২০৪ বার পড়া হয়েছে
বন্ধু
[শীরীন আক্তার]
১৮/০৫/২০২২
উঠোনের এক কোণে খেলা করছে দুটো ছোট্ট শিশু। অন্য কোণে একটি বিশাল খড়ের গাদা।তার পাশেই দেখা যায় দুটো ঘরে অনেক ছাগল গরু। এ শিশু দুটি প্রতিদিন অনেক খেলা করে। ওদের খেলা বাড়ির গুরুজনেরাও বেশ উপভোগ করেন। শিশু দুটির মধ্যে একজন মানুষের, অন্যটি ছাগলের। কিন্তু তাতে কী? ওরা দুজন দুজনকে যেন পলকে হারায়, এ অবস্থা। ছাগশিশুটির নাম রাখা হয় মানবশিশুটির নামের সাথে মিলিয়ে। মানুষের বাচ্চাটির নাম পিনু,আর ছাগশিশুর নাম ইনু। পিনু – ইনু হরিহর আত্মা।
খুব ভোরে পিনুর আম্মু পিনুকে জাগিয়ে নামাজ পড়ায়, তারপর আরবি পড়িয়ে ছুটি দেয়। পিনু ছুটি পেয়ে ছুটে যায় ইনুর ঘরে। সে ইনুর মায়ের পাশে ঘুমিয়ে থাকা ইনুকে কোলে করে উঠিয়ে নিয়ে উঠোনের এক কোণে বসে। ওকে অনেক আদর করে ঘুম থেকে জাগায়। ইনু পিনুর কোলের কাছে হাগু বুতুর কাজটিও সারে।এতে পিনু বিরক্ত না হয়ে একটু জায়গা বদল করে বসে। ইনু মায়ের দুধ খেতে মাকে ডাকে। মা ছাগলটাও ম্যা ম্যা ম্যা করতে করতে ঘর থেকে ছুটে আসে। পিনু চায় ইনু ওর মায়ের দুধ খেতে যাক কিন্তু পিনুর মা তাড়াতাড়ি এসে মাকে গাছের সাথে বেঁধে কাজের লোক বলিকে ডাকতে থাকে। ইনুকেও পিনুর থেকে কেড়ে নিয়ে বেঁধে ফেলে। পিনু মায়ের ভয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
বলি দুধ দুয়ে মা ছাগলকে ছেড়ে দেয়, বাচ্চা ইনুকেও ছেড়ে দেয়। ইনু দৌড়ে গিয়ে মায়ের অবশিষ্ট দুধ খেতে পেয়ে আনন্দ করে। ততক্ষণে পিনু পড়ার ঘরে পড়তে বসে। ইনু ঠিক সময়ই পিনুর পায়ের কাছে গিয়ে শুয়ে পড়ে। পিনুও পড়ার ফাঁকে ফাঁকে পা হাত দিয়ে ওকে আদর করে। ইনু বিড়াল বাচ্চার মতো নীরবে আদর নিতে থাকে। ওদিকে বলি নামক কাজের লোকটি মাছ ধরার জালটি নিয়ে পুকুর ঘাটে যায়। নির্ধারিত জায়গায় জাল মেরে অনেক রকমের মাছ ধরে আনে। তাজা তাজা মাছ কেটে ধুয়ে এনে পিনুর মাকে দেয়। তিনি তা গরম গরম ভেজে সবাইকে খাইয়ে নিজে খান।এটাই তাদের প্রতি দিনের কাজ। পিনুও ইনুকে ছেড়ে দিয়ে স্কুলে যায়। স্কুল থেকে ফিরে আসতে ইনুকে নিয়ে আবারও খেলায় মাতে।
পরদিনও বলি তার রুটিন অনুযায়ী পিনুর পড়ার ঘরের পাশে পুকুরে জাল মেরে টেনে এনে দেখে মাছ আসেনি। বলি পিনুকে ডেকে বলে — ও পিনু আপু, তোমার জন্য আজ মাছ পাইনি। তুমি ইনুকে নিয়ে চিৎকার করে খেলেছ, তোমাদের শব্দ শুনে মাছের দল পালিয়েছে।
ও ও কী মজা, কী মজা আজ মাছ পালিয়েছে।একদম ঠিক হয়েছে। প্রতিদিন তুমি জ্যান্ত মাছগুলোকে জালে জড়িয়ে মেরে ফেল।আমার ওদের জন্য খুব মায়া লাগে।
আচ্ছা, এত সুন্দর নাদুসনুদুস মাছগুলোকে মারতে তোমার খারাপ লাগেনা! তুমি খুব খারাপ মানুষ।
বলি মাথায় হাত দিয়ে — ওমা, আমি খারাপ মানুষ। তাহলে খাবে কী।মাছগুলোকে আল্লাহ আমাদের খেতে পাঠিয়েছে। তুমি মায়ের থেকে জেনে নিও।
রান্না ঘর থেকে মা শুনে বলেন — হয়েছে হয়েছে। আর খারাপ লাগতে হবে না। মাছ না হলে আমরা কী দিয়ে তরকারি রান্না করবো। বলি, যা অন্য দিকে জাল খেয়া দিয়ে মাছ ধরে আন।রান্নার দেরি হয়ে যাচ্ছে।ওরা স্কুলে যাবে। বলি মাছ ধরতে ওখান থেকে চলে যায়।
এরপর নাস্তা করে পিনু ইনু ও তার মাকে মাঠে ঘাস খেতে দিয়ে এসে পড়তে বসে। বলিও মাছের কাজ শেষ করে গরু ছাগলের দল নিয়ে মাঠে চরাতে নিয়ে যায়। পিনু পড়া শেষ করে খেয়ে স্কুলে যায়। ও পড়ালেখায় খুব মনোযোগী। তাই ছাগলের বাচ্চা নিয়ে খেললে মা রাগ করেন না। পিনু প্রতিদিনের মতো আজও ইনুকে মাঠ থেকে কোলে করে বাড়ি এসেছে। বইগুলো টেবিলে রেখে ইনুকে পেয়ারা গাছের নীচে রেখে গাছে উঠে পেয়ারা খায়। কিছু অংশ দাঁত দিয়ে কেটে ইনুর জন্য নীচে ফেলে। ইনু কুটকুট করে চিবিয়ে খায়। এতে পিনুর আনন্দ আরও বেড়ে যায়। সে বেশি করে পেয়ারা নীচে ফেলে।
এভাবে পিনুর আদর যত্নে ইনু দুই মাসের মধ্যে অনেক বড় হয়ে যায়। ও এখন সব ঘাসই খেতে পারে। মায়ের দুধ এখন খায়না। খুব আনন্দেই কাটছে দুই বন্ধুর দিন। পিনু কখনো কখনো ইনুর ঠোঁট দুটো ফাঁক করে ধরে ওর দাঁত বের করে হাসতে হাসতে কুটি কুটি হয়ে যায়। মাকে ডেকে দেখিয়ে বলে — মা দেখ দেখ আমার বন্ধু ইনু কী মিষ্টি করে হাসছে। এহেন কাণ্ড দেখে মাও বাড়ির অন্যদের ডেকে হাসে। ছাগল পানিকে খুব ভয় পায়। তাই বৃষ্টি নামতে না নামতেই মাঠ থেকে পিনু ও অন্য ছাগলের দল পালাতে থাকে। ওদের পিছু ধাওয়া করে পিনুও হাসতে হাসতে ঘরে আসে। কখনো আবার পিনু ইনুর গায়ে পানি ছিটিয়ে দৌড়ায় আর হাসে। পিনুর মজা ইনু বোঝে না, ও ম্যা ম্যা করে চিৎকার করে তার মাকে ডাকে। ওর মা ও বাচ্চার চিৎকার শুনে মাঠ থেকে ম্যা ম্যা করতে করতে ইনুর কাছে এসে ওকে জিহ্বা দিয়ে আদর করতে থাকে। পিনুর মা ও পিনুকে বকুনি দিয়ে ঘরে ধরে নিয়ে যায়। পিনু কাঁদে।
পিনু ইনুর বন্ধুত্ব বেশ জমে উঠলো। পিনু সকাল সন্ধ্যা পড়তে বসলেই ইনু এসে বইয়ের উপর দাঁড়িয়ে মুখ বাড়িয়ে পিনুর আদর নিতো। পিনুও কম কীসে? সে ইনুকে কোলে শুইয়ে গলায়, কানে হাত বুলিয়ে আদর করে আর সশব্দে পড়ে। জোরে শব্দ করে না পড়লে আম্মু এসে বাঁশের চিকন কঞ্চি দিয়ে পেটাবে। তাই সে মা ও ইনু উভয়কেই খুশি রাখে। ততক্ষণে মা এশার নামাজ পড়ে এ ঘরে আসেন।মেয়ের কাণ্ড দেখে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মৃদু শাসন করে ইনুকে তার ঘরে তাড়িয়ে দেন।পিনুর খারাপ লাগলেও মায়ের মারের ভয়ে চুপ করে থাকে।
চৈত্র মাসের এক সন্ধ্যায় ইনুকে কোল থেকে নামিয়ে মায়ের কাছে শুইয়ে দিয়ে পিনু ছাগলের ঘরের দরজা বন্ধ করে পড়তে বসে। পিনুর পড়ার আওয়াজ শুনে ইনু ওর ঘরের দরজায় নক করতে থাকে। ও পিনুর কাছে আসতে চাচ্ছে। পিনু শব্দ শুনে ছটফট করতে থাকে। কিন্তু মায়ের পিটুনির ভয়ে কিছু করতে পারেনা। ইনু এবার ম্যা ম্যা ম্যা করতে করতে দরজা নক করছে। এবার পিনু আর থাকতে পারেনি। মাইরের ভয়কে ডিঙিয়ে সে ইনুর ঘরের দরজা খুলে দেয়। ইনুও ছুটে এসে পিনুর গায়ের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। কান্না উধাও। পিনুর মা তো দেখে হতবাক। সেদিন পিনুর ঘুমের পর মা ইনুকে তার ঘরে রেখে আসেন।
বৈশাখ এসে গেছে। ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে। একদিন রাতের শেষ দিকে ঝড়ো হাওয়া সজোরে বইছে। বৃষ্টিও নেমেছে। তাই পিনুর ঘুম ভেঙেছে দেরিতে। জেগেই সে ইনুকে ডাকতে ডাকতে ওর ঘরের দরজা খুললো। কিন্তু ইনু আজ জেগে নেই। ওকে কোলে নিতে গেল পিনু। পারছে না, ইনু শক্ত হয়ে গেছে। পিনু ওর মাকে ডেকে এনে দেখায়। মা এসে ইনুকে ধরেই চমকে উঠলেন। ইনু বেশ শক্ত হয়ে গেছে, অনেক আগেই সে মারা গেছে। মা ইনুর পশম ধরে টান দিতেই আলগোছে পশম হাতে উঠে এলো। মায়ের মুখ দেখে পিনু সবেগে কাঁদতে শুরু করে ইনুকে আগলে রাখলো। মা বুঝলেন ইনুকে সাপে কেটেছে।
মা পিনুকে কোলে করে ঘরে নিতে চাইলে পিনু জানতে চাইলো ইনুর কী হয়েছে। ও জাগছে না কেন?
মায়ের ততক্ষণে চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। এত তাড়াতাড়ি পিনুর প্রিয় বন্ধুটির মৃত্যু মা ও সহ্য করতে পারছেন না। মা ও যে ইনুকে ভালোবাসতেন। মা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন —
মা রে ইনু আল্লাহর কাছে চলে গেছে। ও আর জাগবে না।
তুই আর ওকে ছুঁতে পারবিনা। ওকে সাপে ছোবল দিয়েছে।
পিনু মায়ের কথা শুনে মরা কান্না জুড়ে দিয়ে শুধু মায়ের হাত থেকে ছুটে যেতে চাচ্ছে ইনুর কাছে। ওর কান্না কিছুতেই বন্ধ করতে পারছে না কেউ।
স্বত্ব সংরক্ষিত
গন্ধরাজ, মাইজদী, নোয়াখালী।