পানী থেকে এসেছে। ২৭/২৮ বছর বয়স হবে ছেলেগুলোর।তাই সকলকিছুই ওদের কাছে রঙীন মনে হচ্ছে।
এবার নৌকা ও স্পীডবোট দুটি একই সাথে এসে ঘাটে ভিড়লো।আমরা ঝটপট নৌকায় উঠে পড়লাম।সকালের নদীর দৃশ্য আর এখনকার দৃশ্য কিছুটা পার্থক্য। নদীর এপাড়ে একটি বেদে বহর দেখলাম।ওরা কেউ কেউ টোঙের মধ্যে শুয়ে আছে।পুরুষ মানুষগুলোই টোঙের মধ্যে শুয়ে আছে মনে হলো।মহিলারা কেউ কেউ রান্না করছে।কেউবা অন্য কাজ করছে।শুনেছি বেদে বহরের পুরুষরা নাকি অলস হয়।মহিলারাই বেশি পরিশ্রম করে। এদের দেখে আজ সত্যি মনে হলো।
কিছু ছেলেমেয়ে খেলা করছে।কেউ কেউ নদীতে গোসল করছে।কিছু পাঁতিহাস নদীতে ডূব সাঁতারে মেতে আছে। ঘাটে পৌঁছে আমরা আমাদের জন্য রিজার্ভ করা সিনএনজিতে উঠে বসলাম। আমরা স্বপ্নের নিঝুম দ্বীপকে হাত নেড়ে বিদায় জানালাম।
মহিলারাই বেশি পরিশ্রম করে। এদের দেখে আজ সত্যি মনে হলো।
কিছু ছেলেমেয়ে খেলা করছে।কেউ কেউ নদীতে গোসল করছে।কিছু পাঁতিহাস নদীতে ডূব সাঁতারে মেতে আছে। ঘাটে পৌঁছে আমরা আমাদের জন্য রিজার্ভ করা সিনএনজিতে উঠে বসলাম। আমরা স্বপ্নের নিঝুম দ্বীপকে হাত নেড়ে বিদায় জানালাম।
১ Comment
congratulations.